মৃণালকান্তি দাস: আমেরিকা এবং ইজরায়েলের যৌথ বাহিনীর আচমকা হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের মৃত্যু খবর ছড়িয়ে পড়েছিল শব্দের গতিতেই। ২৮ ফেব্রুয়ারি দিনটি ছিল গোটা বিশ্বের শিয়া সম্প্রদায়ের কাছে এক শোক-যন্ত্রণার! এই ‘আগ্রাসন’-এর প্রতিবাদে বিভিন্ন দেশে শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখান। বিক্ষোভ শুরু হয় পাকিস্তানেও।
সুন্নি গরিষ্ঠ পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ শিয়া। খামেনেইয়ের মৃত্যুর পরে তাঁদের বড়ো অংশই মার্কিন বিরোধী বিক্ষোভে নেমেছিলেন। করাচিতে বিক্ষোভকারীরা কনসুলেটে হামলা চালালে সেখানে মোতায়েন মার্কিন মেরিন বাহিনী গুলি চালায়। তাতে অন্তত ১০ জন নিহত হন। বিক্ষোভ ঠেকাতে কড়া পদক্ষেপ নেয় প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সরকারও। শিয়া ধর্মগুরু ও পড়ুয়াদের মিছিল ইসলামাবাদের কূটনৈতিক এলাকায় যাওয়ার চেষ্টা করা জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানো গ্যাস ব্যবহার করে। গিলগিট-বালটিস্তানের স্কার্দুতে বিক্ষোভকারীরা রাষ্ট্রসংঘের একটি দফতরে আগুন ধরিয়ে দেন। সেখানে পুলিশের গুলিতে বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়। আমেরিকা বিরোধী বিক্ষোভে পাক অধিকৃত কাশ্মীর এবং খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের কিছু এলাকাও হিংসাত্মক হয়ে ওঠে। শিয়া–অধ্যুষিত এলাকায় কার্ফু জারি করা হয়।
জনবিচ্ছিন্ন কোনো শাসনের প্রথম বৈশিষ্ট্যই হল ভিন্নমতকে সরাসরি মোকাবিলা না করে তাকে নানা বিশেষণে আটকে ফেলা। তারা সমালোচককে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে, তার সমর্থনভিত্তিকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং মূল অভিযোগকে গুরুত্বহীন করতে চায়। পাকিস্তানে এই পদ্ধতিই ক্ষতিকরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। সেখানে বিদেশি আধিপত্য বিস্তারের যুদ্ধের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে স্রেফ ‘সাম্প্রদায়িক গোলমাল’ বলে তকমা দেওয়া হয়েছে। আমেরিকা ও সৌদি আরবের অনুগত রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। পাক সেনা সর্বাধিনায়ক ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ইরানপন্থী শিয়া ধর্মগুরুদের সরাসরি হুমকি দিয়ে বলেছেন, ‘যাঁদের ইরানের প্রতি এত দরদ, তাঁরা যেন সে দেশেই চলে যান।’
সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ পাকিস্তানে শিয়াদের উপর নিপীড়নের অভিযোগ দীর্ঘ দিনের। শিয়া পড়শি-রাষ্ট্র ইরানের সঙ্গেও তাদের টানাপোড়েনের ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কোনো পাক সেনাকর্তাকে এ ভাবে খোলাখুলি শিয়া ধর্মগুরুদের হুমকি দিতে শোনা যায়নি। পাক সেনা সর্বাধিনায়কের ওই মন্তব্যের জবাবে শিয়া ধর্মগুরু মহম্মদ শিফা নাজাফি বলেন, ‘কিছু ঘটনার জন্য সব শিয়াকে
দায়ী মনে করবেন না। সকলকে একই দলে ফেলা ঠিক নয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতেও অনেক শিয়া রয়েছেন। এই দেশটির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কায়েদ-ই-আজম (মহম্মদ আলি জিন্না)। যিনি নিজেও একজন শিয়া ছিলেন।’
ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের মন্তব্য যে শিয়া সম্প্রদায়ের হৃদয়ে গভীর আঘাত হেনেছে, তা বুঝতে অসুবিধে হয়নি ইসলামাবাদের। প্রতিদিন যুদ্ধে একের পর এক আঘাত হেনে ইরান দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী দুই রাষ্ট্র আমেরিকা-ইজরায়েলকে যেভাবে ল্যাজেগোবরে করে দিচ্ছে, সেই অভিমুখ প্রতিবেশীর দিকে ঘুরলে নিমেষেই ধ্বংস হয়ে যাবে পাক ভূখণ্ড। এটা বুঝতে কোনো জটিল অঙ্ক কষতে হয়নি শাহবাজ শরিফের সরকারের। ফলে ধূর্ত পাকিস্তান সুযোগ বুঝেই ইরান-আমেরিকার লড়াইয়ে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের প্রস্তাব ছড়িয়ে দিয়েছে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়। শাহবাজ শরিফের সরকার জানিয়েছে, তেহরান ও ওয়াশিংটনকে আলোচনার টেবিলে আনার প্রচেষ্টায় তারা নেতৃত্ব দিতে পারে। সেই আলোচনার কেন্দ্র হবে ইসলামাবাদ। ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর তো দ্ব্যর্থহীনভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, ভারত কোনো দেশের দালাল নয়। ভারতের দাবি, ইসলামাবাদের এহেন দালালি নতুন কিছু নয়। তারা এই কাজটা ১৯৮১ সাল থেকেই করে আসছে।
পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী খুব ভালো করেই বোঝে, তারা শুধু একটি সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক সংকটের মুখে নেই। তারা এমন কিছুর মুখোমুখি, যা তাদের অস্তিত্বের জন্য অনেক বেশি বিপজ্জনক। সেই বিপদ হল, পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ নিজেদের ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে বুঝতে পারছে, তাদের দেশ এখন পরাধীনতার জালে বন্দি। তারা দেখছে, পাক সরকার কীভাবে আমেরিকার স্বার্থকে নির্লজ্জভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে। করাচির মার্কিন কনস্যুলেটের বাইরে ঘটে যাওয়া সেই হত্যাকাণ্ড তাৎপর্যপূর্ণ! যখন পাকিস্তানের মাটিতেই মার্কিন সেনাদের গুলিতে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভকারীরা মারা যান, তখন রাষ্ট্রীয় সব অজুহাত মিথ্যা হয়ে যায়। যখন বাইরের দেশের হিংসা এবং দেশের ভিতরকার দমন-পীড়ন একই বিন্দুতে মিলে যায়, তখনই রাষ্ট্রযন্ত্রের আসল চেহারা উন্মোচিত হয়। আমেরিকার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করার বদলে, দেশের ভিতরে মানুষের ক্ষোভকে দমন করাই এখন পাকিস্তানের প্রধান কাজ। এখানে আসল প্রশ্নটি ধর্মীয় বা তাত্ত্বিক নয়, প্রশ্নটি ক্ষমতার। পাকিস্তানকে শাসন করছে, কার স্বার্থে শাসন চলছে এবং পাকিস্তান কার ছায়ায় টিকে আছে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর তেহরানের অজানা নয়। ইরান দেখেছে, খামেনেইয়ের মৃত্যুতে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়ায় ছিল কৌশলী অবস্থান। তারা ঘটনার কঠোর নিন্দা না জানিয়ে কেবল উদ্বেগ
প্রকাশ করে দায়সারা বক্তব্য দিয়েছে। অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলির উপর ইরানের হামলার পর ইসলামাবাদ কিন্তু নিন্দা জানাতে সময়ক্ষেপণ করেনি। আমেরিকার প্রতি পাকিস্তানের এই নমনীয়তার নেপথ্যে রয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইসলামাদের নেতাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।
১৯৭৯ সালের ইতিহাসটা ভুলে যায়নি ইরান। যে বছর পশ্চিম এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়াকে এমনভাবে বদলে দিয়েছিল, যার প্রভাব আজও চলছে। সেই বছর ইসলামি বিপ্লব ইরানের শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করে, ওয়াশিংটনকে ক্ষুব্ধ করে তোলে এবং এক বিপ্লবী মতাদর্শের শিয়া ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্ম দেয়। ইরানের বিপ্লব কেন বিশ্বের বহু দেশের শাসক ও সামরিক আজ্ঞাবহদের আতঙ্কিত করেছিল? কারণ, সেই বিপ্লব কেবল নির্দিষ্ট মতাদর্শের বিজয় ছিল না, বরং তা ছিল বিদেশি শক্তির সমর্থনে টিকে থাকা এক শাসকের পতন। সেই বিপ্লব প্রমাণ করেছিল যে দেশের মানুষ চাইলে সার্বভৌমত্ব ছিনিয়ে নিতে পারে। তাতেই ভয় পেয়েছিল আরব দুনিয়ার বাদশারা। সেই কারণেই উপসাগরে আমেরিকার অপরিহার্য মিত্র ও সুন্নি ইসলামের স্বঘোষিত অভিভাবক সৌদি আরব ইরানের প্রভাব প্রতিহত করার জন্য মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সুন্নি ধর্মীয় আন্দোলনে বিপুল অর্থ ঢালতে শুরু করে। সৌদি-ইরানি প্রতিদ্বন্দ্বিতার অন্যতম প্রধান যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়ে ওঠে পাকিস্তান। ইসলামাবাদ আনুষ্ঠানিকভাবে রিয়াধ ও তেহরান উভয়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখলেও বাস্তবতা ছিল অনেক বেশি জটিল এবং রক্তাক্ত।
১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক হিংসা হঠাৎ বেড়ে যায়। সৌদি অর্থায়নে পরিচালিত বেশ কিছু উগ্র সুন্নি গোষ্ঠী শিয়া সম্প্রদায়কে টার্গেট করে। ইরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তারা পাকিস্তানে শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলিকে গোপনে সাহায্য করছে। তথাকথিত ‘ভ্রাতৃত্ববোধ’-এর গল্পটি ক্রমেই এক ভদ্র মুখোশের মতো মনে হতে থাকে, যার আড়ালে পাকিস্তানের মাটিতে এক বিপজ্জনক প্রক্সি যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। এর ফলে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি, সামাজিক আস্থার অবক্ষয় এবং সাম্প্রদায়িক বিভেদের স্থায়ী গভীরতা— যে সমস্যার আজও সমাধান হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই ইসলামাবাদ ও তেহরানের মধ্যে যেকোনো ‘উষ্ণ’ সম্পর্ক সব সময়ই ছিল লেনদেনভিত্তিক। যখন নিরাপত্তার কারণে দুই দেশ একে অপরের প্রয়োজন অনুভব করত, তখনই সেই সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হতো, মুসলিম ঐক্যের কোনো যৌথ স্বপ্ন থেকে নয়।
২০১৮ সালে ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী হলে তিনি প্রকাশ্যে জানিয়ে দেন যে তিনি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার, আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং পাকিস্তানকে মুসলিম বিশ্বের পুনর্জাগরণের অংশ করার পক্ষে। তিনি ইরানকে এই দৃষ্টিভঙ্গির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখেছিলেন, বিশেষ করে পাকিস্তানের বিদেশনীতিতে ওয়াশিংটন ও উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলির দমবন্ধ করা আধিপত্য থেকে মুক্তি পেতে। ইমরান তেহরানের সঙ্গে সম্পর্কের পরিবেশ কিছুটা উন্নত করলেও তাঁর বৃহত্তর আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গি হঠাৎ থেমে যায় ২০২২ সালের এপ্রিলে তাঁর ক্ষমতাচ্যুতির মাধ্যমে। ক্ষমতায় আসেন জেনারেল আসিম মুনির। যিনি ওয়াশিংটনের কক্ষপথে থাকতে অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। অথচ কী এক অদ্ভুত বৈপরীত্য! যখনই বিপদের আঁচ পান, ইরানি কর্তাদের সঙ্গে একসঙ্গে চায়ের কাপে চুমুক দেন। ইরান বহু আগেই এই দ্বিমুখী খেলা বুঝে গিয়েছে। তেহরান বুঝতে চাইছে, ট্রাম্প ঘনিষ্ঠ ইসলামাবাদের আসল উদ্দেশ্য কী? যুদ্ধ বন্ধ করা নাকি বিশ্বাসঘাতকতা করা! ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ বলেছেন, ‘শত্রু পক্ষ প্রকাশ্যে আলোচনার বার্তা পাঠাচ্ছে এবং গোপনে স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমাদের বীর যোদ্ধারা মার্কিন সেনাদের জন্য অপেক্ষা করছে। ইরানি মাটিতে পা রাখামাত্রই তাদের পুড়িয়ে মারা হবে।’ ফলে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা কতটা ‘সাকসেস’ হবে তা নিয়ে শুরুতেই প্রশ্ন উঠে গিয়েছে।
পাকিস্তানের সামরিক শাসকরা হয়তো ভাবছেন, মধ্যস্থতার মাধ্যমে ওয়াশিংটনের প্রত্যাশা আর তেহরানের সতর্কবার্তার মধ্যে ভারসাম্য রাখা যাবে। তাতে তাদের জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল থাকবে। ভঙ্গুর অর্থনীতির উপর ক্রমাগত চাপ সামলানো যাবে। যুদ্ধের হাত থেকেও রেহাই পাওয়া যাবে। কিন্তু কিছু দিন আগেই সৌদি আরবের সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে পাকিস্তান। জানা গিয়েছে, সৌদি আরব তেহরানের উপর হামলা অব্যাহত রাখতে ট্রাম্পকে উস্কানি তো দিচ্ছেই, সঙ্গে নিজেও যুদ্ধে যোগ দিতে ইচ্ছুক। সৌদি এই যুদ্ধে যোগ দিলে প্রতিরক্ষা চুক্তির শর্তে পাকিস্তানকেও যুদ্ধে জড়াতে হবে, যা ইসলামাবাদের জন্য বিপদ ডেকে আনবে।
প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, আপনি যদি একসঙ্গে দুই ‘মাফিয়া ডন’-কে পরিষেবা দিতে চান, দু’জনই একসময় আনুগত্যের প্রমাণ চাইবে। ‘প্রো-আমেরিকান’ পাক নেতারা তখন কার পক্ষ নেবেন?