নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি ও কলকাতা: পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের বেশকিছু কাজ নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে তৃণমূলের অন্দরে। বিশেষ করে গণনার দিন আইপ্যাকের প্রতিনিধিদের ভোট ময়দান ছেড়ে দেওয়া নিয়ে সন্দেহ আরো গভীর হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, তৃণমূলের সঙ্গে আইপ্যাকের সম্পর্ক আর থাকবে কি না? তৃণমূলের অন্দরের খবর, চুক্তি প্রায় শেষের পথে। বাংলার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ও তামিলনাড়ুর ডিএমকে নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের জন্য এই সংস্থাকেই কাঠগড়ায় তুলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। আগামী বছর উত্তরপ্রদেশে বিধানসভা নির্বাচনের আগে একই পথে হাঁটল সমাজবাদী পার্টিও। মহারণের জন্য ওই সংস্থার সঙ্গেই চুক্তি করেছিল অখিলেশ যাদবের দল। কিন্তু, বঙ্গে তৃণমূলের বিপর্যয়ের পর সেই নিয়ে আর এগতে চাইছে না তারা।
২০১৯ সালের ২৯ জুলাই ‘দিদিকে বলো’ কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি বা আইপ্যাক বাংলায় পথ চলা শুরু করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তৃণমূল ও আইপ্যাকের সম্পর্ক আরো গভীর হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন জনমুখী কর্মসূচি নিয়ে তৃণমূলের জয়ের রাস্তা মসৃণ করার দিকে সহযোগিতা করে আইপ্যাক। দিদির দূত, দিদির সুরক্ষা কবচ, তফসিলি সংলাপ প্রভৃতি ছিল আইপ্যাকের মস্তিষ্কপ্রসূত কিছু কর্মসূচি। ২০২১ সালের বিধানসভা এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলের বিপুল জয়ের পিছনে আইপ্যাকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। মনে করা হয় যে, লোকসভা নির্বাচনের পর থেকে আইপ্যাকের একচ্ছত্র ক্ষমতা পছন্দ ছিল না তৃণমূলের বর্ষীয়ান নেতাদের। বিষয়টি তাঁরা দলকে জানিয়েও ছিলেন বলে শোনা যায়। আইপ্যাক বিধানসভা এলাকা ভিত্তিক যে রিপোর্ট তৃণমূলের শীর্ষ নেতাদের কাছে পাঠাত, তাতে ‘জল’ মেশানো থাকত বলে খবর। কেননা, পরামর্শদাতা সংস্থা কিছু কর্মী জেলা তৃণমূলের কোনো বড়ো নেতার অত্যন্ত কাছের হয়ে উঠেছিলেন। ফলে যে সংস্থার পরামর্শ দেওয়ার কথা, তারা সঠিক রিপোর্ট দিত না বলে অনেকেরই মত।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় তৃণমূলের পরামর্শদাতা সংস্থা। তাদের বিধানসভা আসন ভিত্তিক রিপোর্টকে গুরুত্ব দেয় দল। কিন্তু অনেক বিধায়ককে এবার প্রার্থী না করা, অনেক বিধায়কের আসন পরিবর্তনের যে রিপোর্ট আইপ্যাক দিয়েছিল, তা বাস্তবসম্মত ছিল না বলে মনে করা হচ্ছে। এবার তৃণমূলের যে খারাপ ফল হয়েছে, তার জন্য আইপ্যাকের ভুল রিপোর্ট বহুলাংশে দায়ী বলে মনে করা হচ্ছে। তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হল, বাংলায় প্রথম দফার ভোটগ্রহণ ছিল ২৩ এপ্রিল। কিন্তু ১৯ এপ্রিল আইপ্যাকের কর্মীদের কাছে ইমেইল করে জানানো হয়, আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে আপাতত কাজ বন্ধ! ১১ মে-র পর কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে। তৃণমূল নেতৃত্বের একটি অংশ এই নির্দেশ নিয়েই সন্দিহান। যদিও আইপ্যাকের কিছু কর্মী সল্টলেকের মূল অফিস ছেড়ে অন্য একটি জায়গায় কাজ করছিলেন বলে বিশ্বস্ত সূত্রের খবর। আর জেলায় কয়েকজন আইপ্যাকের কর্মী বাড়িতে থেকে কাজ করছিলেন। ভোটের দুদিন পরামর্শদাতা সংস্থার কর্মীদের পাওয়া যায়নি বলে তৃণমূল প্রার্থীদের দাবি। আরো গুরুত্বপূর্ণ হল, ৪ মে গণনার দিন ভোট ময়দান ছেড়ে দেন ওঁরা।
সূত্রের খবর, অন্য একটি তৈরি অফিসে বসে আইপ্যাকের কর্মীরা কাজ করছিলেন, তাঁরা গণনার দিন বেলা ১২টার পর নিষ্ক্রিয় হতে শুরু করেন। আর দুপুর ২টোর পর সকলে বাড়িমুখী হন। আর এখন কর্মীরা বলে দিয়েছেন ছুটিতে আছেন। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন পর্যন্ত আইপ্যাক-তৃণমূলের গাঁটছড়া ছিল। যেহেতু এখন তৃণমূল শাসন ক্ষমতায় নেই, ফলে সম্পর্কের চুক্তিতে ছেদ পড়ছে বলেই খবর! দলীয় সূত্রের খবর, তৃণমূল-আইপ্যাক চুক্তি আর পুনর্নবীকরণ হচ্ছে না।
এদিকে, তামিলনাড়ুতে হিরোর মর্যাদা পাচ্ছেন আইপ্যাকের প্রাক্তন কর্তা কপিল সাহু। বলা হচ্ছে, বিজয়ের দল টিভিকের বিপুল জয়ের নেপথ্যে রয়েছে তাঁর ক্ষুরধার মস্তিষ্ক।