Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

প্রাতিষ্ঠানিক যড়যন্ত্র

সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা হল নির্বাচন। বিধানসভা/লোকসভার সদস্যরা নাগরিকদের ভোটেই নির্বাচিত হন। তৈরি হয় মানুষের পছন্দের সরকার

প্রাতিষ্ঠানিক যড়যন্ত্র
  • ২৬ মার্চ, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা হল নির্বাচন। বিধানসভা/লোকসভার সদস্যরা নাগরিকদের ভোটেই নির্বাচিত হন। তৈরি হয় মানুষের পছন্দের সরকার। এজন্য নির্বাচন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা জরুরি। একমাত্র স্বচ্ছতার নীতিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনই মানুষের জন্য সরকার গড়ে দিতে পারে। আর এই নির্বাচন ব্যবস্থায় বড়োসড়ো ত্রুটি থাকলে তা গোড়ায় গলদ হয়ে যায় বইকি! খারাপ শুরু থেকে ভালো কিছু হতে পারে না। আমরা জানি, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাই এদেশে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। কেননা, তাঁরাই আইন প্রণয়নের অধিকারী। তাঁদের সমর্থনে তৈরি সরকারই পাঁচ বছরের জন্য রাজ্য/দেশ গঠনের নীতি ও পরিকল্পনা রচনা ও রূপায়ণ করে। ভোটদানে সমস্ত যোগ্য নাগরিকের অংশগ্রহণ ছাড়া কল্যাণকামী সরকার গঠনের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে পারে না। যদি কোনো এক বা একাধিক শ্রেণির নাগরিক ভোটদানে বঞ্চিত হন, কিংবা তাঁদের অংশগ্রহণ কমে যায় তবে সেই নির্বাচনে প্রকৃত জনমত প্রতিফলিত হয়নি বলেই ধরে নিতে হবে। এমন নির্বাচনের বদান্যতায় গঠিত সরকার ভোটদানে বঞ্চিত শ্রেণির বিপক্ষে পরিচালিত হওয়ার আশঙ্কা অমূলক নয়। তাই স্বচ্ছতা নিরপেক্ষতা প্রশ্নাতীতভাবে রক্ষা করা চাই ভোটার তালিকা তৈরি থেকেই। এরপর নির্বাচনি প্রচার, ভোটগ্রহণ, ভোটগণনা, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের শংসাপত্র প্রদানসহ পুরো প্রক্রিয়াটিই ত্রুটিমুক্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়। বিশেষ করে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন এবং অর্থায়নও রুখে দেওয়া দরকার সর্বতোভাবে। আমাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা এই যে, ভোট এলেই টাকা ওড়ে। ভোটারদের প্রভাবিত করা থেকে ঘোড়া কেনাবেচার নিমিত্ত যে হারে কালো টাকার দাপট দেখা যায়, তাতে ভুলেই যেতে হয় যে ভারত আজও একটি নিম্নমধ্য আয়ের দেশ—ধনী দেশ দূর, মধ্য আয়ের দেশ হয়ে উঠতে পারবে কবে তা অর্থনীতির বাঘা পণ্ডিতদেরও অজানা। তাই সাবধান হওয়ার পরামর্শ বারবারই দিয়ে থাকে সুশীল সমাজ। 

Advertisement

কিন্তু কোথায় কী! নির্বাচন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনার প্রথম পাঠ হিসাবে এবার শুরু হয়েছে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)। শুনলে মনে হবে যে স্বাগত জানাবার মতোই একটি পদক্ষেপ। কিন্তু বিহারের পর, গত কয়েক মাসে এসআইআর নিয়ে বাংলাজুড়ে যে কাণ্ড চলছে তা বেনজির। ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে, বস্তুত যে কাজটি হচ্ছে তা নাগরিকদের চরম হেনস্তা ছাড়া কিছু নয়। এসআইআর যন্ত্রণা ইতিমধ্যে শতাধিক সহনাগরিকের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। মৃতদের মধ্যে আতঙ্কিত ভোটারের পাশাপাশি আছেন একাধিক বিএলও! লক্ষ লক্ষ নাগরিকের নাম বাদ দিয়েই তৈরি হয়েছিল খসড়া তালিকা। অতঃপর শুনানিতে যাবতীয় নথিপত্র পেশ করা সত্ত্বেও বহু মানুষকে স্বস্তি দেয়নি জাতীয় নির্বাচন কমিশন (ইসিআই)। চূড়ান্ত তালিকায় কাটা পড়েছে আরও বহু নাম। কয়েক লক্ষ নাগরিকের ভবিষ্যৎ ‘বিচারাধীন’ (আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন) করে দেওয়া হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে একদল বিচারক নিযুক্ত হয়েছেন এই জট কাটাবার জন্য। তাঁদের বিচারে কয়েক লক্ষ ভোটার নিজ নিজ নাম প্রথম সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় দেখতে পেলেও এখনো বহু নাগরিকের সেই সৌভাগ্য হয়নি। তাঁদের নাম সটান কেটে দেওয়া (ডিলিটেড) হয়েছে এবং নিদান দেওয়া হয়েছে ট্রাইবুনালে আবেদন করার জন্য! শুধু তাই নয়, প্রথম সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট প্রকাশ নিয়ে সিইও অফিস যে নাটক করেছে তাও সর্বার্থে নিন্দনীয়। বিনা দোষে এত মানুষকে কেন এই অভূতপূর্ব শাস্তি প্রদান, তার কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি কলকাতার সিইও অফিস কিংবা নয়াদিল্লির নির্বাচন সদন। এই অগণতান্ত্রিক কারবারের বিরুদ্ধে জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুরু থেকেই খড়্গহস্ত। ধাপে ধাপে যন্ত্রণার বৃদ্ধির তীব্র নিন্দা করেছেন তিনি। তিনি রীতিমতো বিঁধেছেন মধ্যরাতে অতিরিক্ত ভোটার তালিকার চক্রান্তকে। মধ্যরাতের গোপন কারবারের পিছনে বিজেপির কালো হাত রয়েছে বলেই তোপ দেগেছেন তিনি। 
এই প্রসঙ্গে রাজ্য প্রশাসনের সমস্ত স্তরের কিছু কর্তাকে একতরফাভাবে সরিয়ে দেওয়া এবং আরও একাধিক আপত্তিকর পদক্ষেপের দৃষ্টান্ত সামনে রেখেছেন মমতা। সন্দেহ সবচেয়ে বেশি জোরদার হয়েছে নাম বাদে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায় বিশেষভাবে টার্গেট হয়ে যাওয়ায়। বসিরহাট, মালদহ, নন্দীগ্রাম, এন্টালি প্রভৃতি বহু স্থানে পাইকারি হারে মুসলিম নাগরিকদের নাম ‘ডিলিটেড’ হয়ে যাওয়ার অভিযোগটি মারাত্মক। বুঝতে অসুবিধা হয় না, এই ঘোর অন্যায় মেনে নিয়েই ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়ে গেলে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল বাড়তি সুবিধা পেয়ে যেতে পারে। সারা দেশ জানে, মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত। অন্যদিকে, বিজেপি এবার বাংলা দখলের খোয়াব দেখছে চূড়ান্ত মেরুকরণের ভরসায়। তাই কমিশনের বেনজির কায়দাটি প্রাতিষ্ঠানিক যড়যন্ত্রেরই নামান্তর হয়ে উঠেছে বইকি! এই বদনাম ঘোচাবার দায়িত্ব এখন কমিশনের। সংবিধান এবং গণতন্ত্রের পবিত্রতা তারা রক্ষা করবে কি না, ইসিআই এবার ঠিক করুক। না-হলে মানুষই তাদের অধিকার বুঝে নেবে।

সম্পর্কিত সংবাদ