ব্রতীন দাস, জলপাইগুড়ি: ভুটান পাহাড়ের গা বেয়ে শীতের সকালের মিঠে রোদ কমলা বাগানে চুইয়ে পড়তেই যেন প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে বক্সা। ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৮৪৪ ফুট উঁচুতে অবস্থিত বক্সা পাহাড় যতটা মোহময়ী, ঠিক ততটাই শিল্পীর তুলির ছোঁয়ায় ছবির মতো সুন্দর এখানকার ডুকপাদের গ্রামগুলি। বক্সা ফোর্ট, বক্সা সদর, লেপচাখা, তাসিগাঁও, আদমার মতো সবমিলিয়ে এখানকার ১৪টি পাহাড়ি গ্রামে পাঁচশোর কিছু বেশি ডুকপা পরিবারের বাস। এঁদের পূর্বপুরুষরা প্রত্যেকেই ড্রুক ইউল অর্থাৎ বজ্র ড্রাগনের দেশ ভুটানের আদি বাসিন্দা। কিন্তু ১৮৬৪ সালে ইন্দো-ভুটান যুদ্ধের পর যখন বক্সা ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার অধীনে আসে, তখন ওই ডুকপাদের পূর্বপুরুষরা আর ভুটানে ফিরে যাননি। পাহাড়, জঙ্গল, নদী, পশুপাখির সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক মৌলিক। ভারতের একেবারে শেষপ্রান্তে আলিপুরদুয়ার থেকে ৩০ কিমি দূরে বক্সা পাহাড়ে পা রাখলে চাক্ষুষ করা যায় ডুকপাদের জীবনযাপন, সংস্কৃতি। খাওয়াদাওয়া থেকে পোশাক পরিচ্ছদ, গান-বাজনা, খেলাধুলো সবতেই আজও এই জনগোষ্ঠীর নিজস্বতা বহমান। ডুকপাদের এই ‘লিভিং হেরিটেজ’কেই এবার বিশ্ব পর্যটনের মানচিত্রে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
যেখানে এলে শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য কিংবা পাহাড়ি-রোমাঞ্চের হাতছানি নয়, মিলবে অনেক অজানা ইতিহাসের খোঁজ। এখানেই রয়েছে স্বাধীনতা আন্দোলনের স্মৃতি বিজড়িত বক্সা দুর্গ বা বক্সা ফোর্ট। অগ্নিযুগের বহু বিপ্লবী বন্দি ছিলেন এই দুর্গে। ভূপেন মজুমদার, ত্রৈলোক্য মহারাজ, বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের হেমচন্দ্র ঘোষ এমনকী নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুও কিছুদিনের জন্য বন্দি থেকেছেন বক্সা জেলখানায়। শেষদিকে বন্দিদের মধ্যে ছিলেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। শ্বেতপাথরের ফলকে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্দেশে বক্সা ফোর্টের বন্দিদের লেখা কবিতা আজও রয়েছে দুর্গের সামনে। ১৯৩১ সালে রবীন্দ্র-জন্মদিবসে তাঁকে উদ্দেশ করে বক্সার বন্দিরা লিখেছিলেন ‘ওগো কবি/তোমায় আমরা করি গো নমস্কার’।
ডুকপাদের লিভিং হেরিটেজকে সামনে রেখে বিশ্ব পর্যটনে বক্সা পাহাড়কে জুড়তে এগিয়ে এসেছে অ্যাসোসিয়েশন ফর কনজারভেশন অ্যান্ড ট্যুরিজম এবং ভুটান-ইন্ডিয়ান ফ্রেন্ডশিপ অ্যাসোসিয়েশন। এব্যাপারে উদ্যোগী আলিপুরদুয়ার জেলা প্রশাসনও। আগে সান্তালাবাড়ি পর্যন্ত গাড়ি আসত। এখন আরও কিছুটা এগিয়ে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত গাড়ি আসছে। তবে পাহাড়ি দুর্গম পথ। তাই সান্তালাবাড়ি থেকে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত যেতে স্থানীয় চালকদের কাছ থেকে গাড়ি ভাড়া নিতে হয়। জিরো পয়েন্ট থেকে বক্সা দুর্গে পৌঁছতে ট্রেকিং করতে হয় প্রায় দুই কিমি পথ।
বক্সা পাহাড়ের সবচেয়ে উঁচু জায়গাটি সিঞ্চুলা রেঞ্জ। যার একদিকে ভুটান, অন্যদিকে ভারত। বক্সা পাহাড়জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে ছোট ছোট ডুকপা গ্রাম। নিজস্ব ঐতিহ্য ধরে রাখতে মরিয়া এইসব গ্রামের বাসিন্দারা। নিজেদের হাতে তৈরি রঙিন পোশাক পরেন তাঁরা। হাতে তৈরি গয়নাতেই সাজেন মহিলারা। ডুকপাদের খাবারদাবারে যেমন অভিনবত্ব রয়েছে, তেমনই তাঁদের প্রিয় খেলা ‘ডার্ট’ স্থানীয় ভাষায় খুড়ু এবং তিরন্দাজিতে ছেলেমেয়েদের পারদর্শিতা দেখলে অবাক হতে হয়। ডুকপাদের জনপ্রিয় লেবে গান এবং বিশেষ বাদ্যযন্ত্র ড্রাম আইমের সুর মুগ্ধ করে।
এর আগে বক্সা দুর্গে সেভাবে পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা ছিল না। কিন্তু পর্যটনে ভর করে এখন ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে হোম স্টে। ডুকপারা নিজেদের বাড়িতেই অতিথি হিসেবে স্বাগত জানাচ্ছেন ট্যুরিস্টদের। তাঁদের আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়ে দেশ-বিদেশের পর্যটকরাও বক্সা পাহাড়ে আসতে শুরু করেছেন। এই মুহূর্তে গোটা বক্সা পাহাড়ে ৬৪টির মতো হোম স্টে তৈরি হয়েছে। পর্যটকদের লাগেজ বহন করে নিয়ে যাওয়ার জন্য রয়েছেন ৩০ জন পোর্টার। এছাড়াও গাইডের প্রশিক্ষণ নিয়ে পর্যটকদের বক্সা পাহাড় চেনাচ্ছেন ২০ জন স্থানীয় যুবক।
অ্যাসোসিয়েশন ফর কনজারভেশন অ্যান্ড ট্যুরিজমের আহ্বায়ক রাজ বসু বলেন, বক্সা পাহাড়ে ডুকপা গ্রামগুলির লিভিং হেরিটেজকে আমরা দেশ-বিদেশের পর্যটকদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। এই লক্ষ্যে গতবছর থেকে ফেস্টিভালও হচ্ছে। এবারের ফেস্টিভালে মহারাষ্ট্র, কেরল, হিমাচলপ্রদেশ সহ দেশের বিভিন্ন রাজ্যের পর্যটন কর্তারা যোগ দিয়েছেন। ভুটানের তরফেও আমরা সহযোগিতা পাচ্ছি। • নিজস্ব চিত্র।