সন্তানের কাছে মাতৃঋণ আজীবনের। নিজের মাকে নিয়ে কতই না গল্প জড়িয়ে আছে জীবনের নানা বাঁকে। কিন্তু মায়েদের কথা আলাদা করে বলা হয় কই? বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা লিখছেন তাঁদের মায়ের কথা।
এই পর্বে ইন্দ্রাণী সেন ও শ্রাবণী সেন।
সন্তানের কাছে মাতৃঋণ আজীবনের। নিজের মাকে নিয়ে কতই না গল্প জড়িয়ে আছে জীবনের নানা বাঁকে। কিন্তু মায়েদের কথা আলাদা করে বলা হয় কই? বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা লিখছেন তাঁদের মায়ের কথা।
এই পর্বে ইন্দ্রাণী সেন ও শ্রাবণী সেন।
রুপুর (শ্রাবণী সেন) সঙ্গে আমার ১০ বছরের তফাত প্রায়! তাই মাকে আমি ওর চেয়ে বেশিদিন পেয়েছি। আমিই আগে বলি। আমারই আগে বলা উচিত। আমার ‘ইন্দ্রাণী সেন’ আর রুপুর ‘শ্রাবণী সেন’ হয়ে ওঠার নেপথ্যে প্রধান কারিগর আমাদের মা সুমিত্রা সেন। বাবাও ভীষণ সাপোর্টিভ ছিল। মাকে আমরা দুই বোনই খুব ভয় পেতাম। আমার গানে হাতেখড়িও মায়ের কাছে। মা শাসনও করত, ভালোওবাসত। ছোটবেলায় যত প্রতিযোগিতায় নাম দিয়েছি, মা সেখানে গিয়ে হারমোনিয়াম বাজাত। পড়াশোনা নিয়েও মা খুব সিরিয়াস ছিল, তার খেসারত অবশ্য আমার চেয়ে রুপু বেশি দিয়েছে! কী বল?
সে আর বলতে! দিদিভাই (ইন্দ্রাণী সেন) তো ক্লাসে ফার্স্ট হতো। আর আমার ওসব ফার্স্ট টার্স্ট হওয়া পোষাত না, ধুর! আমার ক্লাসে ওঠা নিয়ে দরকার। ফার্স্ট হলেও উঠব, ৪০-৫০ পেলেও উঠব। দুটোতেই যখন ক্লাসে উঠব, তাহলে অত ফার্স্ট হওয়ার খাটনি খেটে কী হবে? আমি বরাবরই এই ধারণায় বিশ্বাসী। একেবারে ছোট থেকে। দিদিকে সবাই ভালো বলে, তুইও তো চেষ্টা করতে পারিস— মা বলত, আবার জানতও, আমার ওসব কথায় কিছুই যায় আসে না।
ছোটবেলায় মা আমাকে পড়াত, তারপর আমার পড়াশোনা দিদিভাইয়ের জিম্মায় চলে গেল। দিদিভাই খুব ভালো টিচার! ও একবার যা পড়াত, একদম ছবির মতো মনে থাকত। আমি ছিলাম টমবয়, আর দিদিভাই একেবারে লক্ষ্মী মেয়ে...!
(বোনকে থামিয়ে) রুপুর জীবনের একটা কথা তো আমি এখানে বলবই! ও না বললেও। রুপু পাঠভবনে পড়ত। খুব ফাঁকিবাজ ছিল। আমরা তখন ব্রড স্ট্রিটের বাড়িতে থাকি। পাড়াতেই একজনের কাছে ওকে টিউশন দেওয়া হয়েছিল। একদিন মা আমাকে বলেছে, ‘যাও ছোট বোন পড়তে গিয়েছে, ওকে নিয়ে এসো।’ আমি ওর টিউশন টিচারের বাড়ির গলির সামনে যেই পৌঁছেছি, সেখান থেকেই আমি শুনতে পাচ্ছি, ওর টিচার বলছেন, ‘হু ওয়াজ অশোকা?’ ওদিক থেকে কোনও সাড়াশব্দ নেই। বুঝলাম, ইতিহাস পড়া ধরছেন, অশোক কে ছিলেন! কিন্তু সে আর কে বলবে, ছাত্রী তো চুপ! টিচারের গলা উত্তরোত্তর বাড়ছে। ছাত্রী চুপ! শেষে যখন ওঁর বাড়ির জানলার কাছে চলে গিয়েছি, তখনই ঘটল বিস্ফোরণ! টিচার এত হতাশ হয়েছেন যে এবার বলছেন, ‘হু ওয়াজ অশোকা? ওয়াজ হি আ ম্যান অর আ গোট!’ মানে, অশোক একটা লোক না ছাগল, এটুকু অন্তত বলো (প্রবল হাসি)! তখন হঠাৎ আমাকে দেখে বললেন, ‘নিয়ে যাও বোনকে, ওর দ্বারা কিস্যু হবে না।’ টিচার তো গম্ভীর, রুপু আরও গম্ভীর। টিচারের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমাকে বলল, ‘শোন, মেজাজটা খারাপ হয়ে আছে, একটু ফুচকা খাওয়া তো!’ এই হল আমার রুপু! সাংঘাতিক উইটি। খুব বুদ্ধি। কিন্তু ফাঁকিবাজ! মা কিন্তু দুই মেয়েকেই বেশ শাসন করতেন রেগে গেলে। তখন রবীন্দ্রভারতীতে পড়াতেন। আর রুপু মায়ের সব ক্রিম মেখে মুখ সাদা করে বসে থাকত। আর মা মারত রেগে গিয়ে!
(দিদিকে থামিয়ে) ও আমি একা মার খেয়েছি নাকি! তুই মার খাসনি বুঝি (হাসি)? দিদিভাই পড়াশোনার জন্য মার খায়নি ঠিকই, তবে দিদিভাই মার খেত বিয়েবাড়িতে বেশি খেয়ে ফেলে বাড়ি এসে শরীর খারাপ করলেই। আমাদের মায়ের গাঁট্টা ছিল ফেমাস! দিদিভাই লোভে পড়ে বেশি খেয়ে এলে বাড়িতে ফিরে শরীর খারাপ হতো। ব্যস, মা চুলের মুঠি ধরে দিত আচ্ছা করে! তার মানে অবশ্য একা দিদিভাই-ই খেতে ভালোবাসে এমন নয়, আমরা দু’জনেই খেতে ভালোবাসি। আমাদের মা-ও খেতে ভালোবাসত। কিন্তু কেউই বেশি খেতে পারি না। মা খাওয়াতেও ভালোবাসত। এত ব্যস্ত ছিল তো, কিন্তু আমার মা-বাবা দু’তরফের আত্মীয়রাই মাকে খুব ভালোবাসত, সবকিছুতে মাকে চাইত। মাও সব সামাল দিয়েছে নিজের হাজারো ব্যস্ততার পরেও।
রুপুর ভোজনরসিকতার অন্য অনেক নজির আছে। আমার তখন বিয়ে ঠিক হয়েছে। মা-বাবা বলল, ‘তোমরা একান্তে কথা বলার জন্য যদি বাইরে কোথাও যেতে চাও, যেতে পারো। আমি তখন আমার বর্তমান বরের সঙ্গে লেকে এসে গল্প করতাম। রুপু তখন ক্লাস ফোর, কিন্তু এত পাজি ছিল যে বায়না করত আমিও যাব। ব্যস, মা-ও বলত, বোনকে নিয়ে যাও। আমরা ওকে এক ঠোঙা চিনেবাদাম কিনে দিতাম। ও পাশে বসে বাদাম খেত আর আমরা গল্প করতাম। ওর ধান্দা কিন্তু অন্য ছিল! ওখানে তখন একটা দারুণ চীনে রেস্তরাঁ ছিল। রুপুর টার্গেট ছিল ফেরার পথে আমার বরের পকেট খসিয়ে ওই রেস্তরাঁয় খাওয়া (হাসি)!
এই যে শুরুতে আমি বললাম, রুপু ১০ বছরের ছোট, তাই মাকে নিয়ে আমিই আগে বলব। কিন্তু মাকে কাছ থেকে বেশি পেয়েছে রুপুই। আমার ১৮ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছে। তারপর তো রুপুই ছিল মায়ের সঙ্গে। মা রুপুর কাছেই ছিল শেষ দিন অবধি। কোভিডের সময় তো ওরা দু’জন মিলে রোজই প্রায় নানারকম জিনিস রেঁধেছে। মা একদিন এটা বানাচ্ছে তো রুপু একদিন ওটা! আমরাও ওই সময় খুবই চিন্তায় ছিলাম, গোটা পৃথিবী ভালো ছিল না, তার মাঝেই মাকে খুশি রাখার চেষ্টা করত রুপু।
হ্যাঁ, বল দিদিভাই, তখন তো নিত্যনতুন নানা রান্নার ফরমায়েশ করত মা। আমার শরীরের জন্য কিছু কিছু খাবারে বাধানিষেধ আছে। ধুর! তখন কে অত মানে! আজ লুচি, কাল আলুর পরোটা। আহা! মা আসলে ভীষণ আটপৌরে। মায়ের ভিতর সেলিব্রিটিসুলভ কিছুই আমরা পাইনি। তাই আমি ও দিদিভাই কেউই সেলিব্রিটি ভাবতে পারিনি নিজেদের। আজও পারি না। মা এত উঁচু জায়গায় ছিলেন, এত ব্যস্ত ছিলেন, তার পরেও আমাদের জন্মদিনে নিজের হাতে রান্না করে খাওয়াত, আমাদের ফ্রক নিজের হাতে তৈরি করে দিত। তারপর আত্মীয়দের জন্মদিন বা বিয়ের তারিখ মনে রাখা, বাড়িতে ভালো আম এলে সকলের বাড়ি পাঠানো সবদিকে মায়ের খেয়াল ছিল। এই সব গুণ আমাদের মায়ের ছিল। দারুণ রান্না করত। এমনকী, আমাদের বাড়িতে যাঁরা গৃহকার্যে সাহায্য করত, তারা সকলে যে আমাদের দাদা-দিদি, ‘কাজের লোক’ নয়, এটা মা শিখিয়েছে। মায়ের ছিল অদম্য মনের জোর। জানো, একদিন হঠাৎ বলল, আর পাবলিকলি গান গাইব না। কত অনুরোধ এল, রেডিও, নানা মঞ্চ, দেশ-বিদেশের অনুরোধ। মা অনড়। বলল, নতুনদের সুযোগ দিতে হবে।
খুব শৌখিন মানুষ ছিল। রাবীন্দ্রিক সাজে থাকতে ভালোবাসত। সেই গুণটা পেয়েছে দিদিভাই। মায়ের কাছে গাঁট্টা আমিও অনেক খেয়েছি। আমাদের মায়ের গাঁট্টা ছিল বিখ্যাত। আর দিদি এত ভালো যে আমার গাঁট্টা খাওয়ার পরিমাণও বাড়ত (হাসি)।
দিদির বিয়ে হল, তারপর ১৯৯০ সালে বাবাও চলে গেল। তারপর থেকে তো মায়ের সঙ্গে আমিই ছিলাম। মাকে যে আমি অনেকদিন পেয়েছি, এটা খুব আনন্দের। মা চলে যাওয়ার পর এলোমেলো হয়ে গিয়েছি পুরো। দিদিভাই সামলায় এখন মায়ের মতো। আমি কোনওদিনই গোছানো নই, দিদিভাই খুব গোছানো। ওকে এখন আমারও খেয়াল রাখতে হয় মায়ের মতো। মাকে আমরা দুই বোন মিলে খুব ভালো রাখতে চেয়েছিলাম, হয়তো পেরেওছিলাম কিছুটা...। এটাই আমাদের সাফল্য।