Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

২০২৫ সালের ভারতীয় শব্দ

এরই প্রতিক্রিয়ায় ‘অপারেশন সিন্দুর’ অভিযান চালানো হয়। এটি ছিল একটি ইচ্ছাকৃত যুদ্ধ।

২০২৫ সালের ভারতীয় শব্দ
  • ৫ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

পি চিদম্বরম: ২০২৫ সাল সম্পর্কে আপনার সবচেয়ে স্থায়ী স্মৃতি কী? কোন শব্দটি সেই স্মৃতিকে ধারণ করবে? কোন শব্দটি ভারতের সর্বাধিক মানুষকে প্রভাবিত করেছে?

Advertisement


অস্থায়ী শব্দগুলি
একটি সুস্পষ্ট নমুনা হল সিন্দুর। ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির (এনআইএ) মতে, পহেলগাঁওয়ে সন্ত্রাসবাদী হামলাটি ঘটিয়েছিল তিন পাক জঙ্গি এবং তাদের আশ্রয়দাতা দুই ভারতীয় সহযোগী মিলে। এরই প্রতিক্রিয়ায় ‘অপারেশন সিন্দুর’ অভিযান চালানো হয়। এটি ছিল একটি ইচ্ছাকৃত যুদ্ধ। ভারতীয় বিমানবাহিনী, ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন পাকিস্তানের সামরিক পরিকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছিল। যুদ্ধে অনিবার্য, এমন কিছু ক্ষতির সম্মুখীন হতে হতে হয়েছিল ভারতকেও। সংঘর্ষে পাক জঙ্গি তিনজনেই নিহত হয়। তদন্তের সময় গ্রেপ্তার হওয়া দুই ভারতীয় সম্পর্কে এখনও কিছু জানা যায়নি। ফলাফল সম্পর্কে স্বচ্ছতার অভাব, যুদ্ধের উপর একটি প্রশ্নচিহ্ন হয়ে আছে এখনও। অপারেশন সিন্দুর স্থায়ী হয়েছিল মাত্র চারদিন এবং একটি স্থায়ী ছাপ ফেলার জন্য তা যথেষ্ট ছিল না।
আর একটি নমুনা হল ট্যারিফ বা শুল্ক। গত ২ এপ্রিল থেকে শব্দটি প্রতিটি আলোচনায় উঠে আসে। এর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী শব্দ ছিল ট্রাম্প! ট্রাম্প এবং ট্যারিফ বেশ কয়েকটি দেশের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে তোলে এবং এর কোনও শেষ এখনও হয়নি। উদাহরণস্বরূপ—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় রপ্তানির উপর পারস্পরিক শুল্ক এবং জরিমানা (রাশিয়ান তেল কেনার অপরাধে) এখনও বহাল রয়েছে। এই ঘটনা ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও তামা, বস্ত্র, রত্ন ও গয়না, সামুদ্রিক পণ্য এবং রাসায়নিক দ্রব্যের রপ্তানিকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। পীযূষ গোয়েলের ‘নিকট ভবিষ্যতে’ প্রতিশ্রুত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তিটি ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে যতটা দূরে ছিল, বছরের শেষ হলেও ততটাই দূরে রয়ে গিয়েছে।
জিএসটি একটি শক্তিশালী প্রতিযোগী। জিএসটি’র বিপর্যয়কর ‘অভিষেকের’ দীর্ঘ আটবছর পর, কেন্দ্রীয় সরকার সুপরামর্শে কান দেয়। আর তার ভিত্তিতে করের হার কাঠামোকে যুক্তিপূর্ণ করে তোলে এবং বহু পণ্য ও পরিষেবার উপর করের হার কমিয়ে আনে। তবে প্রশাসনিক হয়রানি বন্ধ হয়নি। ব্যবসায়ীদের প্রতিটি সংগঠন জিএসটি আইন মেনে চলার দুঃস্বপ্নের কথা উল্লেখ করেছে। খুচরো কেনাকাটায় কর ছাড় তুলনামূলকভাবে নগণ্য হওয়ার কারণে, উপভোগের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত শ্রীবৃদ্ধি দেখা যায়নি। তুলনামূলক বেশি উপভোগ সীমাবদ্ধ ছিল জনসংখ্যার উপরের দিকে দশ শতাংশের মধ্যেই।


যেসব শব্দ হারিয়ে গিয়েছে
একটি অপরিচিত শব্দগুচ্ছ—গোল্ডিলক্স ইয়ার অফ দি ইকোনোমি (অর্থনীতির জন্য গোল্ডিলক্স বছর)—আলোচনায় প্রবেশ করেও দ্রুত অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। সাহিত্যিকমূল্যের এই উপমাটি এমনকী শিক্ষিত মানুষের কাছেও অপরিচিত ছিল। এছাড়া, আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার (আইএমএফ) ভারতের জাতীয় হিসেবের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। প্রাক্তন প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা থেকে শুরু করে অধ্যাপক ও গবেষক পর্যন্ত অনেকেই অর্থনীতির দুর্বলতার উল্লেখ করেছেন। শেষপর্যন্ত, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত উদযাপনকে ছাপিয়ে গিয়েছিল চাকরির দাবিতে ওঠা কোলাহল। এখানে একটি কঠিন শিক্ষা রয়েছে এই যে, বর্তমান বৃদ্ধির হারে যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ভারত ২০২৫ সালে তাদের জিডিপিতে (স্থির মার্কিন ডলারে) নিম্নলিখিত ‘আউটপুট’ যোগ করবে:
চীন যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের (বৃহত্তম অর্থনীতি) সঙ্গে ব্যবধান কমিয়ে আনছে, তখন ভারত ও চীনের এবং ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ফারাকটা চওড়া হচ্ছে। ভারতীয় অর্থনীতিতে এমন অনেক দুর্বলতা রয়েছে, যেগুলি সরকার মানতে অথবা সম্ভবত বুঝতেই চায় না। ‘দ্য হিন্দু পত্রিকা’ তাদের একদিনের সম্পাদকীয় নিবন্ধে লিখেছে, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ শতাংশ শুল্ক এখনও বহাল আছে, মন্থর রয়েছে বেসরকারি বিনিয়োগ, বিদেশি পুঁজি দেশ থেকে পাততাড়ি গোটাচ্ছে, দুর্বল রুপি বা ভারতীয় মুদ্রা আমদানি-নির্ভর অর্থনীতির সৌজন্যে আমদানিকে আরও ব্যয়বহুল করে তুলছে, প্রকৃত মজুরি যথেষ্ট দ্রুত বাড়ছে না এবং উপভোক্তাদের চাহিদার মধ্যে চনমনে ভাবটা নেই।’ ‘গোল্ডিলক্স’ দাবিটি অন্তঃসারশূন্য।
একসময় বহুল ব্যবহৃত ‘সেকুলার (ধর্মনিরপেক্ষ)’ শব্দটি কার্যত অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। এটি বছরের ‘নন-ওয়ার্ড (অ-শব্দ)’-এ পরিণত হয়েছে। খুব কম লোকই গর্বের সঙ্গে নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ বলে পরিচয় দেয়। সম্পাদকীয় লেখকরা শব্দটি এড়িয়ে চলেন। মূলত, ধর্মনিরপেক্ষ মানে ছিল রাষ্ট্র ও ধর্মের পৃথকীকরণ, কিন্তু পরে এটি এমন অর্থ লাভ করেছে যে, একজন ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তির মূল্যবোধ ধর্মীয় মতবাদের উপর নয়, বরং যুক্তি ও মানবতাবাদের উপর ভিত্তি করে গঠিত।
নির্লজ্জ ‘বিজয়ী’
‘সেকুলারিজম (ধর্মনিরপেক্ষতা)’ পিছু হটার কারণে জন্ম হয়েছে ‘হেট’ বা ঘৃণার। শব্দটি প্রতিটি ধর্মেই নিন্দিত। দুঃখজনকভাবে, ঘৃণার ভাষণ এবং ঘৃণাভরা লেখার বেশিরভাগ উদাহরণই ধর্মের উপর ভিত্তি করে তৈরি। ঘৃণার অন্যসকল কারণ হল—জাতি, ভাষা এবং বর্ণ। সবচেয়ে স্পষ্ট ঘৃণা হল মুসলমানদের বিরুদ্ধে, মুসলমানদের পোশাক ও খাদ্যাভ্যাস এবং মুসলমানদের উপাসনালয়ের বিরুদ্ধে ঘৃণা। মুসলমানদের নামাজে বাধা দেওয়া হয় কিংবা তাকে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়। এর জন্য 
এই ‘চমৎকার’ যুক্তি দেখানো হয় যে, মুসলমানরা ভারত আক্রমণ করেছিল এবং ছয় শতাব্দী ধরে ভারতের অনেক অংশে শাসন কায়েম করেছিল তারা, এবং এটা যে আসলে তাদের জায়গা এখন হিন্দুদের সময় এসেছে মুসলমানদের তা দেখিয়ে দেওয়ার। ক্ষোভের অন্য লক্ষ্যবস্তু হল খ্রিস্টান সম্প্রদায়। খ্রিস্টান গির্জা ভাঙচুর করা হয়, খ্রিস্টান পুরোহিত ও ধর্মপ্রচারকদের হত্যা করা হয় এবং হামলা চলে ক্যারল গাওয়া খ্রিস্টান শিশুদের উপর। এই সবকিছু করা হয় হিন্দু ‘অধিকার’ প্রতিষ্ঠার নামে। হিন্দু সুপ্রিমেসি বা আধিপত্যের ধারণার চেয়ে ভারতের সংবিধানের পক্ষে অধিক ঘৃণ্য আর কিছুই হতে পারে না। ভারতের ধারণাটি নাগরিকত্বের মূল ভিত্তির উপর নির্মিত, ধর্ম বা জাতি বা বর্ণ বা ভাষার উপর নয়। ভারতীয় জনগণের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ডঃ আব্দুল কালাম এবং মাদার টেরেসাকে শ্রদ্ধা করে, কিন্তু অল্প সংখ্যক মানুষ মুসলমান ও খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ায়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি হল এই ধরনের অবৈধ কাজগুলিকে বৈধতা প্রদান বা স্বাভাবিক করার অপচেষ্টা। এর জন্য প্রধানত দায়ী রাষ্ট্র, গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন নেতাগণ এবং রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় বেপরোয়া হয়ে ওঠা কিছু সংস্থা। তাদের কথা, কাজ বা নীরবতা ঘৃণার বাহকদের ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে প্ররোচিত করে। এই প্রবণতা ভারতকে খণ্ড-বিখণ্ড করবে। অবশ্যম্ভাবীরূপে এটাই ঘটবে যে, আজকের ঐক্যবদ্ধ ভারতের ভিতরের সংকীর্ণ দেওয়ালগুলি টুকরো টুকরো হয়ে যাবে।
এই সমস্ত কারণে, গভীর লজ্জা ও অনুতাপের সঙ্গে, আমি সেই শব্দটি বেছে নিচ্ছি যেটি ফেলে আসা ২০২৫ সালে ভারতকে সংজ্ঞায়িত করেছিল: হেট বা ঘৃণা।
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ