সায়ন্তন মজুমদার: বঙ্গসাহিত্যে স্বাধীনতার কথা এসেছে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টের অনেক আগেই। উনিশ শতকে রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ‘কাকু বক্রোক্তি’ অলংকারের দুর্দান্ত প্রয়োগে বুঝিয়েছিলেন, ‘স্বাধীনতাহীনতায়’ কেউ বাঁচতে চায় না। কিন্তু স্বাধীনতা সত্যিই যেদিন এল, সেদিন কী উপলব্ধি ছিল সাহিত্যিকদের?
দুঃখবাদী কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত সাতচল্লিশের ১৪-১৫ আগস্ট, মধ্যরাতের সন্ধিক্ষণে রচনা করেন ‘মুক্তি’ কবিতা। পরবর্তীতে তা ঠাঁই পায় ‘ত্রিযামা’ কাব্যে। প্রথমেই তিনি লিখেছেন, ‘শুনিয়াছিনু—উদিবে তুমি তিমির-নিশি-শেষে/সূর্যসম সুদূরাচলে নবীন কোন প্রাতে।/অকস্মাৎ না-চলা পথে দাঁড়ালে দ্বারে এসে/শ্রাবণ-ঢাকা অন্ধকার চতুর্দশী রাতে।’ বর্ষার ‘অতিথিতম’, ‘অসময়েই সময়’ হওয়া এই স্বাধীনতা কবির দুয়ারে এসে দরজা খোলার ডাক দিয়েছে কবিতায়। ‘অসংখ্যের অশ্রুবারিধারা’ বুকে নিয়ে কবির ‘আঁধারে-কাঁদা বুকে’ এসেছে সেই ‘দুঃখঘন শতাব্দীর অন্ধকার’ মাখা স্বাতন্ত্র্য। দেশভাগ সহ নানা কারণে সেই ‘ব্যথার মতো ব্যাথী’-র ‘সর্বসম্ভাবনাময় ও-কালো-রূপ’-এর স্বাতন্ত্র্যের প্রতি প্রণতি জানিয়ে কবি সে দিন ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন —‘অপরিচিত সুহৃদ্বয়,/তোমারই কর ধরি/বাহির হনু বর্ষামাথে অজানা পথোপরি।’
সম্প্রীতির জীয়ন্ত মূর্তি, স্বাধীনতা সংগ্রামী-অধ্যাপক-রাজনীতিবিদ রেজাউল করিম প্রবন্ধচর্চার জন্য বিখ্যাত। কিন্তু তাঁর দরদী মন সেই দিন কলমকে কাব্যরসে জারিত করেছিল। লিখেছিলেন ‘স্বাধীন ভারত’ কবিতা। এর কয়েকটি লাইন পড়লে হিন্দু-মুসলিম উভয়পক্ষীয় মৌলবাদীরা উত্তেজিত হয়ে উঠতে পারেন—‘‘জয় হিন্দ রবে’ হুঙ্কার ধ্বনি কাঁপায়ে তুলিছে অবনী’ কিংবা ‘রাম রাজ্য মোদের লক্ষ্য—সত্য সেবক আমরা বীর’। কিন্তু শান্তি, স্বস্তি, ঐক্য-আদর্শের বাহক করিম সাহেবের লেখা পরের ছত্রগুলি সকলকেই ছত্রভঙ্গ করে দেয়—‘ন্যায়ের রাজ্যে প্রেমের বিধান, ইহাই ধর্ম জেনেছি স্থির।’ সকল ভারতবাসীকে জাগিয়ে তুলে রুদ্ধদ্বারকে মুক্ত করার আহ্বান ছিল তাঁর, ‘স্বাধীন ভারত! স্বাধীন ভারত! শিকলমুক্ত জননী মোর/আজকে পুণ্য প্রভাতে হেরিনু অমিয় হাসিটি আনলে[আননে]তোর।/সন্তান তব পাইল আজিকে মুক্তি-সুধার-মধুর স্বাদ/ঐ শুন দূরে আকাশে বাতাসে ধ্বনিয়া উঠিছে বিজয় নাদ।’
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় স্বাধীনতার পরের মাসেই, অর্থাৎ ১৩৫৪ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাসের ‘রংমশাল’ পত্রিকায় লেখেন ‘পনেরোই আগস্টের কবিতা’। আসলে এটি একটি অসাধারণ ছোটগল্প। মাত্র দেড়-দুই পাতার, তিনটি চরিত্রনির্ভর এই গল্পে স্বাধীনতার নানা মাত্রাকে তিনি হাজির করেছেন। গল্পের মূল চরিত্র একজন কবি, যিনি আসন্ন স্বাধীনতা দিবসকে নিয়ে কবিতা লিখতে চেয়েও পেরে উঠছেন না। কলকাতার দাঙ্গা-দুর্ভিক্ষ, বহু স্বাধীনতা সংগ্রামীর মুক্তি না পাওয়া, কিছু শয়তানের স্বাধীনতার নামে দেশের ঘাড় ভেঙে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা সত্ত্বেও সেই কবি বিশ্বাস করেন, ‘রাহুমুক্ত দেশটার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল!’ পাড়ার ইসলাম ধর্মাবলম্বী কেরানী-বন্ধুও স্বাধীনতার উৎসবে আন্তরিকভাবে যোগ দেবেন বলে জেনেছিলেন তিনি। দিন ঘনিয়ে এল। রাত্রি একটা পর্যন্ত ধস্তাধস্তি করেও কবিতা বেরল না তাঁর কলম দিয়ে। একসময় কবি ঘুমিয়ে পড়েন। স্বপ্নে দেখেন, মঞ্চে তিনি কবিতা হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন ঠিকই, কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বের হচ্ছে না। কবি তখন গেলেন এক মনস্তাত্ত্বিক বন্ধুর কাছে। তিনি উপদেশ দিলেন, যে স্বাধীনতার আনন্দ কবি এখনও দেখেনইনি, তাকে নিয়ে কবিতা না লিখে পরাধীনতার মুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে কবিতা লিখতে—‘স্বাধীনতার স্বাদ না জেনে কবিতায় সে সাধ দিতে চাও। তা কী পারা যায়?’ বন্ধুর কথা শুনে বাড়ি ফিরেই কবিতা লিখতে অবশেষে সফল হন কবি। মানিকের ‘আরোগ্য’ উপন্যাস ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত হলেও তার পটভূমিতে সাতচল্লিশের স্বাধীনতার উল্লেখ পাওয়া যায়। সেটি ছিল ১৯৫২ সালের প্রথম দিকে তাঁর লেখা ডায়েরিতে। স্বাধীনতার আগে ও পরে যথাক্রমে লেখা রয়েছে যুদ্ধ ও ভারতবিভাগ, যা অমোঘ নিষ্ঠুর সত্য।
স্বাধীনতার পরের বছর, ১৯৪৮ সালে প্রকাশিত হয়েছিল বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের চৌদ্দতম গল্পগ্রন্থ ‘আচার্য কৃপালনী কলোনি’। পরবর্তীতে বইটির নাম বদল করে রাখা হয় ‘নীলগঞ্জের ফালমন সাহেব’। যদিও প্রথম গল্পের নাম স্বতন্ত্রতাকালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি জীবৎরাম ভগবানদাস কৃপালনীজির (১৮৮৮-১৯৮২) নামাঙ্কিতই থাকে। গল্পের কথক স্বয়ং লেখক, স্ত্রীর জোরাজুরিতে কলকাতার অপেক্ষাকৃত কাছাকাছি আচার্য কলোনিতে জমি বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখে দু’কাঠার জন্য নাম রেজিস্ট্রি করেন। জমির পরিমাণ দেখে অখুশি পত্নীকে বলেছিলেন, ‘এখন এই থাক্। পনেরোই আগস্ট কেটে যাক। সীমানা কমিশনের রায় বের হোক। পরে—’ অর্থাৎ তার পরে ভাবা যাবে। গল্পের কালগত প্রেক্ষাপটে ১৫ আগস্ট পার হয়ে যায়। কোন্নগরের কাছে রাজীবনগরে জমি দেখতে গিয়ে আশাহত লেখক ভাবেন, আগামীতে পূর্ববঙ্গেই বসবাস করবেন। কিন্তু সে আশা ত্যাগ করতে বাধ্য হন। পরদিন সীমানা কমিশনের রায়ে লেখকের দেশ পশ্চিমবঙ্গে পড়ে যায়। বিভূতিভূষণ বাস্তবেও ঘনিষ্ঠজন শচীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে সেই সময় জায়গাজমি সন্ধান করতে লিখেছিলেন চিঠিতে। স্বাধীনতার একমাস আগে আষাঢ় সংক্রান্তিতে বিশাখাপত্তনম বা ওয়ালটেয়ারবাসী শচীন্দ্রনাথের প্রতি প্রেরিত হয় সেই পত্র।
বিশিষ্ট নাট্যকার শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত সাতচল্লিশেই লিখেছিলেন ‘স্বাধীনতার সাধনা’ নাটক। ১৯৪৯ সালে লেখেন ‘এই স্বাধীনতা’। নাট্যাচার্য শিশিরকুমার ভাদুড়ী তাঁর ‘১৫ আগস্ট ১৯৫২’ নামক লেখাটির প্রথমেই কিন্তু স্বাধীনতাকে অস্বীকার করেছেন। লিখেছেন, ‘আজ দুঃখের দিন— স্বাধীনতা দিবস নয়। স্বাধীনতা কোথায়?’ প্রথম স্বাধীনতা দিবসের মতোই পাঁচ বছর পরেও তিনি ভারতবাসীকে স্বাধীন স্বদেশবাসী নয়, ব্রিটিশ কমনওয়েলথের প্রজা বলে গণ্য করেছেন। অযৌক্তিক আইনশৃঙ্খলা, অপ্রতুল খাদ্যসংস্থান, শিক্ষাব্যবস্থার অব্যবস্থা, রাষ্ট্রভাষাপ্রমাদ, সাংস্কৃতিক পশ্চাদধর্মিতা, কৃষিসমস্যা ইত্যাদি নানা সংকটকে তুলে ধরে তিনি একে ‘ভুয়া স্বাধীনতা’ নাম দিতেও কসুর করেননি।
ভাষণ,কবিতা,গল্প,উপন্যাস, নাটকের কথা বলা হল। কবিগান বাদ থাকবে তা কি কখনও হয়? স্বনামধন্য কবিয়াল গুমানি দেওয়ান ১৯৪৯ সালের ১৪ আগস্ট আসানসোলে আসর মাতিয়েছিলেন ছ’টি ভাগে—১৫ আগস্ট, দেশপ্রেমিক, আশা, হতাশা, রূপ ও প্রার্থনায়। স্বাধীনতা প্রসঙ্গে কবিগানের সেই পালার শেষে তিনি সেদিন গিয়েছিলেন, ‘স্নিগ্ধ প্রদীপ গৃহে সব জ্বালো, দেখুক দেবতা দল,/দীর্ঘ সাধনা লব্ধ আগস্ট দীপ্ত সমুজ্জ্বল।/পরানে বাজাও ত্যাগের মন্ত্র নিষ্কামী এবাদত,/শান্তি তোমারে, গড়িয়া তুলিবে কিমিয়া শাহাদত।’
১৯৫০ সালের জানুয়ারি মাসে ‘গণরাজ’ পত্রিকায় ‘স্বাধীন ভারত’ নামে একটি কবিতা লেখেন জলপাইগুড়ির ভূমিকন্যা, সত্যজিৎ রায়ের ‘জলসাঘর’ সিনেমাখ্যাত মুর্শিদাবাদের নিমতিতা জমিদারবাড়ির বধূ সবিতা চৌধুরী। কবিতার প্রথম দুই ও শেষ দুই লাইনে যেন প্রদীপের আলো ও তার তলে থাকা পিলসুজের অন্ধকার দশার মতো একইসঙ্গে স্বাধীনতার সুখদুঃখকে ছন্দোবদ্ধ করতে পেরেছিলেন তিনি—‘স্বাধীন ভারত! স্বাধীন ভারত! স্বাধীন ভারত বন্দে /কোটিকণ্ঠের বজ্রনিনাদে চিত্ত জাগিল ছন্দে।/...কিন্তু তবুও শান্তি কোথায়?কোথায় আনন্দ পুত[পূত]?/গৃহবিবাদের অগ্নি-শিখায় সকলই ভষ্মীভূত!!’
এবার আসি তারাশঙ্করের কথায়। ১৯৫৬ সালে জাতীয় পতাকার ত্রিবর্ণরঞ্জিত মলাটে প্রকাশিত হয় তাঁর ‘কালান্তর’ উপন্যাস। বিভূতিভূষণের পূর্বোক্ত গল্পের মতো এই উপন্যাসটিও লেখকের আত্মজৈবনিক উপন্যাস। এতে স্বাধীনতা প্রাপ্তির কথা রয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রামী গৌরীকান্তকে নবগ্রামের মানুষ আহ্বান জানালেও কিছু অভিমানবশত স্বাধীনতার দিনে তিনি নবগ্রামে আসেননি। স্বতন্ত্রতা সংগ্রামের কারাদণ্ডিত সৈনিকরূপে তারাশঙ্কর কিন্তু সেই পুণ্যদিনে মা-পিসিমার পত্রাদেশে কলকাতার সমারোহ ছেড়ে লাভপুর গ্রামে গিয়ে পতাকা উত্তোলন করেন। এবং বীরের সম্মান পর্যন্ত লাভ করেছিলেন। স্রষ্টা তারাশঙ্কর এবং সৃষ্টি গৌরীকান্ত নামের অর্থের দিক থেকেও সমার্থক। ১৫ অগস্টের পুণ্যস্মৃতির কথা তারাশঙ্করের আত্মজীবনী ‘আমার সাহিত্য-জীবন’-এও রয়েছে। লেখকের মতে ঘটনাক্রমের দিক থেকে বইটি শেষ হয়েছে স্বাধীনতা দিবসের দিনেই।
১৯৭৭ সালে অধ্যাপক-সাহিত্যিক প্রমথনাথ বিশী তাঁর ‘পনেরোই আগস্ট’ উপন্যাস রচনা শেষ করেন। পরের বছর স্বাধীনতার মাসেই সেটি প্রকাশিত হয়। ঔপন্যাসিকের মতে স্বাধীনতার দিনেই উপন্যাসের কালক্রম শেষ হয়েছে। একতলার ঘরে নব্বই ছুঁইছুঁই শয্যাশায়ী যজ্ঞেশ রায়ের চেতনাপ্রবাহে স্বাধীনতার দিনটি এইভাবে ফুটে উঠেছে—‘কলকাতা, নোয়াখালী, বিহার। স্বাধীনতা, স্বাধীনতা, স্বাধীনতা। পাকিস্তান।’ তখনই দোতলার ঘর থেকে আকাশবাণী রেডিও হতে ভেসে এসেছে স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা ‘Trust with Destiny’। ‘কাস্তে কবি’ দিনেশ দাসেরও কাব্য সংগ্রহে স্বতন্ত্রতার তারিখ নামে কবিতা রয়েছে।
১৯৮৮ সালে প্রকাশিত হয় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘পূর্ব-পশ্চিম’ (প্রথম খণ্ড)। উপন্যাসের বিশ্বনাথবাবু কানপুরে বসে জানতে পেরেছিলেন পূর্ব-পশ্চিমে বঙ্গদেশের ভাগাভাগির কথা। আকারে সুনীল সাগর-সম এই উপন্যাসের সিন্ধু সেঁচা মুক্তোর মত কথাটি হল, ‘স্বাধীনতা মানেই দেশভাগ।’ ফলে বিশ্বনাথবাবুর বরিশালের পৈতৃক বাড়ি প্রথমে দেশ বদল, পরে হাত বদল হয়ে যায়।
গদ্যের কথা অনেক বলা হল। এখন গান শোনার পালা,এবার কথা গানে গানে। সাতচল্লিশে টুকরো টুকরোভাবে পাওয়া স্বাধীনতার অল্প দিনের মধ্যেই লোককবি নিবারণ পণ্ডিত তীব্র কষাঘাত করে একটি গান বেঁধেছিলেন—‘থাইকো সাবধানে রে ভাই থাইকো সাবধানে/ রইয়াছে ভাই ভূতের বাসা পাকিস্তান ও হিন্দুস্তানে।’
পশ্চিমবঙ্গে এমন একটি জেলাও আছে যার একটি নয়, দু’-দু’টি স্বাধীনতা দিবস রয়েছে—র্যাডক্লিফ সাহেবের মর্জিতে। ১৫ অগস্ট মুর্শিদাবাদের সদর শহর বহরমপুরে উঠেছিল পাকিস্তানের চাঁদতারা চিহ্নিত, গেরুয়াহীন সাদা-সবুজের নিশান। বিশিষ্ট নেতা, গায়ক সুধীন সেন রাতারাতি রচনা করে একটি গান সেদিন গেয়েছিলেন— ‘সোনার দেশে গড়ব, মোরা স্বাধীন পাকিস্তান/ সুখ-শান্তি আনব মিলে,হিন্দু মুসলমান।’ কিন্তু পরে খুলনার পরিবর্তে মুর্শিদাবাদ ভারতভুক্ত হয়। ১৮ আগস্ট আবার তেরঙ্গা উত্তোলিত হয় সেখানে। সেদিনেও গান গেয়েছিলেন সুধীনবাবুই। তবে গানের কলির শুধুমাত্র একটি শব্দ দিয়েছিলেন পাল্টে—স্বাধীন হিন্দুস্তান!
গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল
সহযোগিতায় : বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী