তিন মাসের একরত্তি সে। জন্মের পর থেকেই তার হৃদযন্ত্রে সমস্যা ছিল। প্রয়োজন পড়েছিল হৃদযন্ত্র প্রতিস্থাপনের। অভিনব পদ্ধতিতে ‘মৃত’ একটি হৃদপিণ্ডকে অনটেবিল রিঅ্যানিমেশনের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করে ওই একরত্তির শরীরে প্রবেশ করানো হল। শুধু তা-ই নয়, প্রতিস্থাপনের ৬ মাস পরেও সেই শিশুর শরীরে কোনও সমস্যা দেখা দেয়নি। নতুন হার্টকে ‘ফরেন বডি’ ভেবে নিয়ে জটিলতাও তৈরি করেনি তার শরীর। বরং সেই নতুন হার্টের সঙ্গে শরীরের সব কলকব্জাই সুন্দর করে মানিয়ে নিয়েছে। সুস্থ রয়েছে শিশুটি।
এই বিরাট কাণ্ডের নেপথ্যে মার্কিন মুলুকের উত্তর ক্যারোলিনার ডিউক ইউনিভার্সিটি। বরাবরই ভিন্নধর্মী গবেষণা ও পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য এই প্রতিষ্ঠান বেশ নির্ভরযোগ্য। এবার এখানেই ‘মৃত’ হার্টকে পুনরুজ্জীবিত করে অন্যের শরীরে প্রবেশ করানো হল। এই ঘটনায় শোরগোল পড়ে গিয়েছে মার্কিন মুলুকে। চিকিৎসাশাস্ত্রে এহেন ঘটনা এই প্রথম! দাতা পারিবারের সম্মতিতে সার্জনরা একটি অক্সিজেনেটর, সেন্ট্রিফিউগাল পাম্প ও বেরিয়ে আসা রক্তকে সংগ্রহ করার জন্য একটি ঝুলন্ত জলাধার ব্যবহার করে অপারেটিং টেবিলেই ‘মৃত’ হার্টকে জীবিত করে তোলেন চিকিৎসকরা। প্রতিস্থাপনের ইতিহাসে এখানেই একে ‘গেমচেঞ্জার’ বলেছেন বিশ্বজুড়ে তাবড় হৃদরোগবিশেষজ্ঞরা। এই ঘটনায় শুধু শিশুর প্রাণ বেঁচেছে তা-ই নয়, চিকিৎসকদের আশা, ডিসিডি (ডোনেশন আফটার সার্কুলেটরি ডেথ) অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রেও এবার অন্তত ৩০-৪০ শতাশে বেশি সাড়া মিলবে।
কিন্তু কেন এটি ‘গেমচেঞ্জার’? হার্ট প্রতিস্থাপনের ঘটনা পৃথিবীতে তো নতুন নয়! তাহলে?
শহরের বিশিষ্ট কার্ডিওলজিস্ট ডাঃ অরূপ দাসবিশ্বাস জানান, ‘মানুষ মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব টিস্যু মারা যায় না। কিন্তু মৃত ব্যক্তির কোন অঙ্গ কতক্ষণ বাঁচবে তা পরিবশে ও ব্যক্তির শরীরের উপর নির্ভর করে। সাধারণত মস্তিষ্কের কাজ বন্ধ হলে মৃত ঘোষণা করা হয়। তখনও হয়তো সেই ব্যক্তির হৃদযন্ত্রে সংবহন রয়েছে। রোগীকে ‘মৃত’ ঘোষণা করে দেওয়ার পরেও তার কিছু অঙ্গ জীবিত থাকে। এতদিন সেসব অঙ্গ সংরক্ষণ করেই প্রতিস্থাপন করা হতো। এক্ষেত্রে তা হয়নি। হার্টটিরও সংবহন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাই এটি নজির তৈরি করেছে।’
সহমত পোষণ করলেন এসএসকেএম হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট কার্ডিওলজিস্ট ডাঃ সরোজ মণ্ডলও। তাঁর মতে, ‘যাবতীয় হার্ট প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে মৃতব্যক্তির হার্টকে সংরক্ষণের একটি জটিল পদ্ধতি আছে। হার্টকে ফ্রিজিং করে, গ্রিন করিডরের মাধ্যমে তাকে এনে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে হার্টের টিস্যু বেঁচে থাকাকালীন অবস্থায় রোগীর শরীরে তাকে প্রতিস্থাপিত করা হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে হার্টটি মৃত ছিল। অর্থাৎ হার্টের টিস্যুগুলি মারা গিয়েছিল। রক্ত সংবহনও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেই হার্টকে পুনরুজ্জীবিত করে শিশুর শরীরে প্রতিস্থাপনের ঘটনা তাই বিরল। এই পদ্ধতি বারবার সফল হলে ও তা নীতিগত দিক থেকে কোনও বাধা না তৈরি করলে প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে ‘গেমচেঞ্জার’ তো বটেই!’
ঘটনাটি প্রকাশিত হয়েছে নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে। চিকিৎসক-লেখক অ্যারোন উইলিয়ামস জানান, ‘এই পদ্ধতি এর আগে চিকিৎসাশাস্ত্রে ব্যবহৃত হয়নি। ভবিষ্যতে বিশ্বজুড়ে এই পদ্ধতি চালু হলে প্রতিস্থাপনযোগ্য হার্টের অভাবে কাউকেই মারা যেতে হবে না।’
তবে হার্টের সংবহনজনিত মৃত্যুর পর তাকে পুনরুজ্জীবিত করার নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বেশ কিছু সমালোচক। সেক্ষেত্রে রি-অ্যানিমেশনের মাধ্যমে দাতার হার্টকে পুনরুজ্জীবিত না করেই প্রতিস্থাপনের ভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছে মার্কিন মুলুকের আর এক ভ্যান্ডেরবিল্ট ইউনিভার্সিটি।