Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ক্রমবিবর্দ্ধমান

জীবনকে যাহারা সত্য বলিয়া জানিয়াছে, তাহারা ইহাকে ক্রমবিবর্দ্ধমান বলিয়াও বুঝিয়াছে।

ক্রমবিবর্দ্ধমান
  • ৮ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

জীবনকে যাহারা সত্য বলিয়া জানিয়াছে, তাহারা ইহাকে ক্রমবিবর্দ্ধমান বলিয়াও বুঝিয়াছে। শীতের প্রখর পীড়নে পত্রপল্লবহীন হইয়াও বসন্তের মলয়-হিল্লোল গায়ে লাগিবামাত্র পাদপ-শ্রেণী নবাঙ্কুর মেলিয়া দেয়। যাহা রিক্ত হইয়াছে, গ্রীষ্মের প্রখর তাপে যে সরোবরের সকল সলিল শুকাইয়া গিয়াছে, ভরাবর্ষার অবিরাম ধারায় তাহা ডুবু-ডুবু হইয়া উঠে। ব্রহ্মচর্য্যহীনতা, সংযমের অভাব অথবা সাধনায় নিষ্ঠাহীনতা যে মানবতাকে শুষ্ক এবং খর্ব্ব করিয়া রাখিয়াছ, বক্র এবং বিশ্রী করিয়া তুলিয়াছে, ইহাদেরই অব্যভিচারিণী তপস্যায় তাহা সরস এবং সরল, সুন্দর এবং সুদীর্ঘ্য হইবে। যাহাকে অপমান করিয়া কপালে আগুন ধরিয়া গিয়াছে, তাহাকে সম্মানের আবাহন দিলে চন্দনের সুশীতল স্পর্শ পুনরায় অনুভূত হইবে, তাই আর কাঁদিও না, —ব্যথিত হৃদয়ে ক্রন্দনের বন্যায় আর ব্যথা আনিও না। অনুতাপ বিসর্জ্জন দিয়া বর্ত্তমানের সকল অসুযোগ ও অসুবিধাকে অগ্রাহ্য করিয়া কেশরী-বিক্রমে ভবিষ্যতের অবিসংবাদিত গৌরবকে সুপ্রতিষ্ঠিত কর। জগতে যাহারা অপ্রতিষ্ঠিত, তাহারাই শোকে-দুঃখে অতিষ্ঠ; যাহারা পায়ের গোড়ালি দিয়া মাটিতে শক্ত করিয়া খুঁটি গাড়িতে পারিয়াছে, তাহারা অতীতের দুঃখময়ী কথা ভাবিয়া মুহ্যমান হয় না, ভবিষ্যতের দুর্লঙ্ঘনীয় বাধা দেখিয়া টলে না, বিদ্রোহের ঘোর গর্জ্জন শুনিয়া কাঁপে না, পলে পলে তাহারা বাধা-বিঘ্নকে চরণতলে দলিতে থাকে, জগতের আপদ-বিপদকে অবহেলে ভূতলে সমাধিশায়িত করে।

Advertisement

অনন্ত কোটি বিন্দুর সমবায়ে সিন্ধুর উৎপত্তি। বিন্দু বিন্দু শুষিয়া সিন্ধু শুকাইয়া দেওয়া যায়, আবার বিন্দু বিন্দু জমাইয়া সিন্ধু ভরিয়া দেওয়া যায়। চাই শুধু একটু ধৈর্য্য। 
তোমাকে এক্ষণে প্রাণপাত শ্রমে শক্তি-সঞ্চয় করিতে হইবে। বিন্দু বিন্দু করিয়াই সঞ্চয় করিতে হইবে। আজ এক কণা কাল এক কণা করিয়া প্রতিদিনের সমুচ্চয়ে তোমার মধ্যবর্ত্তী অখণ্ড-শক্তির উন্মেষ হইবে। 
অবনতির পথেও যেমন একদিনের অবনতি কখনও চক্ষে পড়ে নাই, উন্নতির পথেও একদিনের উন্নতিটুকু ধরা পড়িবে না। তপস্যার বলে আজ তুমি যাহা আছ, কাল তাহা থাকিবে না। কাল যাহা আছ, পরশ্ব তাহা থাকিবে না। প্রতিদিন তোমার মধ্যে অণু-পরমাণুর মতন সূক্ষ্ম শক্তি জাগ্রত হইবে এবং দিনে দিনে তাহা তোমাকে দশের হিতে, দেশের হিতে, জগদ্ধিতে সমর্থ এবং যোগ্য করিবে। সাধন করিলে সিদ্ধিলাভ হইবেই, যত্ন করিলে রত্ন মিলিবেই, প্রয়াসে রহিলে প্রতিষ্ঠা অনিবার্য্য। কাঁদাকাটি করিয়া আর মাটি ভিজাইও না, —দৃঢ় ইচ্ছায় অনুতাপ চাপিয়া রাখিয়া কর্ম্মের ক্ষেত্রে নামিয়া পড়। অদূর ভবিষ্যতে যে বিরাট কর্ম্ম আসিতেছে, তাহার জন্য ভাবের দিক্‌ দিয়া নিজেকে সর্ব্বপ্রকারে প্রস্তুত করাই তোমার প্রথম কাজ। ভগবানের আদেশ-বাণী তোমার কাছে নামিয়া আসিতেছে, তোমাকে উহা ঠিক করিয়া শুনিবার জন্য, নির্ভুলরূপে বুঝিবার জন্য। উদ্‌গ্রীব উন্মুখ থাকিতে হইবে। ভগবান্‌ তোমার কাছে কোন্‌ ক঩ঠোর আদেশ প্রেরণ করিবেন, আজ তুমি তাহা জান না। তোমাকে সেই অজ্ঞাত আদেশ পালন করিবার জন্যই উৎকণ্ঠ হইয়া দিন-যামিনী উন্নিদ্র আগ্রহে কাটাইতে হইবে। 
স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের ‘আপনার জন’ থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ