সুকান্ত বসু, কলকাতা: উত্তর কলকাতার দর্জিপাড়ার মিত্রবাড়ির পুজো এবার পড়ল ২২০ বছরে। এই বাড়ির সন্ধিপুজোয় দেবীকে নিবেদন করা হয় ১০৮ নীলকণ্ঠ ফুল। তিনদিন হয় কুমারীপুজো। ৫০ কেজির আতপ চালের নৈবেদ্যের সঙ্গে দেওয়া হয় বাড়ির তৈরি বিভিন্ন ধরনের আচার ও বড়ি। বিভিন্নরকম ভোগের সঙ্গে লুচি ও পাঁচরকম ভাজা নিবেদন করা হয়। তাতে নুন থাকে না। দুর্গাকে রান্না করা অন্নভোগ দেওয়া হয় না। আজও প্রথা মেনে এই বাড়ির প্রতিমা কাঁধে চেপে গঙ্গায় নিরঞ্জনে যায়। বাড়ির পুরুষরা পরেন ধুতি ও উত্তরীয়। হাতে থাকে লাঠি। একসময় দশমীর দিন প্রথা মেনে নীলকণ্ঠ পাখি উড়িয়ে দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। কিন্তু এখন সেই প্রথা বন্ধ। এই বাড়ির পুজো ঘিরে জড়িয়ে অজস্র স্মৃতিমাখা গল্প।
দর্জিপাড়ায় নীলমণি মিত্র রোডে অবস্থিত মিত্রবাড়ি। সেখানে গিয়ে দেখা গিয়েছে, দুর্গা দালানে চলছে প্রতিমা তৈরির কাজ। দুর্গার সঙ্গে থাকা সিংহ অশ্বরূপী। দালানে শোভা পাচ্ছে বিশাল মাপের সিংহাসন। সেটিতে দেবীকে বসানো হয়। প্রাচীন এই দুর্গা দালানের স্থাপত্য রীতিমতো চোখধাঁধানো। এই কারুকাজ দেখতে শহরের বহু মানুষ মিত্রবাড়ি যান পুজো দেখতে। এই বাড়ির সদস্য অনুসূয়া মিত্র বিশ্বাস বলেন, ‘এই বাড়ির পুজোর প্রতিমা ত্রিচালা। প্রতিমাশিল্পী, কুমোরটুলির তাপস পাল। সেখান থেকেই আসে প্রতিমার সাজ। প্রতিমা সাজানোর ক্ষেত্রে বাড়ির মেয়েরা অংশ নেন। রথের দিন কাঠামো পুজোর মধ্যে দিয়ে শুরু হয় এই বাড়ির ঠাকুর তৈরির কাজ। এখানকার প্রতিমার মুখ, চালচিত্র সব ছাঁচ সংরক্ষিত করে রাখা, যাতে প্রতিমার রূপের কোনো হেরফের না হয়। সেই ছাঁচ দিয়েই তৈরি হয় প্রতিমা।’
মিত্রবাড়ির পুজোয় বলিদান হয় না। বলির বদলে দেওয়া হয় চিনির নৈবেদ্য। অষ্টমীতে সন্ধিপুজোর সঙ্গে হয় কল্যাণী পুজো। নবমীতে বিশেষ হোমের মাধ্যমে হয় দুর্গার আরাধনা। দশমীতে বাড়ির মেয়েরা মাতৃশক্তির আরাধনা করেন। প্রথা মেনে ওইদিন মহিলারা মাছ‑ভাত খেয়ে মুখে পান দিয়ে নিরঞ্জনের প্রস্তুতিতে অংশ নেন। এরপর হয় সিঁদুর খেলা। একসময় মিত্রবাড়িতে পুজো ঘিরে বসত ভিয়েন। তৈরি হত নানা ধরনের মিষ্টি ও নোনতা। কিন্তু এখন ভিয়েন বসে না। তবে নানা ধরনের মিষ্টি পুজোয় নিবেদন করা হয়। সেই তালিকায় থাকে গজা, নারকেল নাড়ু, চন্দ্রপুলি, সাদা নাড়ু ইত্য্যাদি। মিত্রবাড়ির পূর্বপুরুষ রাধাকৃষ্ণ মিত্রের হাত ধরে শুরু হয়ে ছিল মাতৃ আরাধনা। যা আজও মর্যাদার সঙ্গে পালিত হচ্ছে মিত্রবাড়িতে।