Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

দায়িত্বশীল পদক্ষেপ

দায়িত্বশীল পদক্ষেপ
  • ১৩ মার্চ, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

আধুনিক বিশ্ব জানে, যাবতীয় উন্নয়নের চাবিকাঠি হল শিক্ষা। শুধু জ্ঞান অর্জন বা একটি ভালো চাকরি জোগাড়ের জন্যই নয়, সুশিক্ষা জরুরি জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনে। শিক্ষার আলোই মানুষকে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী এবং সুনাগরিক করে তোলে। তাই প্রতিটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র শিক্ষাকে নাগরিকের অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকেও পণ্যের দৃষ্টিতে দেখার কথা নয়। ইচ্ছুক নাগরিককে গবেষণা সংস্থা এবং কর্মক্ষেত্র পর্যন্ত পৌঁছে দিতে যে শিক্ষালাভ জরুরি, সেই ব্যবস্থা করে দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের উপরই বর্তায়। অর্থাৎ শিক্ষা নাগরিকের নিখরচায় পাওয়ার কথা। কারণ একজন সুশিক্ষিত নাগরিক সারা জীবন তাঁর দেশের জন্যই কাজ বা সেবা করবেন এবং তাতে দেশ গঠিত হবে।

Advertisement

তবে তার জন্য দরকার পর্যাপ্ত পরিমাণ বাজেট বরাদ্দ। নয়া ‘জাতীয় শিক্ষা নীতি (এনইপি) ২০২০’ গ্রহণ করেছে মোদি সরকার। এই গালভরা এনইপি সব রাজ্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে রীতিমতো উৎপীড়নের রাস্তা বেছে নিয়েছে কেন্দ্র। কিন্তু শিক্ষাখাতে যে পরিমাণ (জিডিপির অন্তত ৬ শতাংশ) বাজেট বরাদ্দের লক্ষ্যমাত্রা এনইপি বেঁধে দিয়েছে মোদি সরকার তার ধারেকাছেও এখনও পৌঁছতে পারেনি। তাই সরকারের চাতুর্যপূর্ণ নীতির শিকার শিক্ষার্থীরাই। শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারি ব্যয় সংকোচনের পাশাপাশি আগল খুলে দেওয়া হয়েছে বেসরকারি পুঁজির সামনে। শিক্ষা বহুলাংশে পণ্য হয়ে উঠেছে এখনই। শিক্ষায় পুঁজির প্রবেশ আগামী দিনে যে অবাধ হতে চলেছে তা এখনই হলফ করে বলে দেওয়া যায়। এর দ্বারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গরিব এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির পরিবারগুলি। সরকারি এবং সরকার পোষিত স্কুল কলেজে পড়াশোনার মান যেমনই হোক না কেন, গরিব পরিবারের অন্যত্র যাওয়ার উপায় নেই। তবে মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি বড় অংশ অনেক আগে থেকেই বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থার দিকে ঝুঁকে রয়েছে। কলকাতাসহ বিভিন্ন শহর, এমনকী গ্রাম-মফস্সল মিলিয়ে এমন লাখো লাখো পড়ুয়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করছে। অন্যান্য খরচ কমিয়ে অনেক কষ্টেই অভিভাবকরা চেষ্টা করছেন ছেলেমেয়েদের শিক্ষা দিতে। কিন্তু কয়েক বছর যাবৎ তাঁরা বাস্তবিকই অপারগ হয়ে উঠেছেন। ভর্তি এবং মাসিক ফি’র চাপ এতটাই বেড়ে গিয়েছে যে তাঁরা কোনও থই খুঁজে পাচ্ছেন না। এনিয়ে অভিভাবক সংগঠন এবং স্কুল কর্তৃপক্ষের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব, অশান্তির খবরও সামনে আসে। সুবিচারের আশায় অভিভাবকরা কিছু ক্ষেত্রে এমন অভিযোগ সরকারি প্রশাসনেরও গোচরে আনেন।
রাজ্যে একটি দায়িত্বশীল সরকার থাকলে তার পক্ষে নির্বিকার থাকা সম্ভব নয়। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে। মঙ্গলবার সমস্যাটি বিধানসভার অধিবেশনে উত্থাপিত হলে শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু জানান, বেসরকারি স্কুলগুলির ক্রমাগত ফি বৃদ্ধি, অভিভাবকদের আর্থিক সংগতি না-দেখে অতিরিক্ত বোঝা চাপানোর অভিযোগ সরকার পেয়েছে। এই সমস্যার নিরসনে সরকার একটি কমিশন (ওয়েস্ট বেঙ্গল প্রাইভেট স্কুল রেগুলেটরি কমিশন) গড়তে চায়। শিক্ষাদপ্তর সূত্রের খবর, কমিশনে মোট ১১ জন সদস্য থাকবেন। শীর্ষে থাকবেন একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি। কমিশনের বাকি সদস্যদের মধ্যে থাকবেন স্কুলশিক্ষা কমিশনার এবং প্রাথমিক ও মধ্য শিক্ষা পর্ষদ এবং উচ্চশিক্ষা সংসদের সভাপতি। আর থাকবেন সরকার মনোনীত দু’জন শিক্ষাবিদ। বেসরকারি স্কুলে ফি বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের এই কমিশনে আরও থাকবেন দিল্লির সিবিএসই এবং সিআইএসসিই সংস্থার প্রতিনিধিরা। বেসরকারি স্কুলের ফি সংক্রান্ত অভিযোগগুলি খতিয়ে দেখে সমাধান করবে এই কমিশন। এটি গঠনের মূল উদ্দেশ্য—বেসরকারি স্কুলগুলির অস্বাভাবিক ফি’র চাপ ঠেকানো এবং ওই সংক্রান্ত অন্যসকল অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি করা। রাজ্য শীঘ্রই একটি বিল আনতে চলেছে। শিক্ষামন্ত্রী জানান, সেটি বিধানসভায় পাশও হবে। তবে ওই প্রস্তাবিত আইন কবে থেকে কার্যকর হবে তা নির্ভর করবে রাজভবনের সিদ্ধান্তের উপর। রাজ্যবাসী দেখেছেন, বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার মাত্রাছাড়া খরচে রাশ টানতে কয়েকবছর আগেই স্বাস্থ্য কমিশন গঠন করেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। এই ক’বছরে বহু মানুষ তার সুফল পেয়েছেন। এবার বেসরকারি স্কুলের অন্যায় ফি’তে লাগাম দিতেও তৎপর হয়েছে রাজ্য। এই উদ্যোগ সময়োচিত এবং সাধারণ মানুষের চাহিদা। বাংলাকে শিক্ষায় আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে রাজ্যের এই ভূমিকা ঐতিহাসিক হিসেবেই চিহ্নিত হবে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ