পিনাকী ধোলে, সিউড়ি: অভিযান হয় কালেভদ্রে। যদিও, পুলিশের নাকের ডগা দিয়ে রমরমিয়েই চলে পাথর শিল্পাঞ্চলে বিস্ফোরক সরবরাহের কারবার। খাদানে বিস্ফোরণ ঘটাতে মূলত অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট, জিলেটিন স্টিক এবং ডিটোনেটরের ব্যবহার হয়ে থাকে। যদিও সম্পূর্ণ অবৈধভাবে আমদানি করা এইসব বিস্ফোরকই ‘বাঁচিয়ে’ রেখেছে পাথর ব্যবসায়ীদের। বিস্ফোরণের জেরে বহু শ্রমিক মৃত্যুর সাক্ষী রয়েছে জেলার পাথর শিল্পাঞ্চলগুলি। বিস্ফোরক পাচারের অভিযোগে জেলায় এনআইএ আধিকারিকরা একাধিকবার হানা দিয়েছেন। ঘটনায় জড়িত শাসক দলের একাধিক নেতা গ্রেফতারও হয়েছে। যদিও অবৈধ বিস্ফোরক পাচারের করবার আজও বন্ধ হয়নি। এক্ষেত্রে পুলিশ এবং প্রশাসনের ‘সদিচ্ছা’ নিয়েই অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন।
দিল্লির বিস্ফোরণ কাণ্ডের পর সম্প্রতি কিছুটা উঠেপড়ে লেগেছে পুলিশ। আর সেই তল্লাশিতেই বীরভূমে উদ্ধার হয়েছে বিপুল অবৈধ বিস্ফোরক। বুধবার রাতে নলহাটি-সুলতানপুরে নাকা তল্লাশি চলাকালীন পুলিশ একটি গাড়ি থেকে প্রায় ২০ হাজার জিলেটিন স্টিক উদ্ধার করেছে। তবে, এইসব বাজেয়াপ্তের খবর কালেভদ্রেই মেলে। যা বাজেয়াপ্ত হয়, তার থেকে কয়েকশ গুণ বেশি বিস্ফোরক সরবরাহের জাল পাথর শিল্পাঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে বলে অভিযোগ। মূলত ঝাড়খণ্ড থেকেই বিস্ফোরকের আমদানী হয়। রীতিমতো পুলিশের নাকের ডগা দিয়েই পাথর শিল্পাঞ্চলে বিস্ফোরকের গাড়ি এসে পৌঁছয়। যদিও পুলিশের এক পদস্থ আধিকারিক বলেন, অবৈধ বিস্ফোরকের বিরুদ্ধে সবরকম অভিযান জারি রয়েছে।
বীরভূম জেলার মহম্মদবাজার, নলহাটি, রামপুরহাট, শালবাদরা, কাষ্ঠবড়া, বাহাদুরপুর সহ বিভিন্ন এলাকাজুড়েই শতাধিক পাথর খাদান রয়েছে। সিংহভাগ খাদানই অবৈধ। অথচ, সেইসব খাদানে দিনরাত বিস্ফোরণ হচ্ছে। কান ফাটানো শব্দে অতিষ্ঠ স্থানীয় হন বাসিন্দারা। সঙ্কটে পড়ে বন্যপ্রাণ। তাছাড়া, খাদানে বিস্ফোরণ করাতে অনুমতি লাগে ডিরেক্টর জেনারাল অব মাইনস সেফটির(ডিজিএমএস)। যদিও সেসবের কোনও বালাই নেই। বিরোধীদের অভিযোগ, পুলিশ যোগ ছাড়া খাদানে অবৈধ বিস্ফোরক পৌঁছনো কোনওভাবেই সম্ভব নয়। সেই কারণেই এনআইএর হানার পরেও খাদানগুলিতে বহাল তবিয়তেই চলছে বিস্ফোরক মজুত।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালের জুন মাসে মহম্মদবাজারে অভিযান চালিয়ে এসটিএফ বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক উদ্ধার করে। ওই ঘটনায় তদন্তে নেমে মীর মহম্মদ নুরুজ্জামান নামে এক যুবককে গ্রেফতার করে এনআইএ। ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে নলহাটির বাহাদুরপুরের দাপুটে পাথর ব্যবসায়ী তৃণমূল নেতা তথা পঞ্চায়েত সদস্য মনোজ ঘোষকে এনআইএ গ্রেফতার করেছিল। কেন্দ্রীয় সংস্থা ওই নেতার গোডাউন থেকে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরকও উদ্ধার করে। মনোজ ছাড়াও এনআইএ বিস্ফোরক পাচার যোগে মুরারই-২ ব্লকের কুশমোড়-২ অঞ্চলের তৃণমূলের ভারপ্রাপ্ত অঞ্চল সভাপতি ইসলাম চৌধুরীকে গ্রেফতার করে। তার স্ত্রী ছিল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতা পঞ্চায়েত সদস্য। তাছাড়া, বিস্ফোরণের সময় খাদানে মৃত্যুর ঘটনাও কার্যত ‘নিয়মিত’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু তারপরেও বিস্ফোরক মজুতের কারবার বন্ধ হয়নি। তবে, দিল্লির বিস্ফোরণ কাণ্ডের পর প্রশ্ন উঠছে, বিস্ফোরক যদি এতই সহজলভ্য হয়ে যায়, তাহলে তো তা নাশকতার কাজেও ব্যবহার হতে পারে? পুলিশের এক কর্তার মানছেন, অনেক স্বাভাবিক ঘটনার মধ্যেও বড়সড় পরিকল্পনা লুকিয়ে থাকে। সেসব মাথায় রেখেই তল্লাশি অভিযান বাড়ানো হয়েছে। প্রতীকী ছবি