নিজস্ব প্রতিনিধি, বর্ধমান: ‘ডাবল ইঞ্জিন’ রাজ্যে বাংলা বলা যেন ‘অপরাধ’। আড়চোখে দেখছে সেই সব রাজ্যের পুলিস। তাদের অনেকেরই ধারণা, বাংলা ভাষায় কথা বলা মানেই ‘বাংলাদেশি’। উপযুক্ত নথি দেখানোর পরও রক্ষা থাকছে না। সোজা পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে বাংলাদেশে। এমনই তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন মন্তেশ্বরের কুলুট গ্রামের মোস্তাফা কামাল শেখ। তিনি ২০ বছর ধরে মুম্বইয়ে রয়েছেন। আচমকা সেরাজ্যের পুলিস তাঁকে পাকড়াও করে বিএসএফের হাতে তুলে দেয়। তিনি নাকি অনুপ্রবেশকারী। বিভিন্ন বৈধ নথি দেখানোর পরও কাজ হয়নি। বিএসএফ তাঁকে কাঁটাতারের ওপারে পাঠিয়ে দেয়। বহু কাঠখড় পোড়ানোর পর মঙ্গলবার তিনি বাড়ি ফিরেছেন।
মোস্তাফা কামাল শেখ বলেন, বাংলা থেকে যাঁরা কাজ করতে গিয়েছেন, তাঁদের সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। ভোটার, আধার কার্ড দেখিয়েও লাভ হচ্ছে না। কিছু না বুঝেই বাংলাদেশি তকমা সেঁটে দেওয়া হচ্ছে। এরকম আগে ছিল না। এভাবে চলতে থাকলে আগামী দিনে ভিন রাজ্যে কাজ করতে যাওয়াই দায় হয়ে উঠবে।
মন্তেশ্বরের কুলুট গ্রামের ৩০ জনের বেশি যুবক মুম্বইয়ে কাজ করেন। শুধু এই গ্রাম নয়, জেলার অন্যান্য গ্রামের বাসিন্দারাও আরব সাগরের পাড়ে কর্মরত রয়েছেন। হঠাৎ করেই ‘ডাবল ইঞ্জিন’ রাজ্যের পুলিস সক্রিয় হয়ে ওঠায় অভিভাবকরা চিন্তায় পড়ে গিয়েছেন। সিরাজুল শেখ নামে এক ব্যক্তি বলেন, ছেলে প্রায় ১০ বছর ধরে মুম্বইয়ে রয়েছে। কোনওদিনই চিন্তা হয়নি। কিন্তু এখন যা চলছে, তাতে রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারছি না। বাংলা ভাষা জানাটা অপরাধ নয়। যাঁকে তাঁকে বাংলাদেশি তকমা দিলে তাঁর সামাজিক সম্মানও নষ্ট হয়।
প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, অন্যান্য রাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিকরাও বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে কর্মরত রয়েছেন। তাঁদের কোনও সমস্যা না হলেও বাংলার শ্রমিকদের কেন বিপাকে পড়তে হবে, তা নিয়ে জেলার বাসিন্দারা সরব হয়েছেন। পূর্ব বর্ধমান জেলা পরিষদের সভাধিপতি শ্যামাপ্রসন্ন লোহার বলেন, দেশের যেকোনও প্রান্তে যেকেউ কাজ করতে যেতে পারেন। এতে অপরাধের কিছু নেই। বাংলার শ্রমিকদের এভাবে অনুপ্রবেশকারী তকমা সেঁটে দেওয়া ঠিক নয়।
বাংলাদেশ থেকে ফিরে আসা মোস্তাফা কামাল শেখ বলেন, মুম্বাইয়ে থাকা বহু শ্রমিক আতঙ্কে রয়েছেন। বারবার তাঁদের প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে। ভোটার, আধার কার্ড একাধিকবার যাচাই করা হচ্ছে। যেন মনে হচ্ছে কাজ করতে এসে বাংলার শ্রমিকরা অপরাধ করে ফেলেছেন। এই মানসিকতা বদল হওয়া দরকার। তা নাহলে আগামী দিনে হয়তো ভিন রাজ্যে কাজ করতে যাওয়ার সমস্যা হয়ে যাবে। অনেকের ছেলেমেয়ে সেরাজ্যে স্কুলে পড়াশোনা করছে। কেউ কেউ কোনও রকমে মাথা গোঁজার আস্তানাও করেছেন। তাঁদের কী হবে? পাততাড়ি গুটিয়ে আসার পরিস্থিতি তাঁদের নেই। গঞ্জনা শুনেই সে রাজ্যে থেকে যেতে হবে।