প্রতিমার মধ্যে দেবতার আবির্ভাবের জন্য প্রস্তুত প্রতিমাটী শাস্ত্রানুসারে সুন্দরভাবে গঠিত হওয়া আবশ্যক যাহা দেখিয়া ধ্যান করিলে মন প্রফুল্ল এবং হৃদয় ভক্তিব্যাকুল হইতে পারে। শাস্ত্রনির্দেশ অতিক্রম করিয়া নিজের ইচ্ছামত প্রতিমা বা যে প্রতিমা দেখিলে মনে আনন্দ হইবে না এইরূপ প্রতিমা নির্মাণ বাঞ্ছনীয় নহে। অবশ্য স্বপ্নাদেশে বা কোনও উচ্চস্তরের মহাসাধকের ইচ্ছায় আবিষ্কৃত বা নির্মিত কোন কোনও প্রতিমার অন্যরূপ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। তাহা আমাদের ন্যায় নিম্নস্তরের লক্ষ লক্ষ ব্যক্তির পক্ষে প্রযোজ্য নহে। আমাদের জন্মদায়িনী জননী, জন্মভূমি দেশমাতৃকা ও বিশ্বপ্রকৃতি এই তিনটী সেই মূলা প্রকৃতি মহামায়ার বিশেষ প্রকাশ মূর্ত্তি এবং এই তিনের পূজা তাঁহারই পূজা। “যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা” (চণ্ডী), ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের “বন্দেমাতরম্” ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী” ইত্যাদি।
আমাদের অদৃশ্য ঈশ্বরকে ভক্তিপ্রেমাঞ্জনে দিব্যদৃষ্টি সাধক স্বহৃদয়ে নানারূপে দর্শন করেন এবং তাঁহার ব্যাকুল আহ্বানে মনোহর প্রতিমায় অধিষ্ঠিত হইয়া ঈশ্বর সাগ্রহে পূজা গ্রহণ করেন। গৃহে সমাগত একটি বিশিষ্ট ব্যক্তির যেমন অভ্যর্থনা ও সেবা করা হয় সেইরূপ প্রতিমায় অধিষ্ঠিত ঈশ্বরকে আসন, পাদ্য, অর্ঘ্য, স্নানজল, বস্ত্র, আভরণ, গন্ধদ্রব্য, পুষ্প, বিল্বপত্র, তুলসী, ধূপ, দীপ ও বিবিধ নৈবেদ্যাদি অর্পণ করিয়া স্তব ও প্রণামাদি করা শাস্ত্রবিধি। সকাম ভক্ত ‘রূপং দেহি জয়ং দেহি’ ইত্যাদি মন্ত্রে কাম্য বস্তু চান কিন্তু ভক্তি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ক্রমে কামনা কাম-না হইয়া যায় অর্থাৎ ঈশ্বরের কৃপায় ভক্ত নিষ্কাম হন। “অন্য কামী যদি করে কৃষ্ণের পূজন। না মানিলেও কৃষ্ণ তারে দেন শ্রীচরণ।। কৃষ্ণ কহে আমায় পূজে চাহে বিষয় সুখ। অমৃত ছাড়ি বিষ মাগে এই বড় মূর্খ।। আমি বিজ্ঞ কেন তারে বিষয় ভুঞ্জাইব। স্বচরণ দিয়া তারে বিষয় ভুলাইব।।(চৈ-চ) ঋষি ভারতের অতি প্রাচীন অনুপম এই চেতন বিজ্ঞান যাহাতে আছে এক অণুচৈতন্য জীবাত্মার ভক্তি শ্রদ্ধার আকর্ষণে বিভু মহাচৈতন্য সর্বশক্তিমান জগদীশ্বরের একটি অতিস্বাদ্য অধিষ্ঠান প্রতিমাতে প্রকট হইয়া পূজাগ্রহণ। এই বিস্ময়কর বিজ্ঞানের মহিমায় জড় বিজ্ঞানও বিস্মিত। তবে ইহা সম্পূর্ণ মনোজগতের বিষয়, বাহ্যতঃ দেখাইবার নহে, যদিও এই প্রতিমা পূজার বহু তথ্য শাস্ত্রমধ্যে আছে এবং সিদ্ধ মহাপুরুষগণের জীবনেও বহু আলৌকিক সত্য ঘটনার অভাব নাই। আমাদের জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীজী বলিয়াছেন যে ভারতের আর্য ঋষিগণ ব্রহ্মচর্যাদি সাধনায় থাকিয়া অন্য কোনও উপকরণের সাহায্য না লইয়া ধ্যানে ঈশ্বর নামক যে সত্যবস্তুটী আবিষ্কার করিয়াছেন তাহা জড় বিজ্ঞানের আবিষ্কার অপেক্ষা কম বিস্ময়কর নহে। কাহারও নিন্দা অপমান বা বিদ্বেষ না করিয়া মন্দিরের মধ্যে একটি প্রতিমার পূজা করিতে করিতে পূজক সর্বভূতে ঈশ্বর দর্শনসহ আধ্যাত্মিক উন্নতির চরম অবস্থায় আসেন। অতএব ঈশ্বরের প্রতিমা পূজা কেবল একটী ব্যয়সাধ্য অসার শুষ্ক কর্মকাণ্ড, সাময়িক আনন্দের অনুষ্ঠান বা হুজুগাদি নহে, যদিও অনেক স্থানে বর্ত্তমানে তাহাই দেখা যাইতেছে।
জ্যোতির্ময় নন্দের ‘উপাসনা-বিজ্ঞান’ থেকে