সন্তানের কাছে মাতৃঋণ আজীবনের। নিজের মাকে নিয়ে কতই না গল্প জড়িয়ে আছে জীবনের নানা বাঁকে। কিন্তু মায়েদের কথা আলাদা করে বলা হয় কই? বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা লিখছেন তাঁদের মায়ের কথা। এই পর্বে মনামী ঘোষ।
সন্তানের কাছে মাতৃঋণ আজীবনের। নিজের মাকে নিয়ে কতই না গল্প জড়িয়ে আছে জীবনের নানা বাঁকে। কিন্তু মায়েদের কথা আলাদা করে বলা হয় কই? বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা লিখছেন তাঁদের মায়ের কথা। এই পর্বে মনামী ঘোষ।
• মায়ের সঙ্গে সন্তানের বন্ধন চিরন্তন। মায়েরা সন্তানের মধ্যে তাঁর ছায়াকে দেখতে পান। একটা ছোট্ট চারাগাছকে যেভাবে জল, সার দিয়ে বড় করা হয়, মায়েরা সন্তানদেরও সেভাবেই অতি যত্ন সহকারে ক্রমশ বড় করে তোলেন। আমার মাও সেইভাবেই বড় করেছেন আমাকে।
শুধু যে যত্ন নিয়ে, পরিচর্যা করে বড় করেছেন তা-ই নয়। পড়াশোনার পাশাপাশি আর যতরকম শিল্পকলায় দক্ষ হয়েছি, তার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব আমার মায়ের। মা-ই আমাকে ছোট থেকে বিভিন্ন বিষয়ে আগ্রহী করে তুলেছেন। ছোট থেকেই নাচ শিখতাম। একেবারে হাত পা নাড়তে নাড়তেই নাচ শেখা শুরু হয়ে গিয়েছিল আমার।
তিন বছর বয়সে আমি প্রথম স্টেজে উঠি। সেটাও আমার মায়ের জন্যই। মায়ের উৎসাহেই আমি ছোট থেকে নাচ, আবৃত্তি, নাটকে অংশগ্রহণ করতাম। পড়াশোনার বাইরে সন্তানকে বহুমুখী প্রতিভার সঙ্গে পরিচিত করতে চেয়েছিলেন আমার মা। পাঠ্য বইয়ের বাইরেও যে অন্য একটা জগৎ আছে সেটাই মা বোঝাতে চেয়েছেন আমাকে। এই ক্ষেত্রে আমার মায়ের অবদান অনস্বীকার্য।
নাচের পরীক্ষায় সবসময় আমি ভালো ফল করেছি। তার অবদানও আমার মায়ের। নাচের জন্য প্রচুর সাজ-সরঞ্জাম প্রয়োজন। সেগুলো রীতিমতো পরিশ্রম করে জোগাড় করতে হয়। সব ব্যবস্থা করতেন আমার মা। আমার নাচের পোশাক হতো সবার থেকে আলাদা। মা-ই নিজের কল্পনাকে কাজে লাগিয়ে এই পোশাক তৈরি করতেন। সকলে প্রশংসা করতেন। সে কারণেই হয়তো বেশি নম্বরও পেতাম।
আমার অভিনয়ের কারণেই বসিরহাট থেকে কলকাতায় এসেছিলাম। কেরিয়ারের একদম শুরুর দিকে মা আমার সঙ্গে শ্যুটিং সেটে যেতেন। শুরু থেকে প্রায় ছয়-সাত বছর মা আমার সঙ্গে নিয়মিত সেটে গিয়েছেন। তখন তিনটে ধারাবাহিকের মূল চরিত্রের দায়িত্ব ছিল আমার কাঁধে। তখন আজকের মতো নিয়ম ছিল না। তখন একাধিক মুখ্য চরিত্র করা যেত। তিনটে শিফটে কাজ করতাম আমি। সকালে একটা শ্যুটিং সেরে দুপুরে আর একটা শ্যুটিংয়ের জন্য তৈরি হতাম। নাইট শিফটে অন্য আরেকটি ধারাবাহিকের কাজ করতাম। এই পুরো সময়টাতে আমার ছায়াসঙ্গী ছিলেন মা তমসা ঘোষ। আমার খাওয়াদাওয়া সহ বিভিন্ন খুঁটিনাটি বিষয়ে মায়ের সবসময় নজর ছিল।
মা অসম্ভব ধৈর্যশীল। যে কোনও পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রাখতে পারেন। মাকে দেখে আমি প্রতিনিয়ত শিখি। শাসনে-আদরে আমাকে আগলে রেখেছেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মায়ের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব বেড়েছে। আমার সবথেকে প্রিয় বন্ধু মা। মায়ের সঙ্গে সবকিছু শেয়ার করতে পারি। মেয়েদের সঙ্গে মায়েদের যেন যত ভাব তত ঝগড়াও হয়। মায়েরা যেমন মেয়েদের বন্ধু আবার তেমন ঝগড়া করারও পার্টনার। আমারও মায়ের সঙ্গে টুকটাক ঝগড়া হয়। যখন খুব ছোট ছিলাম তখন মায়ের উপর অভিমান করে না খেয়ে থাকতাম। কিন্তু, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে সেই ঝগড়া দায়িত্ব, কর্তব্যে পাল্টে গিয়েছে। মায়ের প্রতি দায়িত্ব বেড়েছে, কর্তব্য বেড়েছে। মা আমাদের শুধু দিয়েই গিয়েছেন। পুরো জীবনটা মা আমাদের জন্য কাটিয়ে দিয়েছেন। আমরা মায়ের থেকে শুধু নিয়েই গিয়েছি। তাই মাকে কিছু ফিরিয়ে দিতে চেষ্টা করি।
আমার মায়ের খুব গয়নার শখ ছিল। কিন্তু, জীবনের এক প্রতিকূল সময়ে কিছু কারণে মায়ের বেশ কিছু গয়না হারাতে হয়। ওই ঘটনা আমাকে খুব কষ্ট দিয়েছিল। তাই বাবা চলে যাওয়ার পর থেকে প্রতি বছর মায়ের জন্মদিনে মাকে আমি একটা করে গয়না উপহার দিই। হয়তো খুবই সামান্য কিছুই করতে পারি মায়ের জন্য। কিন্তু, এর মূল্য আমার কাছে অসীম। এই ভাবেই মাকে ভালোবাসায় মুড়ে ভালো রাখতে চাই।