Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

এআ‌ই চাই, তবে কিছু ভয়ও আছে

এখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। এটা সত্য যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের ক্ষমতা এবং উৎপাদনশীলতাকে বহুগুণে বৃদ্ধি করবে।

এআ‌ই চাই, তবে কিছু ভয়ও আছে
  • ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

পি চিদম্বরম: এখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। এটা সত্য যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের ক্ষমতা এবং উৎপাদনশীলতাকে বহুগুণে বৃদ্ধি করবে।

Advertisement

ভারতে মানবসম্পদের বিশাল এবং ক্রমবর্ধমান ভাণ্ডার রয়েছে (কমপক্ষে ২০৫০ সাল পর্যন্ত)। তবে, এর মান উন্নত দেশগুলির মানবসম্পদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে আলাদা। একটি উন্নত দেশে সকলেই বস্তুত স্কুলশিক্ষাপ্রাপ্ত এবং একটি বড়ো অংশ কলেজেরও পাঠ পেয়েছে। সুযোগ রয়েছে জীবনব্যাপী শেখার এবং নতুন নতুন ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনের। ভারতে জনসংখ্যাগত বোঝার (ডেমোগ্রাফিক বার্ডেনস) সঙ্গেই আসে জনসংখ্যাগত লভ্যাংশ (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড)। প্রাথমিক স্তরে স্কুলে ভরতির হার অনেক বেশি। কিন্তু তার পরবর্তী ধাপগুলিতে—উচ্চ প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে এনরোলমেন্ট কমে যাচ্ছে। উচ্চ শিক্ষায় গ্রস এনরোলমেন্ট রেশিয়ো বা মোট ভরতির অনুপাত (জিইআর) ৪৫-৫০ শতাংশের মধ্যে। কলেজে ভরতি হওয়া বেশিরভাগ তরুণ-তরুণী আন্ডারগ্র্যাজুয়েট বা স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন বটে কিন্তু ওই ডিগ্রি তাঁদের স্কিলড বা দক্ষ এবং নিয়োগ পাওয়ার যোগ্য করে গড়ে দেয় না। এই কারণে তাঁদের জন্য উপযুক্ত চাকরি খুঁজে পাওয়া একটি কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়ায়।
ফিউচার (ভবিষ্যৎ) এবং ফিয়ার (ভয়) 
দুটিরই আদ্যক্ষর ‘এফ’ 
অ্যানথ্রোপিক-এর সিইও দারিও আমোদেই ‘দ্য অ্যাডোলেসেন্স অফ টেকনোলজি’ নামে একটি নিবন্ধ লিখেছেন। রচনাটির কপিরাইট রয়েছে। নিবন্ধটির সারসংক্ষেপ আমি পড়েছি। অর্থনৈতিক ব্যাঘাত সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য, এআই শ্রমবাজারকে ব্যাহত করতে পারে। সেটা হতে পারে অভূতপূর্ব গতিতে এবং পেশাগত বিভাগগুলির বিস্তীর্ণ ক্ষেত্রে। তার ফলে অদূর ভবিষ্যতে চাকরির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হারিয়ে যেতে পারে, বিশেষ করে হোয়াইট-কলার জব বলে পরিচিত নিয়োগগুলি। ব্যাপারটা ভয়ের বইকি। ভারতে আরেকটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, এআই কাস্ট বা বর্ণকে স্বীকৃতি দেয়। মানুষ যদি এআইকে কাস্ট-বায়াস বা বর্ণ-পক্ষপাত শিখিয়ে থাকে, তবে এটি হবে আরো ভয়ংকর।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঠিকই বলেছেন যে, এআই ভবিষ্যৎ এবং ভাগ্যের দরজা খুলে দেবে। পাশাপাশি চাকরি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাটাও রয়েছে। কোপ পড়তে পারে টিকিট প্রদানকারী কর্মী ও চেকার, বাস ও ট্রেনের কন্ডাক্টর, রেলের সিগন্যাল সিস্টেম যাঁরা সচল রাখেন, ট্রাফিক পুলিশ অফিসার, স্টেনোগ্রাফার এবং টাইপিস্ট, ট্যুরিস্ট গাইড, অনুবাদক, ল্যাব টেকনিশিয়ান, ব্যাংক টেলার, প্রাইভেট টিউটর প্রভৃতির কাজে। নিয়মিত এবং অস্থায়ী দুটি ক্ষেত্রেই এসব চাকরি ভ্যানিশ হয়ে যেতে পারে। মাইক্রোসফটের সিইও বলেছেন যে, হোয়াইট-কলার চাকরির অনেক কাজ অটোমেটেড হয়ে যাবে বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হবে। এই কোম্পানি ২০২৫ সালে হাজার হাজার চাকরি ছাঁটাই করেছে। টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস (টিসিএস) ২০২৫ সালে ঘোষণা করেছিল যে পুনর্গঠন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে তারা ১২ হাজারের বেশি কর্মীকে ‘ছাঁটবে’। বিনোদ খোসলার ভবিষ্যদ্বাণী ছিল যে, আইটি পরিষেবাগুলি এআই নির্মূল করতে পারে এবং বিপিও সংস্থাগুলি প্রায় অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে আগামী পাঁচবছরের মধ্যে।
ভারতের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হল চাকরির অভাব। বর্তমান ‘সরকারি’ বেকারত্বের হার ৫.১ শতাংশ, তবে আমরা জানি যে এটা বস্তবে আরো বেশি। যুবদের ভিতরে বেকারত্বের হার ১৫ শতাংশ। এই শ্রেণির মধ্যে যাঁদের নিযুক্ত বলা হচ্ছে তাঁদের প্রায় ৫৫ শতাংশ স্বনিযুক্ত কিংবা অস্থায়ীভাবে কোনো প্রকার শ্রমদানে নিযুক্ত তাঁরা। সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলিতে কৃষিকাজ ইতিমধ্যেই যান্ত্রিক পদ্ধতিতে করা হচ্ছে। গ্রামীণ পরিবারগুলি যুবক বা মহিলাদের বেকারত্বকে স্বনিযুক্তির আড়ালে রেখে মুখরক্ষা করে। যদি শহুরে ব্লু-কলার চাকরিও দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়ে, এবং তথ্য-প্রযুক্তি ও আইটি প্রোডাক্টস/সার্ভিসেস প্রভৃতি দক্ষ ক্ষেত্র শিক্ষিত যুবকদের বেকার করে দেয়, তবে সেই পরিস্থিতি হয়ে উঠবে বিস্ফোরক!
এই অনিবার্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভারত এবং বিশ্ব কতটা তৈরি? আমি যতদূর বুঝেছি, ভারতসহ বিশ্ব এখনো সমাধানের জন্য প্রস্তুত নয়। প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা (সিইএ) উন্নত অর্থনীতি এবং উন্নয়নশীল দেশগুলির উপর এআই-এর প্রভাবের মধ্যে পার্থক্য কী হতে পারে তা তুলে ধরেছেন। 
তাঁর মতে, উন্নত অর্থনীতি জনসংখ্যাগত অবনতির মুখোমুখি হবে এবং  এআই একটি প্লাস হতে পারে তাদের জন্য। অন্যদিকে, উন্নয়নশীল দেশগুলির স্টেট ক্যাপাসিটির জন্য এআই হতে চলেছে একটি স্ট্রেস টেস্ট। স্বভাবতই দুই ক্ষেত্রের সমাধানগুলি ভিন্ন ভিন্ন। তার সমাধান হল, ‘‘নিরলস বাস্তবায়ন ভারতকে ‘ফার্স্ট লার্জ সোসাইটি’তে পরিণত করতে সাহায্য করতে পারে ... যেখানে প্রযুক্তিগত গ্রহণের সঙ্গে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সামঞ্জস্য রয়েছে।’’ সমাধান এতটা সহজ হলে খুশি হতাম।
কঠিন ব্যবস্থা
প্রযুক্তির অবিরাম গ্রহণের প্রাথমিক ফলাফল হল চাকরিতে কোপ। ব্যাপারটা অন্তত ভারতীয় কারখানাগুলিতে ঘটেছে। কিন্তু ‘ইকোনোমিস্ট’ যেমন বলেছে, ‘উদ্ভাবন ও বিস্তার’-এর মধ্যে সময় পাওয়া যাবে, যখন প্রযুক্তিগত গ্রহণের প্রভাব শোষণ করার মতো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় বিপুল সংখ্যক কর্মপ্রার্থী এবং চাকরির নিরিখে ভারতকে প্রস্তুত থাকতে হবে—
• উন্নত দেশগুলির মতো করলে হবে না। পরিস্থিতি মেনে নিয়ে ভারতকে বিভিন্ন ধরনের চাকরি সৃষ্টি করতে হবে। সেই চাকরিতে উচ্চ প্রাথমিক, মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে স্কুলছুটদেরও যেন জায়গা হয়।
• উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিক এবং নন-অ্যাকাডেমিক ধারা দুটি অ্যাপটিটিউড ও মেরিটের ভিত্তিতে পৃথক করতে হবে।
• বিজ্ঞান-বহির্ভূত বিষয়গুলিতে অসংখ্য ‘পাস’ কোর্স বন্ধ করতে হবে। তার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিয়ে যেতে হবে—স্নাতকোত্তর শিক্ষায় অথবা এসটিইএম (সায়েন্স, টেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যাথামেটিকস) কিংবা কিছু স্কিলিং কোর্সে।
• শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক বিনিয়োগ করতে হবে।
• স্থানীয় বা আঞ্চলিক ব্যাংকের সহযোগিতায় স্থানীয়/আঞ্চলিক বাজার গড়ে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে সেখানে ভালো মানের পণ্য এবং পরিষেবা উৎপাদন ও ব্যবহার করা হবে। এজন্য বড়ো ব্যবসা, বড়ো বাজার, বড়ো চেইন এবং বড়ো ব্যাংকের প্রতি আচ্ছন্ন থাকা ঠিক হবে না। 
• মানতে হবে যে, আজকের দিনে কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিচারে ছোট ও মাঝারি শিল্প-ব্যবসাই (এমএসএমই) ভারতের জন্য সবচেয়ে বড়ো ক্ষেত্র। এআই যদি এমএসএমইগুলিকে সাহায্য করতে পারে—যেমনটা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রী— এমএসএমইগুলি আরো বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবে। প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা উল্লেখ করেছেন যে ভারতে ‘‘প্রতিবছর কমপক্ষে ৮০ লক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি করা দরকার।’’ প্রয়োজন যদিও আরো বেশি। 
• যারা এআই গ্রহণ করবে এবং ফলস্বরূপ, কর্মসংস্থান ধ্বংস করবে তাদের সমসংখ্যক কর্মসংস্থান তৈরিও করতে হবে। জেপি মর্গান চেজ-এর সিইও জেমি ডিমনের সঙ্গে আমাদের একমত হতে হবে না এবং ‘ছাঁটাই’ নিষিদ্ধ করতে হবে। কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) ব্যবসায় কিছুটা সামাজিক দায়িত্ব এনে দিয়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির দায়িত্বটাও এর মধ্যে অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।
দুঃস্বপ্নময় ভবিষ্যৎ
চাকরিবিহীন পৃথিবী, অথবা সেখানে কর্মসংস্থান নগণ্য—একটি ডিস্টোপিয়ান বা দুঃস্বপ্নময় ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকবে। ‘কাজ’ দিয়েই একজন মানুষকে বোঝানো যায়। অন্য কোনো জীব খাদ্যের খোঁজে ছাড়া স্বেচ্ছায় কাজ করে না। যদি এআই আমাদের সমস্ত কাজই করে দেয় এবং সকলের জন্য সমৃদ্ধি আনে, তাহলে মানুষ কী করবে? আগামী কয়েকবছরেই  এআই-এর প্রভাব আরো প্রকট হবে। প্রশ্নটি নিয়ে এটাই ভাবার সময়। 
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ