Bartaman Logo
২৭ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

পড়ার সময় ঘুম পায়, সামলাবেন কী করে?

বাচ্চাদের পড়ার সময় ঘুমানোর সমস্যা নিয়ে মনোবিদ শ্রীজা শেঠিয়ার পরামর্শ। কার্যকরী টিপস ও সমাধান জানুন। বিস্তারিত পড়ুন।

পড়ার সময় ঘুম পায়, সামলাবেন কী করে?
  • ২৭ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

আপনার সন্তান কি পড়তে বসলেই ঘুমে ঢুলে পড়ে? এই সমস্যার সমাধান কী? পরামর্শ দিলেন মনোবিদ শ্রীজা শেঠিয়া।

Advertisement

রিভুর বয়স সাত বছর। সারাদিন নানা দস্যিপনায় মাতিয়ে রাখে বাড়ি। কিন্তু সন্ধেবেলায় পড়তে বসলেই বাঁধে গন্ডগোল। বইয়ের উপর ঢুলতে থাকে সে। চোখ দুখানা বোজা। এই নিয়ে মায়ের বড্ড চিন্তা। পরীক্ষায় পাশ করবে না যে পুত্র! তাহলে উপায়? প্রথমে ভেবেছিলেন ছেলে বুঝি দুষ্টুমি করছে। পড়ায় ফাঁকি দেওয়াই তার উদ্দেশ্য। সেই মতো বকাঝকাও করেছেন তিনি সন্তানকে। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। মায়ের বকায় খানিক হকচকিয়ে জেগে উঠে পড়তে শুরু করেছে রিভু প্রতিবারই। তারপর আবারও যে কে সেই, ঘুমে ঢুলে পড়েছে সে। 
রিভুর মায়ের সঙ্গে হয়তো একমত হবেন অনেক বাচ্চার মা। সন্তানের এই সমস্যা যে খুব নতুন কিছু তাও নয়। তবে এর বিভিন্ন কারণ। মনোবিদ শ্রীজা শেঠিয়া জানালেন, পড়তে বসলেই ঘুম পেয়ে যাওয়া অনেকক্ষেত্রেই স্নায়বিক সমস্যা। আমাদের মস্তিষ্ককে জাগিয়ে রাখা বা সচল রাখার দায়িত্বে রয়েছে রেটিকুলার অ্যাক্টিভেটিং সিস্টেম বা আরএএস। এটি আমাদের জেগে থাকার সুইচ হিসেবে কাজ করে। এবার সেই সুইচ যদি কোনোভাবে বন্ধ হয়ে যায় তাহলে অবেলাতেও আমরা ঘুমিয়ে পড়তে পারি। 
কিন্তু পড়ার সময়টা অবেলা হল কেমন করে? আর সেই সময় মস্তিষ্কের এই সিস্টেম হঠাৎ বন্ধই বা হতে যাবে কেন? শ্রীজা বললেন, পড়াশোনা করার সময় সাধারণত আমাদের চারপাশে একটা শান্ত পরিবেশ থাকে। আমরাও তারই মধ্যে চুপচাপ বসে মনে মনে পড়ি। ফলে আরএএস মনে করে, আমাদের এই মুহূর্তে সচল থাকার প্রয়োজন নেই। ফলে সে জাগরণের সুইচটা বন্ধ করে দেয় এবং বাচ্চাদের ঘুম পেয়ে যায়। 
অনেক সময় আবার এমনও হতে পারে, বাচ্চা হয়তো যে বিষয়টা পড়ছে তাতে তার কোনো আগ্রহ জন্মাচ্ছে না। তখন সে বিষয়টা নিয়ে মাথাও ঘামাতে চায় না। এর ফলে মস্তিষ্কে কোনো সেনসরি ইনপুট বা সংবেদনশীল তথ্য পৌঁছচ্ছে না। এর ফলে ব্রেন বুঝতেই পারছে না যে তাকে জেগে থাকতে হবে। কারণ বাচ্চাটি বইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকলেও মস্তিষ্কের অন্যান্য কাজ, যেমন বোঝা বা মুখস্ত করা, বন্ধ রেখেছে। অতএব একটানা বসে থাকলে আরএএস কাজ বন্ধ করে দেয় এবং আমাদের ঘুম পেয়ে যায়। এটা একটা সাধারণ ঘটনা।        
পড়ার বিষয়টা ভালো না লাগলে একটা বিরক্তি আসে। আর সেই বিরক্তির কারণে মনের উপর চাপ পড়ে। ফলে মস্তিষ্ক এই চাপ থেকে মুক্তি পেতে কাজ বন্ধ করে দিতে চায় সাময়িকভাবে। এবং বাচ্চার ঘুম এসে যায়। এক্ষেত্রে ঘুমটা মানসিক চাপের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার একটা উপায়। 
কিছু বাচ্চা অবশ্য দুষ্টুমি করেও ঘুমের ভান করতে পারে, যাতে বাবা মা তাকে বিশেষ চাপ না দেয়। সেক্ষেত্রে মা বাবাকে সচেতন হতে হবে। বুঝতে হবে বাচ্চার সত্যিই ঘুম পাচ্ছে নাকি সে পড়া এড়িয়ে যাওয়ার জন্য দুষ্টুমি করছে। এই ক্ষেত্রে বাচ্চার মনোযোগ কম বলেই ধরে নিতে হবে। এবং বাবা মাকে তা বাড়িয়ে তোলার জন্য সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। 

এছাড়া বিশেষ ক্ষমতাপ্রাপ্ত শিশুদের ক্ষেত্রেও ব্রেন সারাক্ষণ কাজ করতে পারে না। খানিকক্ষণ কাজ করার পর তা বন্ধ থাকে। আবারও কিছু সময় বাদে সচল হয়। সেক্ষেত্রেও এই ঘুমে ঢুলে পড়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। তবে এটা বিশেষ ক্ষেত্র, সাধারণভাবে এটা 
বিবেচ্য নয়। 
কীভাবে সামলাবেন?
এতক্ষণ তো সমস্যার কারণগুলোই বললেন শ্রীজা। কিন্তু তা সামলানোরও তো উপায় রয়েছে। শ্রীজা জানালেন, সমস্যা থাকলে তার সমাধানও অবশ্যই থাকবে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হল পড়ার মাঝে ফাঁক তৈরি করা। ডাক্তারি ভাষায় যাকে বলে পোমোডোরো টেকনিক। এক্ষেত্রে পড়ার জন্য সময় ভাগ করে দিতে হবে। আপনার বাচ্চার মনোনিবেশের ক্ষমতার উপর কুড়ি মিনিট থেকে আধঘণ্টা সময় বেঁধে দিন পড়ার জন্য। তারপর দশ মিনিটের একটা ফাঁক বা ব্রেক দিন বাচ্চাকে। এবং এই ব্রেকে সে যেন হাঁটাচলা বা ঘোরাঘুরি করে সেদিকে নজর রাখুন। অর্থাৎ ব্রেকে তাকে টিভি, আইপ্যাড, মোবাইল ইত্যাদি দেখতে দেওয়া যাবে না। সে হয় ঘুরে আসবে এ ঘর ও ঘর থেকে, নাহলে হয়তো একটু জল খেয়ে আসবে, কারও সঙ্গে একটু গল্পও করে আসতে পারে। মোটমাট তাকে সচল থাকতে হবে। তারপর আবারও সে মন দিয়ে পড়তে বসবে। এই যে পড়া এবং ব্রেক— এই রুটিনটা পড়ার গোটা সময়ের মধ্যে তিন থেকে চারবার ঘটবে। এতে পড়ার মাঝে একটা ফাঁক তৈরি হবে, ব্রেন বুঝবে তাকে সচল থাকতে হবে এবং বাচ্চার ঘুম পাবে না। 
দ্বিতীয় উপায় হল জোরে জোরে পড়ার অভ্যাস। এর ফলে ব্রেন কখনো অলস হয়ে যাচ্ছে না। সারাক্ষণই সে একটা কাজের মধ্যে রয়েছে। ফলে ঘুমও পাচ্ছে না। এই জোরে জোরে পড়ার সঙ্গে আবার অনেকে খানিকটা লেখারও অভ্যাস করান বাচ্চাকে। অর্থাৎ একটা পাতা, বা একটা অংশ জোরে পড়ার পর সেটাই লিখতে বলেন বাচ্চাকে। এর ফলে নানা কাজে ব্যাপৃত হয়ে থাকে শিশুর মস্তিষ্ক এবং তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা ভাবতেই পারে না। 
তৃতীয় উপায়টি হল ক্লোজড বুক টেকনিক। অর্থাৎ শিশু খানিক পড়ল, তারপর বই বন্ধ করে তা লিখে ফেলল। তারপর আবারও বাকি অংশ পড়ল এবং সেটাও লিখল। এইভাবে পড়লেও ব্রেনের আরএএস সারাক্ষণ সচল থাকে।
চতুর্থ একটা উপায়ও রয়েছে তা হল পড়ার সময় বসার ধরন বদল। অর্থাৎ একইভাবে বাচ্চা কখনোই পড়বে না। খানিকক্ষণ বসে পড়ার পর সে উঠে হাঁটতে হাঁটতে পড়া মুখস্থ করবে। তাতে ব্রেন অতিরিক্ত সচল থাকবে এবং শিশুর কোনোভাবেই ঘুম পাবে না। 

 

কিছু নিয়ম
 বাচ্চাকে সবসময় চেয়ার টেবিলে পড়তে বলুন। খাটে বসে কখনোই যেন সে না পড়ে। কারণ শোওয়ার ঘর আমাদের বিশ্রামের জায়গা। সেখানকার পরিবেশ অতিরিক্ত শান্ত থাকে। সেটাকে পড়ার জায়গা হিসেবে ব্যবহার করলে ব্রেন মিশ্র সিগনাল পায়। সে ঘুম এবং জাগরণের মধ্যে তফাত করতে পারে না।

 বাচ্চাকে যদি পড়ার ফাঁকে ব্রেক দেন তাহলে কতক্ষণ ব্রেক দেবেন এবং কতটা সময় সে একটানা পড়বে সেটা নির্দিষ্ট করে নিন প্রথম থেকেই। সেই নিয়মেই চলুন। বারেবারে পড়া ও ব্রেকের সময় বদল করবেন না। তাহলে ব্রেন বিচলিত হয়ে পড়ে। 

 কতক্ষণ পড়াবেন এবং কখন ব্রেক দেবেন এটা নির্ধারণ করবেন কী করে? এটির ক্ষেত্রে কিন্তু বাবা মাকে সচেতন হতে হবে। আপনার বাচ্চা একটানা কতটা পড়াশোনা নিতে পারছে তার উপর এই পড়া এবং ব্রেকের সময় নির্ধারিত হবে। ফলে খুব খেয়াল করে বাচ্চার পড়া ও ব্রেকের নিয়ম বেঁধে দিন। 

কমলিনী চক্রবর্তী
ছবি: সংশ্লিষ্ট সংস্থার সৌজন্যে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ