Bartaman Logo
৪ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

মায়ের সামনে দুষ্টুমি করার ক্ষমতা ছিল না

মায়ের প্রতি সন্তানের মাতৃঋণ নিয়ে অলকানন্দা রায়ের হৃদয়স্পর্শী গল্প। জীবনের নানান বাঁকে মায়ের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। বিস্তারিত পড়ুন।

মায়ের সামনে দুষ্টুমি করার ক্ষমতা ছিল না
  • ৪ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সন্তানের কাছে মাতৃঋণ আজীবনের। নিজের মাকে নিয়ে কতই না গল্প জড়িয়ে আছে জীবনের নানা বাঁকে। কিন্তু মায়েদের কথা আলাদা করে বলা হয় কই? বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা লিখছেন তাঁদের মায়ের কথা। এই পর্বে অলকানন্দা রায়।

Advertisement

• মা তো মা! সব মা সেরা মা, মায়ের সবকিছুই সেরা। আমার ক্ষেত্রেও তা-ই। আমরা খুব সম্ভ্রান্ত ছিলাম না, কিন্তু মা তার মধ্যেই খুব অভিজাত ও মার্জিত ছিলেন। মায়ের নাম দেবী চাকলাদার। পড়াশোনা করেছেন ব্রাহ্ম গার্লস-এ। সারা জীবন ধরেই সেই স্কুলের শিক্ষা, রুচি ও সৃজনশীলতা মা বহন করেছেন সম্মানের সঙ্গে। মায়ের সৃজনশীল ভাবনার অল্প কিছুটা হয়তো পেয়েছি, কিন্তু বুঝতে পারি, সেসবের অর্ধেক নাগালও পাইনি! মা না থাকলে আমি ‘আমি’ হয়ে উঠতে পারতাম না। আমার বাবা নেপথ্যে থেকে যেমন আমাদের সমর্থন জুগিয়েছেন, মা একেবারে সামনে থেকে সেই নেতৃত্ব দিয়েছেন। জীবনে কোনো কিছুই মা চাপিয়ে দেননি, পড়াশোনার ক্ষেত্রেও নয়। শুধু একটি জিনিস ছাড়া! সেটি গান শেখা। আমি বরাবরই নাচতে ভালোবাসি। সেটাও মায়েরই উদ্যোগ ও উৎসাহে শুরু হয়েছিল। বেশ ছিলাম নাচ নিয়ে। কিন্তু মায়ের দাবি হল, গানও শিখতে হবে। তখনকার দিনে মা বেশ নামী শিল্পী ছিলেন। শেখাতেনও খুব সুন্দর। এদিকে আমার তো একদম ভালো লাগত না গান শিখতে। খুব অনিচ্ছায় যেতাম। কিন্তু যেই দেখতাম, প্রতি বছর ফার্স্ট হচ্ছি, তখন আবার নতুন উদ্যমে শিখতাম ক’দিন। আবার যে কে সেই! কিন্তু মা কখনো গানটা ছাড়তে দেননি। এখন নাচের নানা ওয়ার্কশপ ও অনুষ্ঠান করতে গিয়ে বুঝি, এই গান শেখা কতটা জরুরি ছিল। ওয়েস্টার্ন মিউজিকের পুরো ধারণাই তৈরি হয়েছে গান শিখেছিলাম বলে। সেটাও মায়েরই কৃতিত্ব। 
আমরা সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে বড়ো হয়েছি। কিন্তু আমার মা-বাবা কেউই আমাদের পড়াশোনা ও নাচগান নিয়ে কোনো কার্পণ্য করেননি। ছেলেমেয়েকে ‘মানুষ’ করার জন্য যেখানে যেটুকু দরকার, করেছেন। জানেন, মা খুব বাচ্চাদের মতো ছিলেন। আমিও কিছুটা সেই ধারা পেয়েছি। আমার পুতুল, পরে আমার মেয়ের পুতুল নিয়েও মা খেলতে ভালোবাসতেন। তাদের জামা-সোয়েটার নিজের হাতে তৈরি করেছেন। তবে ছেলেমানুষি থাকলেও মা অন্যদিকে খুব কড়া ছিলেন। স্বাধীনচেতা ও স্বাবলম্বী ছিলেন। বেশ কিছু নিয়ম ছিল মায়ের। আমাকে আর দাদাকে সেসব মেনে চলতে হতো। মায়ের সামনে দুষ্টুমি করার ক্ষমতা আমাদের ছিল না। প্রায় দিনই বাইরে বা মায়ের চোখের আড়ালে  দুষ্টুমি করতাম, আর তার জন্য বকুনিও খেতাম। আমি ছোটো থেকেই দস্যি। মাঝে মাঝেই মারামারি করে বাড়ি ফিরতাম, আর মা খুব বকতেন! আমার পাঁচ বছরের বড়ো দাদা বেচারা আমার শাসনেই থাকত একপ্রকার!
মায়ের ৮৬-৮৭ বছর বয়সে একটা বড়ো অপারেশন হয়। তার আগে থেকে প্রায় বলতাম, ‘একা একা বেরিও না, বাড়ির গাড়ি নিয়ে যাও।’ কিছুই শুনতেন না। আমি যেই না বাড়ি থেকে বেরতাম, অমনি টুক করে অটো করে গড়িয়াহাট চলে আসতেন। খুব ফিট ছিলেন তখনও। আর গড়িয়াহাট ছিল মায়ের ফেভারিট জায়গা। কী যে ভালোবাসতেন গড়িয়াহাট যেতে! 
আমরা জয়েন্ট ফ্যামিলিতে বড়ো হয়েছি। পরে নানা সময়ে নানা সদস্য বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে গিয়েছেন। তবে আমাদের সব ভাইবোনের মধ্যে খুব ভালো বন্ডিং। মাকেও দেখেছি, জেঠিমা যা বলতেন, তার উপরে কথা বলতেন না, আবার জেঠু যা বলতেন, বাবা তার উপর কথা বলতেন না। আমার জেঠিমাও আমার আর এক মা ছিলেন। আমি তাঁকে ‘বউমা’ বলে ডাকতাম। প্রতি রবিবার সব ভাইবোনকে ধরে ঘষে ঘষে সাবান মাখিয়ে স্নান করাতেন জেঠিমা। মা-জেঠিমাদের আদরে, শাসনেই বড়ো হয়েছি আমরা।
ছোটোবেলা থেকেই দেখেছি, আমাদের পরিবারের জেঠিমা, জেঠু সবাই মাকে খুব ভালোবাসতেন। মাও সকলকে অন্তর দিয়ে ভালোবাসতেন। আমার যেটুকু সৌজন্যবোধ, অন্যকে ভালোবাসতে পারার ক্ষমতা সবই মা-বাবার থেকে পেয়েছি। মাকে অনেকদিন পেয়েওছি জীবনে। প্রায় ৯০ বছর বেঁচেছিলেন মা। সেটা আমারও সৌভাগ্য। আমার মনে হয়, মায়ের সঙ্গে আমার এই জীবনের এতগুলো বছর কাটানোই আমার কাছে সেরা উপহার।  

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ