Bartaman Logo
৩ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

আমার এই ভাষাতেই আনন্দ

‘ভাষা কী?’ একটি বাচ্চা মেয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল মাকে। উত্তরে তার মা বলে, ‘আমরা যে বাড়িটায় থাকি সেটাই তো ভাষা।’

আমার এই ভাষাতেই আনন্দ
  • ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০

ঋপণ আর্য: ‘ভাষা কী?’ একটি বাচ্চা মেয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল মাকে। উত্তরে তার মা বলে, ‘আমরা যে বাড়িটায় থাকি সেটাই তো ভাষা।’ জঁ লুক গোদারের সিনেমার এই দৃশ্যটি আমাকে ভাবিয়ে তুলেছিল, একটা বাড়ি ঠিক কীভাবে একটি ভাষা? সহসা মনে এল, বাড়ি তো এক বা একাধিক মানুষের আবাসস্থল। একাধিক প্রতিবেশী আশপাশে তার। জনগোষ্ঠীর পারস্পরিক ভাব বিনিময়ের মধ্য দিয়ে যুগ যুগ ধরে যেন অলক্ষ্যেই একটি ভাষা গড়ে তুলেছে বাড়িটি! প্রচলিত একটা গল্প শুনেছিলাম... সম্রাট আকবরের বিশ্বাস ছিল, মানুষ আসলে কথা বলার দক্ষতা নিয়েই জন্মায়। ভাষাবোধ আপনাআপনি জাগে। পারিপার্শ্বিক পরিবেশের প্রতি ততটা নির্ভরশীল না হলেও তার চলে। বীরবল বললেন, উঁহু! মানুষ হয়তো কথা বলার লক্ষণ নিয়ে জন্মাতে পারে। কিন্তু দক্ষতা যতটুকু, পুরোটাই পারিপার্শ্বিক পরিবেশের উপর নির্ভর করেই নির্মিত। আকবর একমত হতে না পারায় একটি পরীক্ষা প্রার্থনা করে বসেন বীরবল। সেই মতো নির্জন স্থানে একজন বোবা মানুষের দায়িত্বে কথা বলার লক্ষণযুক্ত একটি শিশুকে রেখে আসা হয়। বোবা মানুষটির পরিচর্যায় শিশুটি বেড়ে উঠতে লাগে। কয়েক বছরের মাথায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পর্যাপ্ত লক্ষণ থাকা সত্ত্বেও শিশুটি বোবা! গল্পটিকে আমার বড়ই নিষ্ঠুর লেগেছিল। একটি শিশু মাতৃভাষাই পেল না, সামাজিক স্তরে যোগাযোগের সেতুই নির্মিত হল না তার! যদিও বোবার একমুখ বন্ধ হলেও দশ আঙুল তার ভাষা তর্জমা করে দেয়, বলেছিলেন সৈয়দ মুজতবা আলি। তথাপি ইশারা-ইঙ্গিতের অধিক যোগাযোগ সাধনে, ছবির মতো স্বচ্ছ চিন্তাভাবনা প্রকাশে শব্দের চেয়ে ভালো মাধ্যম আর কিছুতে নেই। শব্দই ব্রহ্ম! একটা বয়সের পর একটা ভাষা শিক্ষা অর্জন করতে যাওয়া যতটা কঠিন, শৈশবে তা প্রবৃত্তিগতভাবেই অনেক বেশি স্বতঃপ্রণোদিত। যদিও শিশু নির্দিষ্ট কোনো ভাষা শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট হয় না। বরং যে ভাষা তাদের আশপাশে বলা হয়... সবথেকে কাছের জন যেমন মা-বাবা যে আদবকায়দায়, যে ভাষায় কথা বলে সেটাই শিখে ফেলে প্রথম। তবে প্রাথমিকভাবে যে-কোনো  শিশুই প্রথম প্রথম বাক্যের গঠনের চেয়ে অর্থের উপর বেশি জোর দেয়। এই যে শিশুটির প্রাথমিক ভাষা একটি বাড়িকেন্দ্রিক অর্থাৎ একটি অঞ্চলকেন্দ্রিক, এই তো তার মাতৃভাষা। পাঠ্যবই যতই প্রমিত ভাষায় পাঠদান করুক না কেন, তার নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষার মতো আপন নয়। উত্তরবঙ্গের এক বন্ধুর সঙ্গে শহুরে মেসবাড়ি যাপনকালে রুমমেট হিসাবে বুঝেছিলাম, বন্ধুটি যতই প্রমিত ভাষায় সাবলীল হোক না কেন,  কবিতা-গদ্য লিখুক না কেন, যখন দেশের বাড়ির কোনো বান্ধব ফোন করত, তার কথা বলার ধরন বদলে যেত। উচ্চারিত বাক্যের অনেক শব্দই তখন অচেনা! কিন্তু উচ্ছ্বাস... যেন আরও প্রাণবন্ত, আরও বেশি ভাব বিস্তারের, প্রমিত বাংলার অধিক। এক বাঁকুড়ার বন্ধুকেও মনে পড়ে, যে খুবই সাবলীল ছিল প্রমিত বাংলা উচ্চারণে। কিন্তু প্রবল উচ্ছ্বাসে-আনন্দে সে ফিরে যেত আঞ্চলিক বাঁকড়ি ভাষার কাছেই। আবার আমাদের রুদ্রপুরের এক বাসিন্দা, যার সঙ্গে কস্মিনকালেও যোগাযোগ বিশেষ ছিল না, কিন্তু একবার বিদেশবিভুঁইয়ে অচানক সাক্ষাতে দু’জনেই যে কী তুমুল আনন্দ পেয়েছিলাম! এক পাড়ায় যুগাধিক একত্রে থেকেও যে সম্পর্ক কখনো গড়ে ওঠেনি, তা সম্ভব হল অন্য ভাষাভাষীর জলবায়ুতে হঠাৎ দেখায়। একই আঞ্চলিক ভাষার মানুষ হওয়ার দরুণ সেখানে যে পারস্পরিক আত্মীয়তা গড়ে উঠেছিল, তা একসময় আমাদের রুদ্রপুরের দুই বাড়ির মধ্যে এক যোগাযোগের মাধুর্য রচনা করে। ভাষার মাধুর্য বলতে মনে পড়ে ‘শৈশবখানা’র সুবাদে আলাপে আসা একজন ইতালিয়ান তরুণী ইলারিয়া কালকাগনোর কথা।

Advertisement

যখন তিনি বাংলা বর্ণমালায় সজ্জিত মাদার টেরেসার একটি ছবি পাঠিয়ে লেখেন, ‘You have the beautiful mother tongue Ripan, mine is Italian. Something from my chamber, one day I will learn the language.’ উচ্ছ্বসিত হয়ে তাঁর ফেসবুক টাইমলাইনে গিয়ে দেখতে পাই, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একাধিক কবিতার ইতালীয় অনুবাদ। জানতে পারি, রবীন্দ্রনাথকে তিনি নিজের আত্মার কণ্ঠ দেওয়া কবি বলে মানেন। রবি ঠাকুরকে সরাসরি বাংলা ভাষায় না পড়তে পারার কী যে অনিন্দ্যসুন্দর আফসোস তাঁর!  নিজেকে তখন অনেক বেশি সতেজ টাটকা বাংলা বর্ণমালা মনে হয়! আ মরি বাংলা ভাষা।যে-কোনো ভাষাই বেঁচে থাকে বৃহত্তর চর্চার আগ্রহে, গল্প, গান, উপন্যাস, সাহিত্যে। প্রমিত শব্দে সাহিত্য রচিত হলেও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শহীদুল জহির, সাম্প্রতিক সময়কালে লুৎফর রহমানের লেখায়, গল্প-উপন্যাসে সবিস্তারে উঠে এসেছে প্রান্তিক মানুষের পারস্পরিক আঞ্চলিক ভাষার প্রাণবন্ত কথোপকথন। সে ভাষা উচ্চারণের মাধ্যমে যেন আরও বেশি জীবন্ত হয়ে উঠেছে তাদের নিজস্ব অনুভূতি প্রকাশ, তাদের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও চিন্তাধারা। মানুষ আসলে তখনই সবচেয়ে বেশি বিপন্ন বোধ করে, যখন নিজস্ব ভাষা প্রকাশের জায়গা সঙ্কুচিত হতে শুরু করে। কোনো বিদেশি শব্দের বাংলায়ন বা বাংলা শব্দভাণ্ডারে সামিল হওয়া ভাষাকে যতটা না আঘাত করে, তার চেয়েও বেশি কোণঠাসা করে আরোপিত অন্য কোনও ভাষা-সংস্কৃতি। ফলে আকছার হীনমন্যতা তৈরি হতে দেখা যায় আঞ্চলিক ভাষাভাষীদের মধ্যে। নিজের ভাষা নিয়ে তাঁরা যেন অপরাধবোধে ভোগেন। প্রমিত বাংলার ভিতর মানুষ তার নিজস্ব আঞ্চলিক বাংলা ভাষাকে লুকিয়ে ফেলার তাগিদ অনুভব করেন। কলকাতায় দীর্ঘ দিন বসবাসকারী এক বিহারীর সঙ্গে কথা বলতে গিয়েও বাংলায় না বলে ভাঙাভাঙা হিন্দিতে কথা বলে ফেলেন!ভিন্নভাষীর সঙ্গে যখন তার ভাষাতেই কথা বলে ফেলে মানুষ, সেই চেষ্টাটা অবশ্য সব সময় নিজ ভাষাকে আড়াল করার প্রবণতা থেকে আসে না। আসলে নিজের ভাষায় উলটোদিকের লোকটার কাছে যতটা না যেতে পারব, তার চেয়ে অধিক নিকটে পৌঁছানো সম্ভব হবে ওই ব্যক্তির ভাষায় কথা বললে। আমি যখন পূর্ব মেদিনীপুরের হেঁড়িয়া অঞ্চলে যাই, স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তার ভিতর খোদ সেখানের পরিভাষায় কথা বলে উঠি, চকিতে মুখটি তার উজ্জ্বল হয়ে ওঠে! ভাইপো সোম দুপুরে কোথাও থেকে ঘুরে এলে তাকে জিজ্ঞাসা করি যখন, ‘কী রে, এই দুফুরবা কাউনু আইলু?’ অথবা তাকে খুঁজে না পেয়ে তার মাকে যখন জিজ্ঞাসা করি,  ‘টকাটা যাইলো কাই?’ কী এক একাত্মবোধ করে ওরা, যেন আরও আপনজন হয়ে উঠি ওদের! হৃদয়ের প্রতিবেশী হয়ে ওঠা বীরভূমের শীতলগ্রামকে মনে পড়ে। বহুরূপীদের গ্রাম, যেখানে দুশো বছরের বেশি সময়জুড়ে বাজিকরদের দুর্গাপুজোর পুরোহিত একজন অব্রাহ্মণ। এবং সেই সুদূর ভেল রাজাদের আমল থেকেই সংস্কৃতে নয়, খোদ বাংলা ভাষায়, বাংলা মন্ত্র উচ্চারণেই পুজো সম্পন্ন হয়ে আসছে এযাবৎ! ভূভারতে এ বুঝি এক বিরল ঘটনা। সেই শীতলগ্রামের ওতপ্রোত যাপনে ছিলাম বিগত বছর চারেক। স্কুল ছুটি হলেও ক্লাসরুম ছাড়তে চাইত না বাচ্চারা! গল্প শুনতে চাইত। গল্প ওরা ভীষণ ভালোবাসে। ওরাও গল্প শোনায়, ওদের স্থানীয় ভাষায়, কী যে প্রাণবন্ত! ওরা তখন শিক্ষক আমার। যে শব্দ একেবারেই বুঝি না, ওরা আকার ইঙ্গিতে প্রমিত ভাষায় হাত ধরে বোঝায় আমায়। স্কুল টাইমের বাইরে বাচ্চাগুলোকে নিয়ে কুয়ে নদীর তীরে খেলার আয়োজনে যাই, মাঠে ঘাটে ঘুরে বেড়াই, গল্প-গানের আসর বসাই, মুড়ি-চানাচুরের মহোৎসবে যত বেশি ওদের ভাষায় কথা কই, দেখি ওরা আরও আরও খিলখিলিয়ে ওঠে। সন্ধে ঘনিয়ে এলে ওরা প্রত্যেকেই নিজের বাড়ি নিয়ে যেতে চায়, থেকে যেতে বলে। শীতলগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ছেড়ে আসার আগে ওদের, ওদের পরিবারের, গোটা গ্রামের ব্যবহারে ডুকরে ওঠার ভাষা টের পাচ্ছিলাম। একদিন স্বপ্নেও দেখেছিলাম দীপ্তির ঠাকুমা আধো বুলি ফোটা দীপ্তির বোনকে, স্কুলে ঢোকার মুখে যে রোজ মিহি গলায় ডেকে উঠত, ‘অ, তার...তার’, তাকে কোলে নিয়ে তেঁতুল গাছের গোড়ায় দাঁড়িয়ে বলছে, ‘মাস্টার, আপনি ত আর আসবেননিকো!’ কেবল স্বপ্নে নয়, জেগে থাকায় এখনও টের পাই নিজের ডুকরে ওঠা, যখন বিদায় কালের সেই ছোট্ট ঋত্বিকার ভিডিওটি দেখি। কী তুমুল তার চোখমুখে ফুটে ওঠা অভিব্যক্তির ভাষা, যাকে আশ্রয় করে সশব্দে সে বলে ওঠে— ‘স্যার, আপনি এই গাঁয়ে এসেই মরবা।’ সেদিন ঋত্বিকার সঙ্গে গোটা শীতলগাঁ-ই যেন বলে উঠতে চেয়েছিল, অন্তত শেষ জীবনে এসে আমি যেন ওদের মাতৃভূমি, ওদের মাতৃভাষাতেই সমাধিস্থ হই।

সম্পর্কিত সংবাদ