আগামী বৃহস্পতিবার রথযাত্রা। জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রা যাবেন মাসির বাড়ি। রথ মানেই কচিকাঁচাদের আনন্দ, মেলার মাঠের ভিড়। কেমন কাটবে রথযাত্রা, জানাল হুগলি জেলার বেগমপুর হাই স্কুলের পড়ুয়ারা। ছবিও আঁকল তারা।
আগামী বৃহস্পতিবার রথযাত্রা। জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রা যাবেন মাসির বাড়ি। রথ মানেই কচিকাঁচাদের আনন্দ, মেলার মাঠের ভিড়। কেমন কাটবে রথযাত্রা, জানাল হুগলি জেলার বেগমপুর হাই স্কুলের পড়ুয়ারা। ছবিও আঁকল তারা।
পুরীতে আনন্দোৎসব
রথযাত্রা নামটা শুনলেই মনের মধ্যে ভেসে ওঠে পুরীর ছবি। ওড়িশায় এই উৎসব অত্যন্ত জাঁকজমক সহকারে উদ্যাপিত হয়। গত বছর রথ ও উলটো রথের মাঝে পুরী গিয়েছিলাম বেড়াতে। সেখানকার অভিজ্ঞতা অভাবনীয়। এই সময় জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রা বিগ্রহ গুণ্ডিচা মন্দিরে অবস্থান করে। তবে, জগন্নাথের রথযাত্রা বাঙালির সংস্কৃতিরও অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আমাদের বাড়িতে এবার রথের দিন পুজো হবে। মা বলেছেন লুচি, পায়েস, পনির, ছোলার ডাল ও আলুর দম রান্না হবে। রান্নাগুলি এত লোভনীয় যে, কবে রথ আসবে, তার জন্য চাতক পাখির মতো বসে আছি। বন্ধুদেরও নিমন্ত্রণ করা হয়েছে। এবছর সবাই একসঙ্গে রথ টানব ঠিক করেছি। আর জিলিপি, পাঁপড় ভাজাও খাওয়া হবে।
—অনীশ পাল, সপ্তম শ্রেণি
উৎসবের মাহাত্ম্য
উৎসব মানেই মিলন। রথযাত্রাও বর্ষার এক প্রধান উৎসব। এই উৎসব ঘিরে থাকে জগন্নাথ ভক্তদের মনে তুমুল উন্মাদনা। ধনী-দরিদ্র সকল শ্রেণির মানুষ এই উৎসবে শামিল হন। জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রাকে মাসির বাড়ির পৌঁছে দিতে সকলেই রথের রশিতে টান দেন। রথের দিন স্কুল ছুটি থাকে। সকাল থেকেই লেগে পড়ি রথ সাজানোর কাজে। মার্বেল কাগজ, বাহারি গাছ— কত কী লাগে রথ সাজাতে। রথ সাজানোর কাজে মা আমাকে সাহায্য করেন। রথ নিয়ে যখন বিকেলে রাস্তায় বেরই, তখন সকলের হাতে বাতাসা প্রসাদ তুলে দিই। অনেকেই রথের দড়ি ধরে টানতে চান। মা বলেন, সকলের একবার রথের দড়িতে হাত দেওয়া উচিত। আর সোজা রথ টানলে অবশ্যই উলটো রথ টানতে হয়।
—সহানুশিস মান্না, অষ্টম শ্রেণি
জয় জগন্নাথ
আমার মামার বাড়ি ওড়িশাতে। তাই বেশ কয়েকবার পুরীর রথযাত্রার সাক্ষী থাকার সৌভাগ্য হয়েছে। যতবারই শ্রীজগন্নাথের রথযাত্রা চাক্ষুস করেছি, প্রতিবারই মনে হয়েছে, এই যেন প্রথম দেখছে। সেই উন্মাদনা লিখে প্রকাশ করা যাবে না। লোকে লোকারণ্য! জগন্নাথদেবের নন্দীঘোষ, বলরামের তালধ্বজ এবং সুভদ্রার দর্পদলন— তিনটি রথ টানা হচ্ছে। রথ তিনটির যেমন আলাদা নাম রয়েছে, তেমনই রথ টানার দড়িরও আলাদা নাম রয়েছে। জগন্নাথদেবের রথের দড়ির নাম শঙ্খচূড় নাগিনী, বলরাম ও সুভদ্রার রথের দড়ির নাম যথাক্রমে বাসুকী নাগ ও স্বর্ণচূড় নাগিনী। রথের আগে যখন মামার বাড়ি যাওয়া ঠিক হয়, তখন কী যে আনন্দ হয়। ওখান থেকে আমরা পুরী যাই। জগন্নাথ দর্শনের পাশাপাশি আমরা সমুদ্রস্নানও করি। রথযাত্রা উপলক্ষ্যে বলব, ‘জয় জগন্নাথ!’
—রাজদীপ দে, ষষ্ঠ শ্রেণি
মেলাতেই আনন্দ
প্রতি বছর বাবার হাত ধরে রথের মেলাতে যাই। বৃষ্টির জন্য কাদা হলেও রথের মেলার প্রতি আমার অমোঘ আকর্ষণ। ছাতা মাথায় দিয়ে কত বার মেলা দেখতে গিয়েছি। বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে আমার মতো মেলাপ্রেমীরা ঠিক রথের মেলাতে ভিড় জমান। গত বছর বাবার সঙ্গে চন্দননগরে রথ দেখতে গিয়েছিলাম। আড়াইশো বছর প্রাচীন রথ দেখে আমি তো অভিভূত। রথে লাগানো ঘোড়া দু’টি লোহার তৈরি। কিন্তু দূর থেকে দেখে কেমন জীবন্ত মনে হচ্ছিল। যেন তারা রথ নিয়ে ছুটছে। রথটির উচ্চতা প্রায় ৪০ ফুট। রথযাত্রা উপলক্ষ্যে লক্ষ্মীগঞ্জ এলাকায় মেলা বসে। কত দোকান, কত মানুষ, হরেক জিনিসের সমাহার। ওই মেলা থেকেই ছোটো একটা কাচের রথ কিনেছিলাম। নানারকম খাবার খেয়েছিলাম। এবার মাহেশের রথ দেখার জন্য দিন গুনছি।
—প্রেম চট্টোপাধ্যায়, ষষ্ঠ শ্রেণি
মাহেশের রথ
আষাঢ় মাস পড়লেই শুরু হয় রথযাত্রার অপেক্ষা। রথের মেলা দেখার উন্মাদনা এখনও সেই ছোটোবেলার মতোই রয়েছে। আমাদের জেলার মাহেশে বিরাট রথযাত্রার আয়োজন করা হয়। এই রথের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘রাধারাণী’ উপন্যাসে মাহেশের রথের মেলার উল্লেখ রয়েছে। বাবার সঙ্গে আমি দু’-তিন মাহেশের রথযাত্রা দেখতে গিয়েছি। এবার ইচ্ছা আছে। প্রচণ্ড ভিড় হয়। কত রকম জিনিস বিক্রি হয়। মাহেশের রথযাত্রা আমার কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
—রুদ্রনীল ঘোষ, দ্বাদশ শ্রেণি
পাঁপড় ভাজা, পেঁয়াজি ছাড়া জমে না
রথযাত্রা শুনলেই ছোটোবেলার একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে যায়। তখন আমি ফোর-ফাইভের স্টুডেন্ট। বাবার হাত ধরে প্রথমবার রথের মেলা দেখতে গিয়েছি। বাবার কাছে জানতে চাইলাম, জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রা বছরে একবার কেন মাসির বাড়ি যান। আমি তো প্রায়ই মাসির বাড়ি বেড়াতে যাই। বাচ্চা ছেলেকে কী জবাব দেবেন! বাবা বলেছিলেন, ‘আসল ঠাকুর দেবতারা তো খুব ব্যস্ত থাকেন। তবে, জগন্নাথ যেখানে থাকেন, সেখানেই রথটা থাকে। বছরে একবার ভাই-বোনকে সঙ্গে নিয়ে রথে চড়ে মাসির বাড়ির উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েন। বহুকাল ধরে এই ব্যাখ্যাটিই মনে প্রাণে বিশ্বাস করতাম। তবে, এখন বুঝি রথ হিন্দু ধর্মের অন্যতম প্রধান উৎসব। আর পাঁপড় ভাজা, পেঁয়াজি ছাড়া রথ জমে না।
—তমজিৎ ঘোষ, দ্বাদশ শ্রেণি
প্রধান শিক্ষকের কলমে
সালটা ১৯৬২। হুগলি জেলার বেগমপুর তখন জঙ্গলে ভরা। জীবিকা বলতে চাষাবাদ। তবে, তাঁতের শাড়ির জন্য বরাবর বিখ্যাত। শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ছেলেমেয়েরা। এক হাঁটু কাদা-জল ডিঙিয়ে পড়তে যেত হত পার্শ্ববর্তী জনাইতে। শিক্ষার্থীদের দুরবস্থা দেখে বেগমপুরের ঘোষ বাড়ি নিল এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। ওই বাড়ির দুর্গামণ্ডপে শুরু হল পঠনপাঠন। গুটিকয়েক ছাত্রকে নিয়ে। পড়ানোর ভার পড়ল গ্রামেরই ছেলে গোপালচন্দ্র পাল ও নিশিকান্ত আদকের উপর।
পরবর্তীতে ঘোষ বাড়ির দান করা জমিতেই গড়ে উঠল বিদ্যালয়। অর্থ সাহায্যে এগিয়ে এলেন স্থানীয় মানুষ। সেই ছোট্ট চারাগাছ আজ মহীরুহ। প্রায় ৪০টির মতো শ্রেণিকক্ষ, খেলার মাঠ, অনুষ্ঠান মঞ্চ কী নেই! এখন পড়ুয়া সংখ্যা প্রায় ১৬০০। ড্রয়িং, ক্যারাটে ইত্যাদি শেখানো হয়।
হুগলি জেলার সুব্রত কাপ ও ক্লাস্টার চ্যাম্পিয়ন এখানকার ছাত্ররা। বিগত বছরগুলিতে বহুবার মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের মেধা তালিকায় স্থান করে নিয়েছে এই স্কুল। পিছিয়ে পড়া ছাত্রদের জন্য রয়েছে রি-মেডিয়াল ক্লাস। সম্প্রতি ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে চালু হয়েছে ইংরেজি মাধ্যম। স্কুল চালাতে এই মুহূর্তে প্রয়োজন স্মার্ট বোর্ড, পানীয় জলের মেশিন। বিদ্যালয় ভবন রং করা দরকার। এরকম বেশ কয়েকটি সমস্যার সমাধান হলে বেগমপুর হাই স্কুল আরও এগিয়ে যাবে, আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।
— বাপ্পা খেটো, টিচার-ইন-চার্জ