Bartaman Logo
১২ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

বাংলা সাহিত্যের রথযাত্রা

বাংলা সাহিত্যের রথযাত্রা মানবজীবনের প্রতীক। বঙ্কিম ও রবীন্দ্রনাথের রচনায় রথের গভীর অর্থ। বিস্তারিত পড়ুন।

বাংলা সাহিত্যের রথযাত্রা
  • ১২ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সৌম্যব্রত দাশগুপ্ত: ‘রাধারানী নামে একটি বালিকা মাহেশে রথ দেখিতে গিয়াছিল। বালিকার বয়স একাদশ পরিপূর্ণ হয় নাই...’— বাংলা সাহিত্যের এই অমর পঙ্ক্তিগুলি উচ্চারিত হলেই স্মৃতিতে ভেসে ওঠে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস রাধারানী। সেই উপন্যাসে মাহেশের রথযাত্রা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং মানবজীবনের বেদনা, আশা, ভালোবাসা ও নিয়তির এক মর্মস্পর্শী পটভূমি। দুঃখিনী রাধারানীর হাতে গাঁথা বনফুলের মালা আজও বাঙালির সাহিত্যস্মৃতিতে অমলিন হয়ে আছে।

Advertisement

বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে মাহেশ শুধু একটি জনপদের নাম নয়, এক ঐতিহ্যের প্রতীক। পুরীর পরেই ভারতের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম রথোৎসবের আসর বসে হুগলির শ্রীরামপুরের মাহেশে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পদস্পর্শে পবিত্র এই ভূমি পরবর্তীকালে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের আগমনেও ধন্য হয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই রথযাত্রা ধর্মীয় ভক্তি, লোকঐতিহ্য এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনার এক উজ্জ্বল মিলনক্ষেত্র হয়ে আজও আপন মহিমায় সমুজ্জ্বল।
রথযাত্রার সঙ্গে বাংলা সংস্কৃতির যোগাযোগ দীর্ঘদিনের। রথযাত্রা যেমন একটি ধর্মীয় উৎসব, তেমনই রথযাত্রার গভীর ব্যঞ্জনায় ব্যক্ত হয় ঈশ্বর ও মানুষের মিলনের বার্তা। অনেক সময় আমাদের গণতন্ত্রের মূল চেহারায় ফুটে ওঠে এই রথযাত্রার চিত্র। প্রাসাদে থাকা রাজধর্ম যখন প্রকৃত পিপল বা জনগণের সঙ্গে এসে মিশে যায়, এই বিষয়টি ব্যক্ত করতেই যেন রথযাত্রার পরিকল্পনা। বাংলা সাহিত্যের দিকপাল সাহিত্যিকরা সেই আদিযুগ থেকে রথযাত্রার প্রতীকটিকে ব্যবহার করে অসামান্য সাহিত্য রচনা করে গিয়েছেন।
রথযাত্রার ‘যাত্রা’ শুধু দেবতার নয়, ভক্তেরও। দেবতার প্রতি গভীর প্রেম ও ভক্তির আকর্ষণেই ভক্ত রথকে এগিয়ে নিয়ে চলেন। রথ শুধু পৌরাণিক যান নয়, শান্তি, প্রেম ও ভক্তিরও প্রতীক। বাংলা বৈষ্ণব সাহিত্যে, বিশেষত বৈষ্ণব পদাবলিতে, রথযাত্রা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি রাধা-কৃষ্ণের বিরহ-মিলনের আধ্যাত্মিক রূপক এবং মানবাত্মার পরমাত্মার সঙ্গে মিলনের প্রতীক। বৈষ্ণব দর্শনে কঠোপনিষদ-এর অনুকরণে মানবদেহকে রথ, ইন্দ্রিয়কে অশ্ব, মনকে লাগাম এবং আত্মাকে রথের যাত্রী হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে, যা আত্মিক মুক্তির অভিযাত্রাকে নির্দেশ করে। কৃষ্ণদাস কবিরাজ-প্রণীত শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত-সহ বিভিন্ন চরিতগ্রন্থে রথযাত্রার সময় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নামসংকীর্তন ও ভক্তদের সঙ্গে তাঁর নৃত্যের অনুপম বর্ণনা পাওয়া যায়। বাংলা বৈষ্ণব সাহিত্য ও চৈতন্যদেবের নীলাচল লীলার প্রভাবে রথযাত্রা বাংলায় এক স্থায়ী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে, যার প্রতিফলন সাহিত্য, মন্দির স্থাপত্য ও বিভিন্ন মঙ্গলকাব্যেও সুস্পষ্ট।
কালীপ্রসন্ন সিংহ এই বর্ণনার মাধ্যমে শুধু রথযাত্রার উৎসবই নয়, ঊনবিংশ শতাব্দীর কলকাতার সমাজ, নগর-সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার এক বাস্তব ও মূল্যবান দলিল উপস্থাপন করেছেন। রথযাত্রার দিন চিৎপুর রোড জনসমুদ্রে পরিণত হতো। রাস্তার ধারে মাটির জগন্নাথ, তালপাতার ভেঁপু, শোলার খেলনা ও নানা দোকান বসত। নতুন পোশাকে সেজে শিশু ও পরিবারের সদস্যরা রথ দেখার জন্য ভিড় জমাতেন। সুসজ্জিত রথের সামনে নিশান, বাদ্যযন্ত্র এবং পেছনে বৈরাগীদের কীর্তনযাত্রা উৎসবকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলত। এই বর্ণনার মাধ্যমে কালীপ্রসন্ন সিংহ ঊনবিংশ শতাব্দীর কলকাতার সমাজ, নগর-সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার এক মূল্যবান দলিল তুলে ধরেছেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যে রথযাত্রা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, মানবজীবন ও সময়চেতনার প্রতীক। তাঁর রচনায় রথের আবহে যেমন শৈশবের নির্মল আনন্দ ধরা পড়ে, তেমনি সমাজের বৈষম্য ও বঞ্চনার ছবিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একপয়সার বাঁশি হাতে হাসিমুখে ফেরা শিশুর পাশে রাঙা লাঠি কিনতে না-পারা আরেক শিশুর বিষণ্নতা—এই দ্বৈত জীবনচিত্র রথের উৎসবকে মানবিক অনুভূতির অনন্য মাত্রা দিয়েছে।
"লিপিকা" গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত "রথযাত্রা" গল্পে রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন, রাজকীয় আড়ম্বরের রথ সকলের জন্য নয়; কিন্তু মহাকালের রথ কোনো প্রাচীর মানে না। তাই রাজপ্রাসাদের বাইরে থাকা দরিদ্র মানুষের বিশ্বাস, ঈশ্বরের রথ একদিন তাঁর দরজায়ও এসে থামে। এই বিশ্বাসেই রথ হয়ে ওঠে সাম্যের প্রতীক।
রবীন্দ্রনাথের "কালের যাত্রা" নাটকে রথযাত্রা মানব সমাজের স্থবিরতা ভেঙে এগিয়ে চলার আহ্বান। তাঁর কাছে রথ কেবল চলমান কাঠামো নয়, সময়, পরিবর্তন ও মানবমুক্তির রূপক।
এই ভাবনারই কাব্যিক প্রকাশ ঘটে "রথযাত্রা" কবিতার বিখ্যাত পঙ্ক্তিতে—“ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম। পথ ভাবে আমি দেব, রথ ভাবে আমি, মূর্তি ভাবে আমি দেব—হাসে অন্তর্যামী।” এই কয়েকটি পঙ্ক্তিতেই রবীন্দ্রনাথ বাহ্যিক আচার নয়, অন্তরের ঈশ্বর ও মানবতার চিরন্তন সত্যকে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পঞ্চগ্রাম' ও 'গণদেবতা' উপন্যাসের সূচনাতেই রথযাত্রা ও রথের মেলার প্রাণময় চিত্র গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে ওঠে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পথের পাঁচালী'-র ষষ্ঠ পরিচ্ছেদে দুর্গা ও অপুর রথযাত্রা-দর্শনের স্মরণীয় বর্ণনা এবং তাঁর 'তালনবমী' ছোটগল্পে রথতলা ও রথযাত্রার উল্লেখ এই লোকউৎসবের সাংস্কৃতিক তাৎপর্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। অন্যদিকে, সাহিত্যিক গজেন্দ্রকুমার মিত্র তাঁর পুরী-কেন্দ্রিক নানা গল্প ও উপন্যাসে জগন্নাথ দেবকে অলৌকিক অথচ আপনজনের মতো জীবন্ত করে তুলেছেন। স্নানযাত্রার পর দেবতার জ্বর, 'পখাড় ভাত' থেকে '৫৬ ভোগ'—এসব লোকায়ত আচার-অনুষ্ঠানের সূক্ষ্ম বর্ণনায় তাঁর রচনায় জগন্নাথ কেবল দেবতা নন, ভক্তের সুখ-দুঃখের অন্তরঙ্গ সহচর হয়ে ওঠেন।
বাংলা ছোটগল্পের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রূপকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘রথযাত্রা’ গল্পে রথের উৎসব মানবিক ভালোবাসা ও করুণ জীবনের প্রতীকে রূপ পেয়েছে। গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মরণাপন্ন কিশোরী অমৃতা, যার জীবনের শেষ আকাঙ্ক্ষা—একবার রথযাত্রা দেখা। অসুস্থতার কারণে বাইরে যাওয়া অসম্ভব হলেও তার সেই ছোট্ট ইচ্ছাকে পূরণ করতে পরিবারের সদস্যরা ঘরের মধ্যেই রথযাত্রার পরিবেশ সৃষ্টি করেন। সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের নিঃস্বার্থ স্নেহ, শেষ ইচ্ছা পূরণের আন্তরিক প্রয়াস এবং মৃত্যুর মুখোমুখি জীবনের গভীর বেদনাকে অত্যন্ত সংযত অথচ হৃদয়স্পর্শী ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। গল্পটি মানবিক অনুভূতি ও পারিবারিক ভালোবাসার এক অনন্য দলিল।
কুমুদরঞ্জন মল্লিকের ‘রথযাত্রা’ কবিতা বাংলা সাহিত্যে জগন্নাথ-ভাবনার এক অনন্য প্রকাশ। কবির উজানি কাব্যগ্রন্থে ‘চণ্ডালী’ নামে প্রকাশিত এই কবিতায় এক বৃদ্ধ, খঞ্জ চণ্ডালীর পুরীযাত্রার মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে ভক্তির সর্বজনীনতা। সমাজের জাতপাত, ভেদাভেদ ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে কবি দেখিয়েছেন—জগন্নাথ সকলের, তাঁর দর্শনের অধিকার সকল মানুষের সমান। তাই এই কবিতা শুধু রথযাত্রার বর্ণনা নয়, মানবতা, সাম্য এবং সর্বজনীন ভক্তির এক চিরন্তন বন্দনা।
বনফুলের ‘জীবন ও রথ’ গল্পে বাইরে রথযাত্রার উৎসব যেমন জীবনের চলমান গতির প্রতীক, তেমনি অসুস্থ অমৃতার মৃত্যুমুখী যাত্রা জীবনের অনিবার্য পরিণতির ইঙ্গিত বহন করে। লেখক রথের বাহ্যিক গতি ও মানুষের অন্তর্জীবনের টানাপোড়েনকে এক অনন্য রূপকের মাধ্যমে শিল্পিতভাবে তুলে ধরেছেন।
রথযাত্রা কি শুধু ধর্মীয় উৎসব, নাকি মানুষের জীবন, আশা-আকাঙ্ক্ষা ও রাজনৈতিক বাস্তবতারও প্রতীক? এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই সাহিত্যিক প্রফুল্ল রায়  তাঁর 'রথযাত্রা' উপন্যাসে তুলে ধরেছেন ক্ষুধা, প্রতিশ্রুতি ও ক্ষমতার নির্মম বাস্তবতা। ভোটের আশ্বাস আর একবেলা ভালো খাবারের লোভে রথের পেছনে হাঁটা সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের মধ্য দিয়ে উপন্যাসটি আমাদের এক ভিন্ন ভারতবর্ষের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ