Bartaman Logo
১২ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

রূপকথার দেশ কেপ ভার্দে

কেপ ভার্দে প্রথমবার ফুটবল বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। দেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে বিস্তারিত জানুন। সম্পূর্ণ খবর এখানে।

রূপকথার দেশ কেপ ভার্দে
  • ১২ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

আটলান্টিক মহাসাগরের নীল জলরাশির বুক চিরে জেগে থাকা একটুকরো রূপকথা। নাম তার কেপ ভার্দে। ছোট্ট বন্ধুরা, তোমরা অনেকেই এখন ফুটবল বিশ্বকাপ দেখছ। এই দেশটি প্রথমবার ফুটবল বিশ্বকাপে সুযোগ পেয়েই তাক লাগিয়ে দিয়েছে বিশ্ববাসীকে। আজ তোমাদের আফ্রিকা মহাদেশে অবস্থিত এই দেশটির সম্পর্কে বিস্তারিত জানাব। আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল থেকে অনেক দূরে নীল জলরাশির মধ্যে ছড়িয়ে আছে একগুচ্ছ আগ্নেয় দ্বীপ। মানচিত্রে ছোটো একটা দেশ, কিন্তু ইতিহাস, সংস্কৃতি ও উন্নয়নের গল্পে যার বিস্ময়কর উপস্থিতি। দেশটির বর্তমান সরকারি নাম কাবো ভের্দে।
দশটি আগ্নেয় দ্বীপের এই পুঞ্জীভুত সৌন্দর্য এতদিন যেন অন্তরালেই থেকে গিয়েছিল। কিন্তু ফুটবল বিশ্বের মহাযজ্ঞে রাতারাতি ভেলকি দেখায় এই পুঁচকে দেশ। তাদের অদম্য লড়াই আর মাঠের জাদু বিশ্বমঞ্চে আলোড়ন তৈরি করল। ফুটবলপ্রেমীদের মুখে মুখে ফিরতে লাগল এক অনুচ্চারিত নাম। মানুষ গুগল করে খুঁজতে শুরু করল সাহারার কোল ঘেঁষে থাকা এই দ্বীপপুঞ্জকে। ফুটবলই একলহমায় লাইমলাইটে নিয়ে এল কেপ ভার্দেকে।
আয়তনে মাত্র চার হাজার বর্গকিলোমিটারের কিছু বেশি। জনসংখ্যাও ছয় লাখের আশপাশে। কিন্তু শিক্ষা, গণতন্ত্র, মানব উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে দেশটি আফ্রিকার অনেক বৃহৎ রাষ্ট্রের থেকে এগিয়ে। প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকে দরিদ্র হয়েও কীভাবে একটি দেশ মানবসম্পদকে পুঁজি করে উন্নয়নের পথ তৈরি করতে পারে, তার উজ্জ্বল উদাহরণ দেশটি। ১০টি প্রধান দ্বীপ ও কয়েকটি ছোটো দ্বীপ নিয়ে গঠিত এই দ্বীপরাষ্ট্রের রাজধানী প্রাইয়া। সান্তিয়াগো দ্বীপে অবস্থিত এই শহর কেপ ভার্দের অর্থনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতিরও প্রাণকেন্দ্র।

Advertisement

 আগ্নেয় দ্বীপের জন্মকথা
কেপ ভার্দের ভূপ্রকৃতি আফ্রিকার অন্যান্য দেশের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশটির অধিকাংশ দ্বীপই আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সৃষ্টি হয়েছে। ফোগো দ্বীপে এখনও সক্রিয় আগ্নেয়গিরি রয়েছে। এখানকার পিকো দো ফোগো ২ হাজার ৮২৯ মিটার উচ্চতায় দেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ।

 পর্তুগিজ উপনিবেশ থেকে স্বাধীন রাষ্ট্র
পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে পর্তুগিজ নাবিকরা কেপ ভার্দে দ্বীপপুঞ্জ আবিষ্কার করেন। সে সময় দ্বীপগুলোয় কোনো স্থায়ী জনবসতি ছিল না। এরপর পর্তুগাল দ্রুত দ্বীপগুলোকে নিজেদের উপনিবেশে পরিণত করে।
পরবর্তী প্রায় পাঁচ শতক কেপ ভার্দে পর্তুগিজ শাসনের অধীন ছিল। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এটি ইউরোপ, আফ্রিকা ও আমেরিকার মধ্যে সমুদ্রপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। বিশেষ করে দাস বাণিজ্যের যুগে পশ্চিম আফ্রিকা থেকে বন্দি মানুষদের আমেরিকায় পাঠানোর পথে কেপ ভার্দে ছিল অন্যতম প্রধান ট্রানজিট কেন্দ্র।
এই দীর্ঘ ঔপনিবেশিক যুগে আফ্রিকান জনগোষ্ঠী ও পর্তুগিজ বসতি স্থাপনকারীদের মিশ্রণে গড়ে ওঠে নতুন সমাজ। জন্ম নেয় ক্রেওল সংস্কৃতি, যা আজও কেপ ভার্দের জাতীয় পরিচয়ের মূল ভিত্তি। বিংশ শতকের মাঝামাঝি আফ্রিকা জুড়ে স্বাধীনতা আন্দোলনের ঢেউ উঠলে কেপ ভার্দেতেও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা জোরালো হয়। স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম নেতা ছিলেন আমিলকার কাবরাল। দীর্ঘ আন্দোলনের পর ১৯৭৫ সালের ৫ জুলাই দেশটি স্বাধীনতা লাভ করে। শিক্ষা, প্রশাসন, আদালত ও সরকারি ক্ষেত্রে পর্তুগিজ ভাষা ব্যবহৃত হয়। তবে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ভাষা হল কেপ ভার্দিয়ান ক্রেওল বা ক্রিওলু। কেপ ভার্দের সংস্কৃতির সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক তার সংগীত। ‘মোর্না’ নামের সংগীতধারা দেশটির পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশ্বখ্যাত সংগীতশিল্পী সেজারিয়া এভোরা কেপ ভার্দের সংগীতকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করে তুলেছেন। খালি পায়ে মঞ্চে গান গাওয়ার জন্য তিনি ‘বেয়ারফুট ডিভা’ নামে পরিচিত ছিলেন। এছাড়া ফুনানা, বাতুকে ও কোলাদেরা নামের লোকসংগীতও স্থানীয় সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কেপ ভার্দের ক্রীড়াঙ্গন খুব বড়ো নয়। জনসংখ্যাও সীমিত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আন্তর্জাতিক ক্রীড়াক্ষেত্রে দেশটির উপস্থিতি মনে রাখার মতো। বিশেষ করে ফুটবলে কেপ ভার্দের উত্থান এখন আফ্রিকান ফুটবলের অন্যতম আলোচিত বিষয়।
সমুদ্রঘেরা এই ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ফুটবল। জাতীয় দল পরিচিত ‘ব্লু শার্কস’ নামে। কেপ ভার্দের ফুটবল ইতিহাসে বড়ো বাঁক আসে ২০১৩ সালে। সেবার প্রথমবারের মতো আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে (আফকন) অংশ নিয়েই চমক দেখায় তারা। অভিষেক আসরেই পৌঁছে যায় কোয়ার্টার ফাইনালে। এরপর ২০২৩ সালের আফ্রিকা কাপেও দারুণ পারফরম্যান্স করে। ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়েও কেপ ভার্দের অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো। একসময় আন্তর্জাতিক ফুটবলের প্রান্তে থাকা দেশটি এখন বিশ্বের শীর্ষ ৭০ দলের মধ্যে অবস্থান করছে। দলের অন্যতম শক্তি হল প্রবাসী খেলোয়াড়েরা। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী কেপ ভার্দিয়ান বংশোদ্ভূত অনেক ফুটবলার জাতীয় দলের হয়ে খেলছেন। বিশেষ করে পর্তুগাল, ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডসের মতো দেশের ফুটবল সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা খেলোয়াড়েরা দলটিতে যোগ করেছেন অভিজ্ঞতা।
শুধু ফুটবল নয়, অ্যাথলেটিকস, বাস্কেটবল, ভলিবল ও নৌ–ক্রীড়াতেও দেশটির অংশগ্রহণ রয়েছে। চারদিকে সমুদ্রবেষ্টিত হওয়ায় সাঁতার ও জলভিত্তিক খেলাধুলার সম্ভাবনাও বাড়ছে। কেপ ভার্দের সবচেয়ে বড়ো বৈশিষ্ট্য হল সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও প্রতিভা তৈরি করা। এখানকার মানুষ খেলাকে শুধু বিনোদন হিসেবে দেখে না, বরং জাতীয় পরিচয় ও বিশ্বমঞ্চে নিজেদের তুলে ধরার একটি মাধ্যম হিসেবেও বিবেচনা করে।
দেশটিতে বর্তমানে প্রায় ৫ লক্ষ ৩০ হাজার মানুষের বসবাস। তবে কেপ ভার্দের সবচেয়ে বড়ো বৈশিষ্ট্য হল, দেশটির বাইরে থাকা প্রবাসী জনগোষ্ঠী। ঔপনিবেশিক সময় থেকেই জীবিকার সন্ধানে বহু কেপ ভার্দিয়ান ইউরোপ, আমেরিকা ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। এদেশের জনসংখ্যার বড়ো অংশ সান্তিয়াগো, সাও ভিসেন্তে, সাল ও সান্তা আনতাও দ্বীপে বসবাস করে। রাজধানী প্রাইয়া দেশটির সবচেয়ে বড়ো শহর এবং প্রশাসন, শিক্ষা ও ব্যবসার প্রধান কেন্দ্র।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ