সংবাদদাতা, ঘাটাল: দাউদাউ করে জ্বলছে দু’টো চিতা। একেবারে পাশাপাশি। এক চিতায় পুড়ছে স্বামী। অন্যটিতে স্ত্রী। পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে নিপাট প্রেম-ভালোবাসার একটা অধ্যায়। নীরব, নিঃস্তব্ধ গোটা শ্মশান। চোখের জল কিছুতেই বাগ মানছে শ্মশান যাত্রীদের। জীবন উৎসর্গ করা এক ভালোবাসার সাক্ষী তাঁরা। সাক্ষী দাসপুর থানার সুপাপুড়শুড়ি গ্রামও।
দাসপুরের এই অজ গাঁয়ে বাস করতেন সুবলচন্দ্র ভুঁইয়া (৬৫) এবং তাঁর স্ত্রী লতারানি ভুঁইয়া (৫৮)। দীর্ঘদিন ধরেই কঠিন রোগে আক্রান্ত ছিলেন লতারানিদেবী। অনেক চেষ্টা করে স্ত্রীকে সুস্থ করতে পারছিলেন সুবলচন্দ্রবাবু। স্ত্রীর রোগ-যন্ত্রণা তাঁকেও কুরে কুরে খাচ্ছিল। ভুগছিলেন চরম অবসাদে। জীবন বাঁচানোর যুদ্ধে হেরে গিয়ে শনিবার আত্মহত্যা করেন সুবলবাবু। সন্ধ্যায় স্বামীর মৃত্যুর খবর শুনে মারা যান স্ত্রীও। স্বার্থের দুনিয়ায় ভালোবাসার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলে গেলেন দু’জনেই। রবিবার পাশাপাশি চিতায় পুড়িয়ে দিলেন অবিচ্ছেদ্য দাম্পত্য সম্পর্ককে।
সুবলবাবু-লতারানির দীর্ঘ ৩০ বছরের সংসার। দুই কন্যা শ্রাবণী ও কৃষ্ণার বিয়ে হয়ে গিয়েছে। কষ্ট করে দুই মেয়েকে মানুষ করেছিলেন। দাসপুর-১ পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য তথা ওই গ্রামের বাসিন্দা দশরথ দলুই বলছিলেন, ‘ওদের জমিজমা কিছুই ছিল না। শ্রমজীবী মানুষ ছিলেন। তা সত্ত্বেও ওদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সুমধুর সম্পর্ক ছিল। শেষের কয়েকটা বছর ছিল সবচেয়ে কঠিন। লতাদেবী দীর্ঘ দিন নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। খাওয়া-দাওয়া, স্নান, ওষুধ সব কিছুর দায়িত্ব ছিল স্বামীর কাঁধে।’ প্রতিবেশীরা জানান, বহু জায়গায় চিকিৎসা করিয়েছিলেন সুবলবাবু। কখনও দাসপুর, কখনও ঘাটাল, কখনও মেদিনীপুরে। যাঁরাই আশা জুগিয়েছেন, তাঁদেরকেই ভরসা করেছেন। বারবার হতাশ হয়ে ফিরেছেন। প্রতিদিন লতাদেবীর অসহায় মুখ দেখে বুক ফেটে যেত সুবল। তিনি বলতেন, ‘আমি পারছি না, ওকে আর কিছুতেই বাঁচাতে পারব না বোধহয়…।’
শনিবার ভোরে গ্রামের কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সুবলবাবু বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। পরে বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে চন্দ্রকোণা থানার দোরখোলা গ্রামে একটি গাছে তাঁর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করে পুলিস। পরিবারের লোকজন ছুটে যান সেখানে। অসুস্থ স্ত্রীর কাছে খবর পৌঁছয়নি তখনও। ওই দিন সন্ধ্যায় কোনও ভাবে স্ত্রীর কাছে স্বামীর মৃত্যুর খবর পৌঁছতেই নিঃশব্দে থেমে গেল লতাদেবীর হৃদযন্ত্র।
বাবা-মায়ের এভাবে মৃত্যু হবে, তা ভাবতেই পারেননি শ্রাবণী-কৃষ্ণা। হাউহাউ করে কাঁদছেন দু’জনে। বলছিলেন, বাবা-মার মধ্যে কী যে ভালোবাসা ছিল, তা বলে বোঝানো যাবে না। বাবা যতবার শুনেছেন মা যন্ত্রণায় কষ্ট পাচ্ছেন, ততবারই ভেঙে পড়েছেন। ভাঙতে ভাঙতে এভাবে নিজেকে শেষ করে দেবে, বুঝতে পারিনি।’
শনিবার সুবলবাবুর দেহ ময়না তদন্ত করা সম্ভব হয়নি। রবিবার ঘাটালের মর্গ থেকে দেহ ময়না তদন্ত করার পর বাড়ি পৌঁছয়। একই দিনে দম্পতির দেহ দাহ করা হয়। দশরথবাবু বলেন, ‘আমরা অনেক দম্পতির জীবন দেখেছি। কিন্তু এমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা খুব কমই চোখে পড়ে। ওঁদের প্রেম শুধু এক সঙ্গে বসবাসে ছিল না। ছিল হৃদয়ের গভীরে। স্ত্রীকে সুস্থ করে তুলতে না পারার যন্ত্রণাই ওঁকে তিল তিল করে শেষ করে দিল। এই প্রেমের গল্পে ছিল না কোনও উপহার। ছিল শুধুই একে অপরের যত্ন আর দায়িত্ব।’