নৈনিতালের যে বাড়ির প্রতিটি ইট-কাঠ-পাথর জুড়ে শুধুই করবেটের স্মৃতি। ১৪৫ বছর প্রাচীন ‘গার্নি হাউস’ ঘুরে লিখলেন অনিরুদ্ধ সরকার।
নৈনিতালের যে বাড়ির প্রতিটি ইট-কাঠ-পাথর জুড়ে শুধুই করবেটের স্মৃতি। ১৪৫ বছর প্রাচীন ‘গার্নি হাউস’ ঘুরে লিখলেন অনিরুদ্ধ সরকার।
এক পড়ন্ত বিকেলে হাজির হয়েছিলাম নৈনিতাল শহর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে। জায়গাটা আইয়রপাট্টা হিল। হাইকোর্টের বিপরীতে। ম্যাল রোড থেকে হেঁটেই পৌঁছনো যায় কিংবদন্তি শিকারির ঠিকানায়। জিম করবেটের জীবনের অজস্র অধ্যায়ের কেন্দ্রস্থল—‘গার্নি হাউস’! নির্মাণকাল ১৮৮০। জিমের জন্মের পাঁচ বছর পর।
কটেজের গেটে পা রাখতেই সময় যেন হঠাৎ থমকে গেল। চারপাশে সবুজ ঘাসে ঢাকা লন। সুন্দর ফুলের বাগান। দূরে নৈনিতাল লেকের ঢেউয়ের মৃদু শব্দ। একপাশে শান্ত পাহাড়। গাছপালা থেকে ভেসে আসছে পাখির ডাক। দমকা হাওয়ায় মুহূর্তে মনে হতে পারে, এ কটেজের মালিক এখনও বুঝি আশপাশেই! মাথায় সেই চিরপরিচিত হ্যাট আর বাইনোকুলার হাতে... শোনাতে চলেছেন নতুন কোনও শিকারের গল্প।
নৈনিতালের কাছে আলমা হিলে এক বাংলো ছিল করবেট পরিবারের আদি ঠিকানা। ভয়াবহ ভূমিধসে সেটি ধ্বংস হয়ে গেলে জিমের মা নতুন বাড়ি তৈরির কথা ভাবেন। ধ্বংসপ্রাপ্ত আলমা হিলের বাংলোর কাঠ, দরজা-জানালা, ইট-সুরকি এবং কাঠামোর অংশগুলো নামিয়ে আনা হয় নৈনিতালের আইয়রপাট্টা রোডে। তা দিয়েই সেজে ওঠে ‘গার্নি হাউস’। ইংরেজি ‘গার্নি’ শব্দটির অর্থ, এমন একটি ঘর যা কোনও ভেঙে পড়া বা খুলে নেওয়া বাড়ির অংশ দিয়ে আবার নির্মাণ করা হয়েছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক স্থাপত্যরীতিতে তৈরি কটেজটি বর্তমানে ডালমিয়া পরিবারের মালিকানাধীন। অনুমতি নিয়ে পর্যটকেরা তা ঘুরে দেখতে পারেন। স্বয়ং করবেটের হাতে লেখা কপি, বইয়ের খসড়া, টেবল-চেয়ার, পুরনো টাইপরাইটার, শিকারের সামগ্রী সহ অনেক কিছু রয়েছে এখানে।
এই ‘গার্নি হাউসে’ বসেই নিজের বিখ্যাত বই ‘ম্যান-ইটার্স অব কুমায়ুন’-এর কয়েকটি অধ্যায়ের খসড়া তৈরি করেছিলেন কিংবদন্তি শিকারি। কটেজ থেকে বেরিয়ে প্রায়শই নিকটবর্তী বনাঞ্চলে যেতেন। তাঁর লেখা পড়ে জানা যায়, বাড়ির পিছনে একটি পাথরের বেঞ্চে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জঙ্গলের পোকামাকড়ের শব্দ শুনতেন করবেট। পাখিদের গতিবিধি লক্ষ্য করতেন। ভোরবেলা বেরতেন জঙ্গল জীবন পর্যবেক্ষণ করতে।
বহু গুরুত্বপূর্ণ মানুষের আনাগোনা লেগেই থাকত এই বাসভবনে। একবার ইংল্যান্ড থেকে এসেছিলেন কয়েকজন ব্রিটিশ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তাঁদের সঙ্গে বন সংরক্ষণমূলক ভাবনা নিয়ে অনেক আলোচনা হয় জিমের। আর সেই আলোচনা থেকেই বাস্তব রূপ নেয় ভারতের প্রথম জাতীয় উদ্যান—‘হেইলি ন্যাশনাল পার্ক’। পরবর্তীকালে সেই নাম মুছে গিয়েছে। জাতীয় উদ্যানটিকে উৎসর্গ করা হয় স্বয়ং জিম করবেটের নামে... ‘করবেট ন্যাশনাল পার্ক’।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নৈনিতালের এই কটেজেই বসবাস করতেন তিনি। ভারতে তখন জাপানি আক্রমণের আশঙ্কা চরমে। প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে ইংরেজ ও ভারতীয় সেনা। তাদের জঙ্গল যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ভার ন্যস্ত হয় কিংবদন্তি শিকারির কাঁধে। নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েই পাহাড়-বনে টিকে থাকার কৌশল শেখাতেন কুমায়ুন রেজিমেন্ট ও হিমালয়ের অন্যান্য সেনা ইউনিটকে।
গার্নি হাউসে বসেই করবেট স্থানীয় শিশুদের জন্য চালু করেছিলেন বিভিন্ন শিক্ষামূলক প্রকল্প। একটি পাঠশালাও প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, স্কুলজীবন থেকেই বাচ্চাদের বন সংরক্ষণ বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া জরুরি। তবেই জঙ্গল বাঁচবে। একবার তো স্থানীয় একটি স্কুলে বার্ষিক পুরস্কার হিসেবে নিজের লেখা বই বিতরণ করেন। স্কুলের প্রধান শিক্ষককে তিনি একটি চিঠিতে লেখেন—‘একজন শিশু যদি তার আশপাশের গাছ, পাখি আর হরিণ চিনতে শেখে, সে কোনওদিনই ওই গাছ কাটবে না, কিংবা প্রাণী হত্যা করবে না।’
একবার রাতের বেলায় হঠাৎ পথ ভুলে একটি বন্য হিমালয়ান ভালুক ঢুকে পড়েছিল নৈনিতাল শহরে। পুলিস তখন শরণ নেয় করবেটের। তাঁকে অনুরোধ করে সাহায্যের জন্য। সেই রাতে ‘গার্নি হাউস’ থেকে বেরিয়ে বন্দুক হাতে ভালুকটিকে ধাওয়া করে বনাঞ্চলের দিকে ফিরিয়ে দেন তিনি। গুলি না করেই সেটিকে জঙ্গলে ফিরিয়ে দেন। পরদিন নৈনিতালে ধন্য ধন্য পড়ে গিয়েছিল। স্থানীয় সংবাদপত্র ‘দ্য লেক ডিস্ট্রিক্ট গেজেট’-এ সেই খবরও ছাপা হয়। শিরোনাম ছিল —‘দ্য ম্যান হু নোজ দ্য ওয়াইল্ড বাই হার্ট’।
আর একবার ‘দেরাদুন বন নীতি’ নিয়ে আলোচনার জন্য তাঁকে আমন্ত্রণ জানায় ব্রিটিশ রাজপ্রশাসনের একটি দল। করবেট সেখানে না গিয়ে একটি দীর্ঘ চিঠিতে লেখেন— ‘সরকারি বন নীতি কখনওই সফল হবে না, যদি গ্রামের মানুষজন বনকে আপন মনে না করে।’ এই চিঠি পরবর্তীকালে ‘ইন্ডিয়ান ফরেস্ট রিভিউ’-এ প্রকাশিত হয়।
‘নৈনিতাল সমাচার’ নামে একটি স্থানীয় হিন্দি পত্রিকা থেকেও ছোট নিবন্ধের জন্য অনুরোধ এসেছিল করবেটের কাছে। কিংবদন্তি শিকারি সেই অনুরোধ রক্ষা করেছিলেন। সেই লেখার শিরোনাম ছিল— ‘জঙ্গল কি আত্মা’। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘বাঘ, চিতা, ভালুক এরা কেউই শিকারি নয়। ওরা প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রেখেছে। আমরা ওদের ভুল বুঝে নিজেদের বিপদ ডেকে আনি।’ গবেষকদের মতে, এটিই করবেটের হিন্দি ভাষায় লেখা একমাত্র প্রবন্ধ।
১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হলে, শৈল শহরগুলিতে ব্রিটিশ নাগরিকদের ঘিরে বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা বৃদ্ধি পায়। স্বাধীন ভারতের নতুন পরিবেশে একজন ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবে নিজেকে অপ্রাসঙ্গিক মনে করেছিলেন করবেট। যে কারণে বাড়ি বিক্রি করে বোন ম্যাগিকে নিয়ে তাঁর কেনিয়া প্রস্থান। ‘গার্নি হাউস’ সেই থেকে অনাথ, করবেট শূন্য ...!