Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

মানবিক কমিশন

এসআইআরের জন্য পূরণ করা ইনিউমারেশন বা গণনা ফর্ম সংগ্রহের কাজ প্রায় শেষ। এখন জোরকদমে চলছে ডিজিটাইজেশন পর্ব।

মানবিক কমিশন
  • ২৮ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

এসআইআরের জন্য পূরণ করা ইনিউমারেশন বা গণনা ফর্ম সংগ্রহের কাজ প্রায় শেষ। এখন জোরকদমে চলছে ডিজিটাইজেশন পর্ব। এর ভিত্তিতে তৈরি হবে খসড়া ভোটার তালিকা। শেষমেশ কত ভোটারের নাম বাদ পড়তে পারে? এই কৌতূহল এখন চরমে। ব্যাপারটাকে ভয়াবহ আতঙ্কের চেহারা দিয়েছে গেরুয়া শিবির। বঙ্গ বিজেপির নেতারা নানা সময়ে বিবিধ হুংকার শোনাচ্ছেন। কখনও বলছেন, এক কোটি নাম যাবে। সংখ্যাটি কখনও আবার হচ্ছে দেড় কোটি কিংবা দুই কোটি। তাদের টার্গেট বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গা মুসলমান। বিদেশি, মৃত, স্থানান্তরিত ও ডুপ্লিকেট নাম বাদ দেওয়া নিয়ে কোনও সচেতন ভারতবাসীর আপত্তি থাকার কথা নয়, এবং এই উদ্যোগে কেউ আপত্তি করছেও না। কিন্তু বিদেশি বিতাড়নের হুজুগের আঁচ এদেশের বৈধ নাগরিকদের উপর পড়বে না তো? কেননা, এসআইআর নিয়ে কেউই প্রস্তুত ছিল না। যাদের ভোটার লিস্টে নাম এবং ভোটার কার্ড (এপিক) আছে, যারা প্রতিবার ভোট দেয়, তারা জানে ছাব্বিশেও ভোট দেবে যথারীতি। কারণ এদেরই ভোটে কেন্দ্রে এবং রাজ্যে সরকার তৈরি হয়েছে। সেই নির্বাচিত সরকার চলছে এবং দেশগঠনের যাবতীয় সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। তাহলে ‘বৈধ’ এবং ‘অবৈধ’ নাগরিক আলাদাভাবে চিহ্নিত করার হঠাৎ কী প্রয়োজন পড়ল? এই রহস্য আম পাবলিকের কাছে সত্যিই বোধগম্য নয়। 

Advertisement

কেননা, মোদি জমানায় কমবেশি প্রত্যেকেরই ঘর পোড়া গোরুর দশা। আধার নিয়ে যে কাণ্ড একদশক যাবৎ চলেছে তার সঙ্গে তুলনীয় ঝামেলায় ভারতবাসীকে কমই পড়তে হয়েছে। এছাড়া এনআরসি নিয়ে তো অসমের বাঙালিদের জিনা হারাম হওয়ার অবস্থা। এসআরইআরের অভিজ্ঞতা বিহারবাসীরও ভালো নয়। বিহারে বহু যোগ্য ভোটারকে ‘মৃত’ কিংবা ‘রাজ্যছাড়া’ দেখানো হয়েছিল! ফলে খসড়া তালিকায় বাদ গিয়েছিল ৬৫ লক্ষ নাম। সর্বাধিক ছাঁটাই হয়েছিল সীমান্ত এলাকায়। অন্তত ৮০টি বিধানসভা ক্ষেত্রে পঞ্চাশের কম বয়সি বহু ভোটারকে ‘মৃত’ দেখানো হয়েছিল। ভাগলপুরে একটি পোলিং স্টেশনের এমন ৫৬ জন বঞ্চিত ভোটারের মধ্যে ৫০ জনেরই বয়স পঞ্চাশের নীচে। শেষমেশ শীর্ষ আদালতের হস্তক্ষেপে বেশিরভাগ ভোটারের নাম তালিকাভুক্ত করতে বাধ্য হয় ইসিআই।  শুধুমাত্র পূর্ণিয়াতেই খসড়া তালিকায় প্রায় ১ লক্ষ ৯০ হাজার নাম বাদ যায়। যদিও চূড়ান্ত তালিকায় তার থেকে ৮৩ হাজার নাম ফের ঢোকাতে হয়েছে কমিশনকে। এই ইশ্যুতে ইসিআই কতখানি চাপে পড়েছিল, খসড়া এবং চূড়ান্ত তালিকার মধ্যেকার পার্থক্যটাই তার প্রমাণ। চূড়ান্ত তালিকায় বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা এসে দাঁড়ায় ৪৭ লক্ষে। অর্থাৎ, ২১ লক্ষ ৫৩ হাজার নাম অন্তর্ভুক্ত করতে তারা বাধ্য হয়েছিল কমিশন। অন্যদিকে, এসআইআর পর্ব শেষ হওয়ার আগেই ডিটেনশন সেন্টার তৈরির প্রাথমিক কাজ শুরু করে দিয়েছে ইউপি প্রশাসন। দিনকয়েক আগেই মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ জেলায় জেলায় ডিটেনশন সেন্টার নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন। পাকড়াও করা অনুপ্রবেশকারীদের পুশব্যাকের আগে সেখানে রাখা হবে বলেই অনুমান। 
পশ্চিমবঙ্গে উঁকি দিচ্ছে এই সমগ্র বিপদটাই। আপাতত (বুধবার পর্যন্ত) যত সংখ্যক ফর্ম ডিজিটাইজড হয়েছে, তার সঙ্গে প্রায় ২৮ লক্ষ ভোটারের তথ্য ২০০২ সালের তালিকার সঙ্গে ম্যাপিং ও ম্যাচিং করানো সম্ভব হয়নি। তার মধ্যে প্রায় ৯ লক্ষ মৃত ভোটার। বাকিদের কোনও হদিশ নেই। প্রশ্ন উঠছে, তালিকা থেকে কি তাহলে ২৮ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়া একরকম নিশ্চিত? ইঙ্গিত তেমনই। প্রতিদিন রাজ্যজুড়ে গণনা ফর্ম ডিজিটাইজেশনের তথ্য সংগ্রহ করছে কমিশন। বুধবার পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে ৭৮.৪২ শতাংশ ফর্ম ডিজিটাইজেশনের কাজ শেষ হয়েছে। জেলাগুলির তথ্য বলছে, এযাবৎ প্রায় ৯ লক্ষ মৃত ভোটারের হদিশ মিলেছে। বাকি ১৯ লক্ষ ডুপ্লিকেট, শিফটেড কিংবা অ্যাবসেন্ট। ফলে আপাতত খসড়া তালিকা থেকে ২৮ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়ছে। আগামী দিনে ছবিটা আরও স্পষ্ট হবে। খসড়া তালিকা প্রকাশ পাবে ৯ ডিসেম্বর। তৃণমূল এবং কংগ্রেসের পক্ষে দায়ের হওয়া মামলার শুনানিরও এই তারিখ ধার্য করেছে সুপ্রিম কোর্ট। এই দুই বিরোধী দলের বক্তব্য, এসআইআর ত্রুটিমুক্ত নয়। তাই বহু বৈধ নাগরিককে নানা অজুহাতে ভোগান্তিতে ফেলা হতে পারে। নাগরিকদের সঙ্গে এই অন্যায় তারা কোনোমতেই মেনে নেবে না। ইসিআইয়ের এক্তিয়ার এবং কর্তব্যের দিকটি মাথায় রেখেও শীর্ষ আদালত আশ্বস্ত করেছে, নাগরিকদের অধিকার রক্ষার পক্ষেই তারা। প্রয়োজনে খসড়া তালিকা প্রকাশের দিন পিছিয়ে দেবে সুপ্রিম কোর্ট। গণতান্ত্রিক দেশে আইনি লড়াইয়ের পথ সবসময়ই খোলা। কিন্তু সমস্ত প্রয়োজনে আদালতের দ্বারস্থ হতে হবে কেন? আইনি সাহায্য গ্রহণের অবকাশ এবং সামর্থ্য সকলের থাকে না। কমিশন যেন সাধারণ মানুষকে আদালতে ছুটতে বাধ্য না করে। এসআইআর সম্পন্ন হোক সম্পূর্ণ মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ