Bartaman Logo
২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

শাহজাদ ভাট্টির নেটওয়ার্ক কতটা আতঙ্কের?

১৬ মার্চ ২০২৫। ভোর তখন প্রায় চারটে। জলন্ধর তখনও ঘুমিয়ে। শহরের অধিকাংশ আলো নিভে গিয়েছে

শাহজাদ ভাট্টির নেটওয়ার্ক কতটা আতঙ্কের?
  • ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

মৃণালকান্তি দাস: ১৬ মার্চ ২০২৫। ভোর তখন প্রায় চারটে। জলন্ধর তখনও ঘুমিয়ে। শহরের অধিকাংশ আলো নিভে গিয়েছে। রাস্তা ফাঁকা। চারপাশে নিস্তব্ধতা। হঠাৎ সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে বিস্ফোরণ!

Advertisement

জলন্ধরের ইউটিউবার ও ইনফ্লুয়েন্সার নভদীপ সিং সান্ধুর বাড়ির বারান্দায় ছোড়া হয়েছিল একটি গ্রেনেডের মতো বস্তু। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই 
একটি সাধারণ বাড়ি পরিণত হয় তদন্তের কেন্দ্রে। প্রথমে ঘটনাটি হয়তো স্থানীয় অপরাধ বলেই মনে হতে পারত। কিন্তু তদন্ত যত এগলো, গল্প তত বদলাতে শুরু করল।
পুলিশের জালে ধরা পড়ল স্থানীয় এক যুবক— হার্দিক কাম্বোজ। জেরায় উঠে এল পাকিস্তানের গ্যাংস্টার শাহজাদ ভাট্টির নাম। ভাট্টি নিজেই ওই হামলার দায় স্বীকার করেছিল বলে তদন্তকারীদের দাবি। পরে মামলাটি পৌঁছায় জাতীয় তদন্ত সংস্থা বা এনআইএ-র হাতে। কিন্তু সেটিই কি ছিল গল্পের শুরু? নাকি তারও আগে অদৃশ্যভাবে তৈরি হয়ে গিয়েছিল এমন একটি নেটওয়ার্ক, যার সদস্যরা একে অপরকে হয়তো কখনো চোখেই দেখেনি?
একসময় ভারতের আন্ডারওয়ার্ল্ডের গল্প মানেই ছিল সীমান্তের ওপার থেকে নিয়ন্ত্রিত অপরাধজগৎ। দাউদ ইব্রাহিমের মতো অপরাধ সাম্রাজ্যের ক্ষেত্রে ছিল নিজস্ব লোকবল, অর্থের প্রবাহ, চোরাচালান, হাওলা, ভয় এবং রাস্তায় গুলির লড়াই। শাহজাদ ভাট্টিকে ঘিরে ভারতীয় তদন্তকারীদের যে ছবি সামনে এসেছে, সেটি সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে নেটওয়ার্কের একটি বড়ো অংশ নাকি রাস্তায় নয়— স্ক্রিনের ওপারে। সোশ্যাল মিডিয়া। একটি প্রোফাইল। একটি মেসেজ। তারপর আরেকটি যোগাযোগ।
তদন্তকারীদের অভিযোগ, এভাবেই তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করা হত। ধীরে ধীরে তাদের অপরাধমূলক বা হিংসাত্মক কাজকর্মের দিকে টেনে নেওয়া হত। অর্থাৎ নিয়োগের জায়গা হয়ে উঠেছিল এমন একটি জগৎ, যেখানে প্রথম সাক্ষাৎ হয়তো হয়েছিল সামনাসামনি নয়, একটি মোবাইল স্ক্রিনে। এনআইএ ও দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেলের সূত্রে যে তথ্য সামনে এসেছে, তাতে শাহজাদ ভাট্টি এই নেটওয়ার্কের অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র। তদন্তকারীদের অভিযোগ, পাকিস্তান ও বালুচিস্তানের তিন গ্যাংস্টার তাঁর সঙ্গে কাজ করত। শানি টাইগার, জাফর সুপারি এবং ফারুক খোখর— তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র সরবরাহ, নিয়োগ এবং নেটওয়ার্কের বিভিন্ন অংশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার মতো অভিযোগ উঠে এসেছে। আর তাদের নীচে?
আরও একটি স্তর। আর তার নীচে? আরও কয়েকজন। কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায় নজর রাখে। কেউ নতুন লোক খোঁজে। কেউ অস্ত্রের ব্যবস্থা করে। কেউ স্থানীয় যোগাযোগ সামলায়। তদন্তকারীদের দাবি, নেটওয়ার্কটির বিস্তার এতটাই টুকরো টুকরো যে, একজন সদস্য গোটা কাঠামোর নাগালই পায় না। প্রত্যেকে জানে শুধু তার নিজের অংশটুকু। পাকিস্তান ও বালুচিস্তানে তাঁর তিন প্রধান সহযোগীর পাশাপাশি, ভারতের মাটিতে নেটওয়ার্কের বিভিন্ন কাজ সামলানোর জন্য ছিল আরও ১৫ জনের একটি দল। তাদের কেউ নিয়োগ করত। কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায় তরুণদের খুঁজত। কেউ অস্ত্রের জোগানদার হিসাবে কাজ করত। আবার কেউ নজর রাখত নিয়োগ করা ব্যক্তিদের উপর। প্রত্যেকের ভূমিকা ছিল আলাদা, কিন্তু সুতো গিয়ে মিলত একই জায়গায়। একটি ছোট্ট চক্র। কিন্তু সেই চক্র ঘুরছে কোনো অদৃশ্য যন্ত্রে। টার্গেট বড়ো বিস্ফোরণ নয়— ভয় ছড়িয়ে দেওয়া? তদন্তকারীদের মতে, পরিকল্পনার লক্ষ্য সবসময় বড়ো কোনো হামলা নয়। বরং ছোটো ছোটো হামলা, ভয় সৃষ্টি, নজরদারি এবং আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা— এই ধারাবাহিক কাজকর্মই নেটওয়ার্কের কৌশল বলে অভিযোগ।
একটি বিস্ফোরণ। একটি হামলা। তারপর অদৃশ্য হয়ে যাওয়া। কিছুদিন নীরবতা। তারপর অন্য কোথাও আবার একটি ঘটনা। এই প্যাটার্নই তদন্তকারীদের সন্দেহ বাড়ায়। কারণ বিচ্ছিন্ন কয়েকটি অপরাধ যখন একই ধরনের যোগাযোগ, একই ধরনের সীমান্তপারের যোগসূত্র এবং একই ধরনের নিয়োগপদ্ধতির সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করে, তখন সেগুলি আর বিচ্ছিন্ন থাকে না। তখন তৈরি হয় একটি নেটওয়ার্কের ছবি। তদন্তে শাহজাদ ভাট্টির হাত রয়েছে এমন একাধিক ঘটনা উঠে এসেছে— জলন্ধরে ইউটিউবারের বাড়িতে হামলা। হরিয়ানার সিরসায় মহিলা পুলিশ স্টেশনে বিস্ফোরণ। আম্বালায় গাড়ি বিস্ফোরণের ঘটনা। প্রতিটি ঘটনা আলাদা জায়গায়। আলাদা সময়। আলাদা স্থানীয় চরিত্র। কিন্তু তদন্তকারীদের দাবি, তিনটির পিছনে একই ধরনের ছায়া— পাকিস্তানভিত্তিক হ্যান্ডলার, সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে যোগাযোগ, স্থানীয় নিয়োগ এবং লক্ষ্যবস্তুর উপর নজরদারি। 
তদন্তকারীদের বর্ণনা অনুযায়ী, সোশ্যাল মিডিয়ায় একজন তরুণ কোনো অস্ত্রের ছবি বা পোস্ট দেখল। কৌতূহল থেকে যোগাযোগ করল। তারপর কথোপকথন সরল অন্য প্ল্যাটফর্মে। প্রথমে সাধারণ কথা। তারপর টাকা। তারপর ছোটোখাটো কাজ। এবং শেষ পর্যন্ত আরও গুরুতর দায়িত্ব। তদন্তকারীদের অভিযোগ, এই ধাপে ধাপে সম্পর্ক তৈরির প্রক্রিয়াই ছিল নেটওয়ার্কের শক্তি। কারণ, কাউকে প্রথম দিনেই ভয়ঙ্কর কোনো কাজে পাঠানো হয় না। প্রথমে তৈরি করা হয় যোগাযোগ। তারপর বিশ্বাস। তারপর নির্ভরতা। আর শেষ পর্যন্ত—নির্দেশ। কিন্তু শুধু মানুষ নিয়োগ করলেই তো নেটওয়ার্ক তৈরি হয় না। টার্গেট সম্পর্কে তথ্য দরকার। কোথায় পুলিশ? কোথায় নিরাপত্তা? কোন জায়গায় কখন লোকজন থাকে? কোথায় নজরদারি ব্যবস্থা আছে? স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অভিযোগ, ভাট্টি নেটওয়ার্ক স্থানীয় সহযোগীদের ব্যবহার করে পুলিশ, প্রতিরক্ষা ও ধর্মীয় জায়গায় নজরদারি চালাত এবং সিসিটিভি বসানোর মতো কাজ করাত। এই কাজের জন্য দুই থেকে ১০ হাজার টাকা দেওয়া হত। আগস্টের অভিযানে তদন্তকারীরা এমন সিসিটিভি-ও উদ্ধার করার কথা জানিয়েছে, যেগুলি নজরদারির সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ হামলার আগেই সেখানে পৌঁছে যেত আরেকটি অদৃশ্য দল। তারা অস্ত্র বহন করত না। তাদের কাজ ছিল দেখা। রেকি করা। সব খবর পৌঁছে যেত সীমান্তের ওপারে।
২০২৬ সালের ১২ আগস্ট। স্বাধীনতা দিবসের মাত্র কয়েক দিন আগে। একই সময়ে দেশের ১৪টি রাজ্যে অভিযান শুরু হল। কেন্দ্রীয় সংস্থা এবং রাজ্য পুলিশের মধ্যে রিয়েল-টাইম তথ্য আদানপ্রদানের ভিত্তিতে চালানো হয় অভিযানটি। উত্তরপ্রদেশ। হরিয়ানা। দিল্লি। পাঞ্জাব। রাজস্থান। মহারাষ্ট্র। আরও কয়েকটি রাজ্য। একটির পর একটি দরজা খুলতে লাগল। একটির পর একটি নাম উঠে আসতে লাগল। সরকারি হিসাবে ১৪টি রাজ্যে ২৫৩ জনকে আটক করা হল এবং ভাট্টি নেটওয়ার্ক-সংক্রান্ত ৮০টির বেশি এফআইআর হল। বিভিন্ন অভিযানে আইইডি, পাকিস্তান অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরি-র চিহ্নযুক্ত গ্রেনেড, পিস্তল, কার্তুজ এবং নজরদারি-সংশ্লিষ্ট সিসিটিভি উদ্ধার হল। এক রাতের অভিযানে যেন কয়েক বছরের অন্ধকার নেটওয়ার্কের উপর হঠাৎ আলো পড়ে গেল।
দেশের ভিতরে একের পর এক গ্রেফতার। অস্ত্র উদ্ধার। ডিজিটাল যোগাযোগের সূত্র। ২৫৩ জন আটক। কিন্তু যার নাম বারবার উঠে আসছে? শাহজাদ ভাট্টি। তদন্তকারীদের দাবি, তিনি ভারতের বাইরে। তদন্তে এনআইএ তাঁকে ব্রাজিলে গা ঢাকা দিয়ে থাকার কথা জানিয়েছে। সেখান থেকেই আবার উঠে আসে সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি— একজন মানুষ যদি দেশের মাটিতেই না থাকে, তাহলে তাঁর নেটওয়ার্ককে কতটা ভাঙা সম্ভব? একটি ঘরে বসে থাকা একজন তরুণকে গ্রেফতার করা যায়। একটি অস্ত্র উদ্ধার করা যায়। একটি গাড়ি বাজেয়াপ্ত করা যায়। একটি ফোন ফরেনসিক পরীক্ষায় পাঠানো যায়। কিন্তু একটি সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট? একটি এনক্রিপ্টেড চ্যাট? একটি ভুয়ো পরিচয়? একটি নতুন অ্যাকাউন্ট? সেগুলি বারবার ফিরে আসতে পারে। তদন্তকারীদের দাবি, ভাট্টির কিছু সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট ভারতে সীমিত বা বন্ধ করা হলেও নতুন পরিচয়ে অনলাইন উপস্থিতি বজায় রাখার চেষ্টা হয়েছে। ২০২৫ সালের জলন্ধর হামলার পর তাঁর একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট ভারতে নিষিদ্ধ করার কথাও পুলিশ জানিয়েছিল। অর্থাৎ একটি অ্যাকাউন্ট বন্ধ হলেই গল্প শেষ নয়। হতে পারে নতুন নাম। নতুন ছবি। নতুন নম্বর। নতুন একটি চ্যাট। এবং আবার— একজন নতুন তরুণ।
আগস্টের অভিযানের এক মাস পর আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয় কেন্দ্র। ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক শাহজাদ ভাট্টি নেটওয়ার্ককে ইউএপিএ-র অধীনে সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসাবে ঘোষণা করে। মন্ত্রকের অভিযোগ, নেটওয়ার্কটি সীমান্তপথে অস্ত্র, বিস্ফোরক ও মাদক পাচার, তরুণদের উগ্রপন্থায় যুক্ত করা এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসবাদী কাজকর্মে জড়িত ছিল।
এর ফলে তদন্তের চরিত্রও বদলে গেল। এখন এটি আর শুধু কয়েকটি বিচ্ছিন্ন হামলা বা কয়েকজন গ্যাংস্টারের বিরুদ্ধে মামলা নয়। সরকারি বয়ানে এটি একটি সংগঠিত সন্ত্রাসবাদী নেটওয়ার্ক। একটি সীমান্তপারের নেটওয়ার্ক। একটি এমন কাঠামো, যার একটি প্রান্ত পাকিস্তানে, অন্য প্রান্ত ভারতের বিভিন্ন শহরে— আর তদন্তকারীদের দাবি অনুযায়ী, তার ডিজিটাল ছায়া আরও দূরে পৌঁছে যেতে পারে।
কিন্তু গোয়েন্দা তদন্তের ইতিহাসে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি এখনও রয়ে যায়— নেটওয়ার্ক ভাঙা আর নেটওয়ার্কের ধারণাকে ভাঙা— দুটো কি একই জিনিস? কারণ একজন হ্যান্ডলার ধরা না পড়লেও তার জায়গায় অন্য কেউ আসতে পারে। একটি অ্যাকাউন্ট বন্ধ হলেও অন্য অ্যাকাউন্ট খুলতে পারে। একজন রিক্রুট গ্রেফতার হলেও অন্য একজন হয়তো তখনই কোনো স্ক্রিনের সামনে বসে আছে। আর সেই স্ক্রিনে হয়তো ভেসে উঠেছে একটি নতুন মেসেজ— ‘কাজ আছে।’ এই জায়গাতেই শাহজাদ ভাট্টি-কাণ্ডের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়।
কারণ বন্দুকের নল দেখা যায়। বোমার শব্দ শোনা যায়। কিন্তু একটি নেটওয়ার্কের সবচেয়ে বিপজ্জনক অংশটি কখনো কখনো থাকে সম্পূর্ণ নীরবতায়— একটি মোবাইল স্ক্রিনের ওপারে। আর সেই স্ক্রিনের ওপারে কে বসে আছে, সেটিই এখন তদন্তকারীদের সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ