Bartaman Logo
৪ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

কতটা ক্ষমতা থাকলে তবে ক্ষমা করা যায়

শ্রদ্ধেয় মোদিজি, দেশবাসী হিসাবে আরও একবার আমাদের আপনি গর্বিত করলেন। ‘ঝোলা কাঁধে বেরিয়ে পড়া’ ফকির থেকে ইনস্টাগ্রামের রিল মাস্টার... এই ট্রান্সফর্মেশন ভাবাই যায় না!

কতটা ক্ষমতা থাকলে তবে ক্ষমা করা যায়
  • ৪ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: শ্রদ্ধেয় মোদিজি, দেশবাসী হিসাবে আরও একবার আমাদের আপনি গর্বিত করলেন। ‘ঝোলা কাঁধে বেরিয়ে পড়া’ ফকির থেকে ইনস্টাগ্রামের রিল মাস্টার... এই ট্রান্সফর্মেশন ভাবাই যায় না! সেলফি মোডে ক্যামেরা রাখছেন, রিল বানাচ্ছেন, আর সঙ্গে সঙ্গে তার ভিউয়ার ৩০০ মিলিয়ন! ভাবা যায় না। আপনি বলেই সম্ভব। আপনি নিজেই এফআইআর করাচ্ছেন, নিজেই আবার ‘বখে যাওয়া’ ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের ক্ষমা করে দিচ্ছেন। বোঝাচ্ছেন, ক্ষমাই পরম ধর্ম। পুলিশ কেস দিচ্ছে, থানায় তুলে আনছে, বিজেপির স্থানীয় নেতারা থ্রেট করছে... এগুলো কিন্তু আলাদা ব্যাপার। এগুলোর সঙ্গে আপনার মহান উদ্যোগকে গুলোলে চলবে না। আপনি তো আর এসব করতে বলেননি! ওরা ওদের মতো করুক। আপনি তো ক্ষমা করেছেন! ব্যস, এতেই হবে। ওদের জীবন ধন্য হয়ে গেল। যেন ফাঁসির আসামি গলায় দড়ি পরার আগে জীবনদান পেল। মোদি হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়। সত্যি! এত মহানুভবতা! কিন্তু একটা কথা বলুন স্যার, কেন করলেন ক্ষমা? আপনার ক্ষমা পাওয়ার যোগ্যতা কি এদের আছে? দেখছেন তো, এরাই এখন আবার উলটো কথা বলছে... বক্তব্য হল, আপনার জেন জিকে ক্ষমা করার কী যোগ্যতা আছে? ভাবুন একবার! কেমন ধৃষ্টতা! এই প্রজন্মের তো কোনো শিক্ষাই নেই। সংস্কারই নেই। এরা কি না আপনার নামে খারাপ কথা বলছে! গালি দিচ্ছে! ইস্তফা চাইছে! নরেন্দ্র মোদির নামে? কোথা থেকে আসে এই সাহস? উপরন্তু প্রশাসন রাগ দেখালে পালটা খিল্লি করছে। আপনি কিন্তু ক্ষমা না করলেই পারতেন। এরা বোঝে না, আপনারা আসলে এসব শুনে অভ্যস্ত নন! এরা কিছুতেই মানতে চায় না... আপনারা শুধু বলবেন। লাগাতার। বারবার। বিরোধীদের নিয়ে। বিরোধী নেত্রীদের নিয়ে। দেশের মেয়েদের নিয়ে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীদের নিয়ে। কিন্তু আপনাদের নামে কিছু বলা যাবে না। বিশেষ করে আপনার নামে। ওটা মহাপাপ। এই পাপের শাস্তিই দরকার। ছোটোবেলায় বাবা-মায়েরা যেমন উত্তম-মধ্যম দেয় সন্তানদের। কেন দেয়? শেখানোর জন্য। আপনিও তো এই প্রজন্মের সঙ্গে সেটাই করছেন... তাই না? কী সুন্দর ক্লাস নেন আপনি। পরীক্ষা পে চর্চা, মন কি বাত... এই ছেলেমেয়েরা মন দিয়ে শুনলে কত কী যে শিখত! এরা জানতেই পারল না। যারা শোনে, তারাও রসিকতা করে। আপনি কত সুন্দর (a+b)2 –এর ফরমুলা শেখান, এরা ধরতে তো পারেই না। উপরন্তু আপনার নামে আজেবাজে কথা বলে। এত সাহস? 

Advertisement

আপনারা ক্ষমা প্রার্থনা করেন না। সেটাই আপনাদের অধিকার। কিন্তু তা বলে এরাও ক্ষমা চাইবে না? ফলো করবে আপনাদের? তবে একটি ১৫ বছরের মেয়ে ক্ষমা চেয়েছে। এ ব্যতিক্রম... বলুন? আতঙ্কিত বাবা-মায়ের চাপে ক্ষমা চাইল, নাকি কেরিয়ার বা জীবন নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়ে, না উপরওয়ালার হুমকিতে... সে সব দেখতে হবে না। ক্ষমা তো চেয়েছে! এটাই বড়ো কথা। আপনার লোকজন এটা নিয়ে দারুণভাবে প্রচার চালাচ্ছে। বলছে, ‘এই দেখো, জেন জি নতজানু হয়েছে।’ কিন্তু... আপনার কাছে একটা অনুরোধ, আরও একটু ভালোভাবে প্রচারটা চালাতে বলুন। এতে কাজ হচ্ছে না। উলটে বাচ্চাগুলো আপনাদের উপর খেপে যাচ্ছে। বলছে, ‘এভাবে আজ চুপ করাতে চাইছ! কতদিন? সময় আসবে, তখন ঠিক বুঝে নেব।’ তাই বলছি, দলের কারিওকর্তাদের বলুন, ভালো কিছু শেখাতে। আপনাদের থেকে নতুন প্রজন্ম শিখুক... কীভাবে প্রতিশ্রুতি দিতে হয়, কীভাবে এবং কখন বুলডোজার ব্যবহার করতে হয়, নীতির দৈন্য ফাঁস হয়ে গেলে কীভাবে অবাস্তব যুক্তি দেখাতে হয়। এছাড়া নির্দিষ্ট বন্ধুদের পাইয়ে দেওয়া, ধর্মের নামে বিভাজন... এসব তো আছেই। এগুলো কিচ্ছু শিখছে না এই প্রজন্ম। শুধু গালিটাই শিখল? এর একটা বিহিত দরকার ছিল। কিন্তু আপনি ক্ষমা করে দিলেন! আপনি এদের বন্ধু বানালেন, ‘ফ্রান্ডস’ বললেন। এরা গুরুত্বই দিল না! বুঝল না, আপনার বন্ধু-বান্ধবী সবাই হতে পারে না! বেস্ট ফ্রেন্ড হবে ‘ডোলান্ড’-এর মতো। আর বান্ধবী ‘মেলোডি’। সেই নিরিখে কোথায় এই ছেলেমেয়েরা? কত আলোকবর্ষ দূরে! অথচ, এদের আপনি সেই সুযোগটাই দিতে চেয়েছিলেন। তারপরও এরা দুষ্টুমি করে যাচ্ছে! একে দুঃসাহস বলব না? তাও বলতেই হয়, আপনি মহান। ক্ষমা করে দিয়েছেন। আপনার যোগ্যতার ধারেকাছে পৌঁছাতে পারবে এরা? ভুলে গিয়েছে, কত আসন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন আপনি? পরপর দু’বার। গত লোকসভা ভোটে একটু সমস্যা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ম্যানেজ করে নিয়েছেন। পরের নির্বাচনে এইসব আসনগত সমস্যা যাতে না হয়, তার জন্য এখন থেকেই কোমর বেঁধে ভাঙাগড়ার খেলায় নেমে পড়েছেন। এই দূরদর্শিতা, এই ক্ষুরধার রাজনৈতিক বুদ্ধি এরা বুঝবে? এই প্রজন্ম তো নেহাত পোলাপান। এরা শেখেইনি, কুকথা কীভাবে বলতে হয়। কতটা কনভিকশন নিয়ে... পায়ের জমি কতটা শক্ত করে। আপনিও তো সোনিয়া গান্ধীকে জার্সি গোরু বলেছিলেন। রাহুল গান্ধীর জন্য আপনার বাছাই করা মন্তব্য ছিল, বিদেশি বউয়ের থেকে জন্ম নেওয়া সন্তান দেশভক্ত হয় না। ‘হাইব্রিড সন্তান’। কেউ কিছু করতে পেরেছে আপনার? পুলিশ তেড়েফুঁড়ে উঠেছে? কিচ্ছু না। এটাই তো পায়ের তলার জমি। এটাই কনভিকশন। শশী থারুরকে কটাক্ষ করে বলেছিলেন, ‘ওঁর তো ৫০ কোটির গার্লফ্রেন্ড।’ কী সুন্দর এক মহিলার রেট ঠিক করে দিয়েছিলেন। শশী থারুর তাঁর শিক্ষার মর্যাদা এবং সীমা রেখে জবাব দিয়েছিলেন ঠিকই। কিন্তু কোনো অভিযোগ হয়নি। কেউ কাউকে ক্ষমাও চাইতে বলেনি। আপনিই বোধহয় তখন ক্ষমা করে দিয়েছিলেন এই সবাইকে। সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী বা শশী থারুর। আপনার দলের সাংসদ রমেশ বিধুরি লোকসভায় দাঁড়িয়ে বহুজন সমাজ পার্টির এমপি দানিশ আলিকে ‘মুসলিম সন্ত্রাসবাদী’ বলেছিলেন। আপনি তো তাঁকেও ক্ষমা করেছেন। সাংসদ পদ যায়নি তাঁর। এত ছোটোখাটো বিষয়ে গুরুদণ্ড দেয় নাকি কেউ? গুরুতর অপরাধ তো করেছে এই ছেলেমেয়েগুলো। আপনার নামে মিম ছেড়েছে। আজেবাজে স্লোগান লিখেছে। এগুলোই অপরাধ। আমাদের দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে নিয়ে করুক! তাঁকে নিয়ে তো বিজেপির আইটি সেল এবং অন্ধভক্তরা মিমের পাহাড় বানিয়ে ফেলেছেন। নেহরুজির চরিত্র নিয়ে যাচ্ছেতাই ভাষায় আক্রমণ চলে। তাঁকে ছেড়ে এরা যে কেন আপনাকে নিয়ে পড়ল, বোধগম্য হচ্ছে না। নেহরুজিকে নিয়ে মিম বানালে এফআইআর হয় না। থানায় ডেকে রগড়েও দেয় না। তা সত্ত্বেও জেন জি’র ছেলেমেয়েরা আপনাকে নিয়ে পড়ে রয়েছে। তবে হ্যাঁ, এতকিছুর পরও আপনি বলেই ক্ষমা করেছেন। সত্যিই শেখার আছে আপনার থেকে। 
আপনি জানেন নিশ্চয়ই, সোশ্যাল মিডিয়ায় বহু ব্লগার এবং ইনফ্লুয়েন্সার সারাক্ষণ নরেন্দ্র মোদির নামে সমালোচনা করে রিচ বাড়িয়ে চলেছেন। জানবেন তো বটেই। আপনার পদটাই এমন। কানে ঠিক খবর চলে আসে। তা সত্ত্বেও আপনি এঁদের ক্ষমা করে চলেছেন। আপনার সমর্থকরা অবশ্য লাগাতার তাঁদের থ্রেট দিয়ে থাকে। পুরুষ হলে ডেথ থ্রেট, আর মহিলা হলে রেপ থ্রেট। মা-বোন তুলে অশ্রাব্য গালি দেয়। সেটা তো দেওয়াই উচিত? তাই না? তারাই তো রাষ্ট্রবাদী। আপনার বিরুদ্ধে, সরকারি নীতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার মতো ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’র মোকাবিলা করে তারা। আপনার প্রসঙ্গ এসে গেলে তারা অবুঝও। এই অন্ধভক্তদের জন্য তাই মেটা প্রধানকে কড়কে দেওয়া হয় না। এফআইআর হয় না। নিন্দাও নয়। এটাই দরকার। তবে না শিক্ষা পাবে ‘বখে যাওয়া সমাজ’! এইসব উসকানিমূলক পোস্ট বা গালি দেওয়া পোস্ট ডিলিট করার জন্য ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম কর্তৃপক্ষকে একদম বলবেন না। এই পোস্টগুলো থাকুক। তবে না বিরুদ্ধবাদীরা ভয় পাবে! তবে হ্যাঁ, কারা ভয় পাচ্ছে না, সেটাও লক্ষ্য রাখতে বলবেন লোকজনকে। আরশোলা, ছারপোকাদের পাত্তা দেওয়ার দরকার নেই। বরং ভয় দেখাতে হবে। মুশকিল হল, চারদিকে যা নজরে আসছে... ভয় না পাওয়া আরশোলাদের সংখ্যাই বেশি। এরা আবার সবাই যে আরশোলা ব্যানারে রয়েছে, সেটাও নয়। ছাত্র, যুব, বিচক্ষণ, বিবেচক... এইসব তাদের ট্যাগলাইন। সোজা কথায় বিরোধী। আপনার বিরোধী। আর তার মানেই রাষ্ট্রবিরোধী। আমরা জানি, এই সবকিছুর পরও আপনি ক্ষমা করবেন। এটাই আপনার মহানুভবতা। কিন্তু হাত-পা ভেঙে যাওয়া, চোখ নষ্ট হওয়া ছেলেমেয়েগুলোর জন্য কেউ ক্ষমা চাইবে না। থানায় তুলে নিয়ে যাওয়া নাবালকটিকে কেউ ছাড়িয়ে আনবে না... বলবে না যে, ভয় পেয়ো না। এটা গণতন্ত্র। কোনো কিশোরীর কেরিয়ার বরবাদ হয়ে গেলেও কেউ পাশে দাঁড়াবে না। কারণ, এরাই যে আজ প্রশ্ন তুলছে... আপনি মশাই ক্ষমা করার কে?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ