Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

আমেরিকা পাকিস্তানের গলাগলি আর কতদিন?

প্রথমে ইরানের চাবাহার বন্দর ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। তারপর সবাইকে চমকে দিয়ে ১০ বছরের প্রতিরক্ষা চুক্তি। হঠাৎ করেই যেন ভারতের উপর অতিরিক্ত সদয় আমেরিকা!

আমেরিকা পাকিস্তানের গলাগলি আর কতদিন?
  • ৬ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

মৃণালকান্তি দাস: প্রথমে ইরানের চাবাহার বন্দর ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। তারপর সবাইকে চমকে দিয়ে ১০ বছরের প্রতিরক্ষা চুক্তি। হঠাৎ করেই যেন ভারতের উপর অতিরিক্ত সদয় আমেরিকা!

Advertisement

মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব (নতুন পদমর্যাদা অনুযায়ী ‘যুদ্ধসচিব’) পিট হেগসেথের দাবি, আগামী এক দশকে প্রতিরক্ষা খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে ওই রূপরেখা চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে। ওই চুক্তি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও প্রতিরোধমূলক সক্ষমতার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এতে দুই দেশের মধ্যে সমন্বয়, তথ্য বিনিময় ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা আরও জোরদার হবে। পরে এক্স হ্যান্ডলে পিট লেখেন, ‘দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এর আগে কখনও এতটা মজবুত ছিল না।’ তাহলে কি নয়াদিল্লির সঙ্গে যাবতীয় ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে ফেলতে চাইছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প? কিন্তু আমেরিকার কূটনীতিতে হঠাৎ এই বাঁকবদল কেন? এর থেকেও জটিল প্রশ্ন, পাকিস্তানের কাছে আমেরিকা কী চায়?
বিশ্লেষকদের দাবি, চীনের উপর চাপ তৈরি করতে চাবাহারের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে ফের ভারতকে কাছে টানার চেষ্টা করছেন ট্রাম্প। ওয়াশিংটন জানে, মার্কিন চাপে দক্ষিণ ইরানের বন্দর থেকে নয়াদিল্লি সরে গেলে আরব সাগরীয় এলাকায় বেজিংয়ের প্রভাব বৃদ্ধি পাবে। কারণ, দক্ষিণ-পশ্চিম বালুচিস্তানের গদর বন্দরটি চীনকে দিয়ে রেখেছে পাকিস্তান। গদর বন্দরের কাছেই চাবাহারের অবস্থান হওয়ায় সেখান থেকে চীনের উপর নজরদারির যথেষ্ট সুবিধা রয়েছে। একইসঙ্গে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকাতেও দিল্লিকে সঙ্গে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই চীনের প্রভাব হ্রাস করার চেষ্টায় রয়েছে আমেরিকা। ফলে বোঝাই যায়, পাকিস্তান এখনও আমেরিকার ‘বিশ্বস্ত’ হয়ে উঠতে পারেনি।
তাছাড়া, এই ডিসেম্বরে ভারত সফরে আসছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। মোদির সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতে একাধিক সামরিক এবং জ্বালানি সুরক্ষা (এনার্জি সিকিউরিটি) সংক্রান্ত চুক্তি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। ভারত-মার্কিন সম্পর্কের টানাপোড়েনের জন্যই মস্কোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা আরও মজবুত করেছে নয়াদিল্লি। এর জন্য প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এই পরিস্থিতি ভারতের মন জয়ের চেষ্টাকে ট্রাম্পের কূটনৈতিক চাল হিসেবেই দেখছে আন্তর্জাতিক মহল।
তবে পাকিস্তানও বসে নেই। ভূরাজনীতির হাওয়া নিজেদের হাতের মুঠোয় আনার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। সম্প্রতি পাকিস্তান সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষাচুক্তি স্বাক্ষর করেছে। একই সময়ে ইসলামাবাদ নীরবে বিরল মৃত্তিকা খনিজের নমুনা আমেরিকায় পাঠিয়েছে এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে আরও বড়ো ধরনের রপ্তানি চুক্তির পথ খুঁজছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বশ করতে বিরল খনিজের ঘুষ! আর ইজরায়েলি আগ্রাসনের ভয় দেখিয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে ন্যাটো ধাঁচের প্রতিরক্ষা চুক্তি সেরে ফেলা। একের পর এক কূটনৈতিক চালে ঘনিষ্ঠ ‘বন্ধু’দের থেকে ভারতকে আলাদা করে ফেলার চেষ্টা চালাচ্ছে পাকিস্তানও।
ইউনিভার্সিটি অব হার্টফোর্ডশায়ারের অ্যাকাডেমিক এরিক শাহজার বলছেন, এসবই অস্থির অঞ্চলে পরিবর্তনশীল সমীকরণের ফল। এখানে চোখজুড়ানো ছবির আড়ালে কিছু কঠিন বাস্তবতাও রয়েছে। পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক তৎপরতার প্রথম কারণ, আফগানিস্তান থেকে আমেরিকার চলে আসা। আফগানিস্তান থেকে ওয়াশিংটনের আকস্মিক প্রস্থান এমন এক শূন্যতা রেখে গিয়েছে, যা পূরণে এখনও আমেরিকা হিমশিম খাচ্ছে। শত্রু ইরান ও প্রভাবশালী তালিবানকে সামনে রেখে আমেরিকার ওই অঞ্চলে একটি পালটা ভারসাম্য দরকার। ভৌগোলিক অবস্থান, গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক ও আফগান রাজনীতির পুরানো জটের কারণে আমেরিকার কাছে পাকিস্তান আবার হঠাৎ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তালিবানের সঙ্গে চুক্তি করেই আমেরিকা আফগানিস্তান থেকে সেনা সরিয়ে এনেছিল। সেই চুক্তির পাঁচ বছর পর ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন তালিবানকে বাগরাম বিমানঘাঁটি আমেরিকার কাছে ফিরিয়ে দিতে বলেছেন। এই অঞ্চলে আমেরিকা তার প্রভাব ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। যদি আমেরিকা বাগরাম ফিরে পাওয়ার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়, তাহলে পাকিস্তানই এই অঞ্চলে আমেরিকার জন্য সবচেয়ে সম্ভাব্য বিকল্প হয়ে উঠবে। কারণ, একমাত্র পাকিস্তানই হল সেই রাষ্ট্র, যার হাতে একইসঙ্গে আঞ্চলিক লজিস্টিক–সুবিধা ও রাজনৈতিক সংযোগ রয়েছে। এর মাধ্যমে ওয়াশিংটন এই অঞ্চলে তার উপস্থিতি ধরে রাখতে পারে। ফলে পাকিস্তানকেও হাতের মুঠোয় রাখতে চাইছে ওয়াশিংটন।
দ্বিতীয় বিষয়, আমেরিকা-ভারত সম্পর্কের অস্বস্তি। গত দশকে ওয়াশিংটন দিল্লিকে তার ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের গভীরে টেনে নিয়েছে এবং বিশ্ব মঞ্চে ভারতের অবস্থান শক্ত করেছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমেরিকা-ভারত টানাপোড়েন বেড়েছে। দুই দেশের ভিসা ও শুল্কসংক্রান্ত বিরোধ রয়ে গিয়েছে। মস্কোর সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতা ওয়াশিংটনকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। গত আগস্টে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বেজিং সফর যে স্পষ্ট সংকেত দিয়েছে, তা হল, ভারত চাইলে চীনের সঙ্গেও ভারসাম্য রক্ষার খেলা খেলতে পারে। তাছাড়া, অর্থনৈতিক দিক থেকে মোদির ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগ আমেরিকার উৎপাদন ক্ষেত্রকে দুর্বল করে দিতে পারে। যেহেতু ট্রাম্প এশিয়ায় প্রভাবের ভারসাম্য ধরে রাখতে চান এবং বেজিংয়ের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতার পালটা ভারসাম্য দাঁড় করানো দরকার, তাই ট্রাম্পের কাছে পাকিস্তান আবারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অঙ্কটা জলের মতো সহজ!
তৃতীয় এবং সবচেয়ে অস্থির বিষয়টি হল, খনিজ কূটনীতি (মিনারেল ডিপ্লোমেসি)। ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইসলামাবাদের যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিরল খনিজ সম্পদে প্রবেশাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। আর এসব খনিজের বড় অংশই আছে বালুচিস্তানের অশান্ত অঞ্চলে। এই চুক্তি আমেরিকা ও পাকিস্তান উভয়ের জন্যই লাভজনক। এতে পাকিস্তান বিনিয়োগ পাবে। অন্যদিকে আমেরিকা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ সংগ্রহ করতে পারবে। কিন্তু বাস্তবতা আরও কঠিন। দশকের পর দশক ধরে খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ বালুচিস্তান পাকিস্তানের দরিদ্রতম প্রদেশ রয়ে গিয়েছে। পরিকাঠামো প্রকল্প নেই বললেই চলে। বিমানবন্দরগুলি ফাঁকা। বেকারত্বের চাপ বাড়ছে দিনের পর দিন। ২০২৫ সালের মার্চে প্রাদেশিক পরিষদে পাস হওয়া ‘বালুচিস্তান মাইনস অ্যান্ড মিনারেলস অ্যাক্ট’ আগে থেকে মানুষের মনে জমে থাকা অসন্তোষকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এই আইনের আওতায় ইসলামাবাদ আনুষ্ঠানিকভাবে বালুচিস্তানে খনির নীতি-প্রস্তাব ও লাইসেন্স অনুমোদনে মতামত দেওয়ার ক্ষমতা পেয়েছে। ইসলামাবাদের অন্দরে তা নিয়ে বিরোধের জন্ম দিয়েছে। সমালোচকেরা বলেন, এটি প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ধ্বংস করে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে এনেছে। ডানপন্থী ধর্মীয় দলগুলি পর্যন্ত এই আইনের বিরোধিতা করছে। তারা মনে করছে, এর মাধ্যমে স্থানীয় জনগণকে প্রদেশের সম্পদের ন্যায্য অধিকার থেকে আরও বঞ্চিত করা হবে। বিদেশি কোম্পানি খনিজ তুলে নিয়ে যাবে, কিন্তু স্থানীয়রা তার কোনও লভ্যাংশ পাবে না। বালুচিস্তানের বাসিন্দাদের সঙ্গে না রেখে তাদের সম্পদ তোলার এই নীতি খুব বিপজ্জনক। এতে বহু বছর ধরে যুদ্ধ আর সেনা অভিযানে ক্ষতবিক্ষত প্রদেশটিতে বঞ্চনার অনুভূতি আরও গভীর হচ্ছে। ইসলামাবাদ যেটিকে সমাধান ভাবছে, কোয়েটার মানুষ সেটিকে তাদের সম্পদ কেড়ে নেওয়ার আরেক ধাপ হিসেবে দেখছে।
ফলে পাকিস্তানের এই নতুন বিদেশনীতি আসলে কোনও ‘নবজাগরণ’ নয়। বরং চাপে পড়ে কৌশল পালটানোর চেষ্টা মাত্র। অন্যদিকে আমেরিকার মুঠো থেকে আফগানিস্তানের ফসকে যাওয়া, আমেরিকা-ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েন আর খনিজ নিয়ে আমেরিকাকে প্রলুব্ধ করার কৌশল— এসবই ওয়াশিংটনের কাছে পাকিস্তানের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। কিন্তু আমেরিকাকে বুকে টানার মধ্যে দিয়ে পাকিস্তানের মৌলিক দুর্বলতা দূর হবে না। কারণ, প্রয়োজন শেষ হলে পাকিস্তানকে ছুড়ে ফেলতে আমেরিকা একমুহূর্ত দেরি করবে না। ইতিহাসে তার একাধিক উদাহরণ আছে। তাই রিয়াধে সামরিক চুক্তি, গাজা সম্মেলনে উপস্থিতি বা ওয়াশিংটনে করমর্দন— এসব দেখে মনে করা ভুল, পাকিস্তান কৌশলগতভাবে পুনর্জন্ম লাভ করেছে। আসলে পাকিস্তান এখন কেবল কৌশল করে বাঁচার চেষ্টা করছে।
সম্প্রতি নিউ ইয়র্কে মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিও বলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বাড়ানোর সুযোগ নিয়েছে আমেরিকা। তবে সেটা ভারতের সঙ্গে তাদের ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করে নয়। আমেরিকা ও পাকিস্তানের মধ্যে ‘শক্তিশালী সম্পর্ক’ নিয়ে ভারত কোনও উদ্বেগ জানিয়েছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে রুবিও বলেন, ‘আসলে তারা (ভারত) তেমন কিছু বলেনি। আমি যা বুঝি, ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তান-ভারত সম্পর্কে উত্তেজনার ফলে স্পষ্ট কিছু কারণে স্বাভাবিকভাবেই তারা উদ্বিগ্ন। কিন্তু তাদের বুঝতে হবে, আমাদের অনেক দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়। আমরা মনে করি, কূটনৈতিক ও অনুরূপ বিষয়গুলিতে ভারতীয়রা অত্যন্ত পরিপক্ব। দেখুন, আমাদের যেসব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নেই, ভারতের সেসব দেশের সঙ্গেও সম্পর্ক রয়েছে। সুতরাং এটি পরিণত ও বাস্তববাদী বিদেশ নীতিরই একটি অংশ। আমি মনে করি না, পাকিস্তানের সঙ্গে আমরা এমন কোনও সম্পর্কে আবদ্ধ হচ্ছি, যেটা ভারতের সঙ্গে আমাদের গভীর, ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও বন্ধুত্বের ক্ষতি করবে।’ ট্রাম্পও সেই ইঙ্গিত দিয়েছেন। বলেছেন, ‘আমরা শীঘ্রই ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি করব। আমার প্রধানমন্ত্রী মোদির প্রতি অনেক শ্রদ্ধা রয়েছে। আমাদের মধ্যে দারুণ সম্পর্ক রয়েছে।’
আমেরিকার বিদেশনীতির এই বাঁকবদল নিশ্চিত টের পেয়েছে ইসলামাবাদ। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভারতকে নিয়ে ট্রাম্পের উপহাস এবং নতুন শুল্ক, এসব কিছুর পিছনে রয়েছে শুধুমাত্র ভারতকে নিজেদের পথে টেনে আনার প্রচেষ্টা। যার ইঙ্গিত মিলেছে চাবাহারে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে। বাস্তবে যদি তাই ঘটে, তাহলে পাকিস্তানের উচ্ছ্বাস স্বল্পায়ু হবে। ইতিমধ্যে পাক মিডিয়াই প্রশ্ন তোলা শুরু করে দিয়েছে, আমেরিকার সঙ্গে পাকিস্তানের গলাগলি কতদিন টিকবে?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ