পুরানো অসুস্থতা থাকলে কি পুজোর আনন্দ বাদ? নাকি সবই সম্ভব সতর্কতা নিলে? জানালেন তরুণ জেনারেল ফিজিশিয়ান ডাঃ সোমনাথ বিশ্বাস।
পুরানো অসুস্থতা থাকলে কি পুজোর আনন্দ বাদ? নাকি সবই সম্ভব সতর্কতা নিলে? জানালেন তরুণ জেনারেল ফিজিশিয়ান ডাঃ সোমনাথ বিশ্বাস।
পুজো মানেই চারপাশে উৎসবের আবহ। নতুন জামাকাপড়, প্যান্ডেল হপিং, বন্ধু-পরিজনের সঙ্গে আড্ডা, পছন্দের খাবার— সব মিলিয়ে কয়েকটা দিন যেন অন্যরকম হয়ে ওঠে। কিন্তু এই আনন্দের মাঝেও এমন অনেক মানুষ রয়েছেন, যাঁদের নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়, খাবার নিয়ন্ত্রণ রাখতে হয় অথবা ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে চলতে হয়। তাহলে কি তাঁরা পুজোর আনন্দ থেকে দূরে থাকবেন? মোটেই নয়। বরং কিছু সতর্কতা মেনে চললে তাঁরাও উৎসবে শামিল হতে পারেন।
হাইপারগ্লাইসেমিয়া
পুজো মানেই মিষ্টি, লুচি-তরকারি বা নানা রকম মুখরোচক খাবার। ফলে ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তার উপর পুজোর ব্যস্ততায় অনেক সময় নির্দিষ্ট সময়ে খাবার খাওয়া বা ওষুধ খাওয়ার নিয়মেও ছেদ পড়ে। তাই ওষুধ ও ইনসুলিন নির্দিষ্ট সময়ে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
তবে শুধু রক্তে শর্করা বেড়ে যাওয়ার দিকেই নজর নয়, হাইপোগ্লাইসেমিয়ার (সুগার ফল) আশঙ্কার কথাও মাথায় রাখতে হবে। বাইরে বেরলে মিষ্টি জাতীয় খাবার, যেমন চকোলেট বা সন্দেশ সঙ্গে রাখবেন।
ডিমেনশিয়া
অ্যালঝাইমার্স, ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত প্রবীণ মানুষদের ক্ষেত্রে পুজোর ভিড় সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই একেবারে ভিড়ের সময় না গিয়ে তুলনামূলক ফাঁকা সময়ে তাঁদের নিয়ে বেরনো ভালো। পরিবারের সকলে মিলে দায়িত্ব ভাগ করে নিলে রোগীকেও উৎসবের আনন্দের অংশ করে নেওয়া যায়। এতে তাঁর শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়বে।
ক্লস্ট্রোফোবিয়া
সরু বা বদ্ধ জায়গায় আটকে পড়ার ভয় হল ক্লস্ট্রোফোবিয়া। পুজোয় সরু প্যান্ডেল বা
অতিরিক্ত ভিড়ের মধ্যে এমন সমস্যা বাড়তে পারে। তবে ভিড় দেখলেই ভয় পাওয়াকে ক্লস্ট্রোফোবিয়া বলা যায় না। একে বলা হয় এনক্লোফোবিয়া। ভিড়ের মধ্যে প্যানিক অ্যাটাক হলে দ্রুত তাঁকে ভিড় থেকে বের করে তুলনামূলক ফাঁকা জায়গায় নিয়ে যেতে হবে। বুক ধড়ফড়, চাপ, অস্বস্তি বা অতিরিক্ত ঘামের মতো উপসর্গ দেখা দিলে, অবহেলা করা ঠিক নয়। প্রয়োজন হলে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যান রোগীকে। পুজো মণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবকদের বেসিক লাইফ সাপোর্ট ও সিপিআর-এর প্রশিক্ষণ থাকলে জরুরি পরিস্থিতিতে তা কাজে লাগতে পারে।
অ্যালার্জি
পুজোর সময়ে নতুন পারফিউম, নতুন পোশাক, ধুলো, ধোঁয়া থেকে অ্যালার্জির সমস্যা দেখা দিতে পারে। যাঁদের আগে থেকেই অ্যালার্জি রয়েছে, তাঁরা নিজেদের অ্যালার্জির ট্রিগারগুলি সম্পর্কে সচেতন থাকুন। সেগুলি এড়িয়ে চলুন। আগে অ্যালার্জি পরীক্ষা হয়ে থাকলে সেই রিপোর্ট অনুযায়ী সতর্ক থাকা আরও ভালো। পুজোর সময় রাস্তার খাবারও এড়িয়ে চলুন।
হাঁপানি
ব্রঙ্কিয়াল অ্যাজমা এবং সিওপিডি— দুই ধরনের শ্বাসকষ্টের সমস্যার ক্ষেত্রেই সতর্ক থাকা জরুরি। কোনো বিষয়টি শ্বাসকষ্ট বাড়িয়ে দেয়, তা আগে থেকেই চিহ্নিত করে রাখা দরকার। পুজোর আগে বাড়িঘর পরিষ্কার করার সময় ধুলো থেকেও সমস্যা হতে পারে। তাই প্রয়োজন হলে সেই জায়গা থেকে দূরে থাকাই শ্রেয়। পাশাপাশি অ্যাজমার রোগীদের নিয়মিত ওষুধ বা ইনহেলার নিতে হবে। বাইরে বেরলেও ইনহেলার অবশ্যই সঙ্গে রাখা দরকার। সিওপিডি রোগীরা ধূমপান সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলবেন। প্রয়োজনীয় ওষুধ হাতের কাছে রাখতে হবে।
আর্থ্রাইটিস
বাতের ব্যথা বা আর্থ্রাইটিসে আক্রান্তদের পুজোর আনন্দ উপভোগ করতে গিয়ে অতিরিক্ত হাঁটাহাঁটি বা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা এড়িয়ে চলা ভালো। কাছাকাছি মণ্ডপে যান। প্রয়োজনমতো বিশ্রাম নিন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নি-ক্যাপ ব্যবহার করতে পারেন।
হৃদরোগ
পুজোর সময়ে দীর্ঘক্ষণ হাঁটা, অতিরিক্ত খাওয়াদাওয়া বা মদ্যপানের অভ্যাস হৃদরোগীদের সমস্যা বাড়ায়। তাই পুজোয় বেরলেও সাবধানে থাকতে হবে। বুকে কোনো সমস্যা হলে দ্রুত রোগীকে ভিড় থেকে বের করে আনুন। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। পুজোর আনন্দ সবার। অসুস্থতা থাকলেই উৎসব থেকে দূরে সরে যেতে হবে, এমন নয়। তবে আনন্দের সঙ্গে সচেতনতাও জরুরি। নিজের সামর্থ্য বুঝে, প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে রেখে পুজোর আনন্দে মেতে উঠুন। পুজোর আগে একবার চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে নিতে ভুলবেন না।
লিখেছেন শান্তনু দত্ত