গৃহবধূরাও রোজগেরে! বেকারত্ব ঢাকতে মরিয়া কেন্দ্র
  • ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, কলকাতা: গোটা দেশে কাজের বাজার আগের তুলনায় অনেক ভালো! নানা পরিসংখ্যান তুলে এনে এমনই দাবি করে নরেন্দ্র মোদি সরকার। ঢাক পিটিয়ে প্রচার চলে, ভারতে বেকারত্বের হার অনেক কম। কিন্তু বাস্তব চিত্র কি সেকথা বলছে? প্রশ্ন তুলে দিল নামজাদা ক্রেডিট রেটিং সংস্থা ‘কেয়ার-এজ’। তাদের সাফ কথা, বেকারত্বের হার কমেছে ঠিকই। কিন্তু যে পরিসংখ্যান খাড়া করে এই সাফল্য দেখানো হচ্ছে, তাতে যথেষ্ট জল মেশানো। উদাহরণ টেনে দেখানো হয়েছে, মোদি জমানায় গৃহবধূরাও নাকি কাগজেকলমে ‘রোজগেরে’! দেশের যেসব মহিলারা সন্তান প্রতিপালন করেন বা সংসার সামলান, তাঁদের দিব্যি ‘স্বনিযুক্ত কর্মী’ বা ‘সেলফ এমপ্লয়েড’ হিসাবে দেখাচ্ছে কেন্দ্র। ফলে এক পয়সা রোজগার না করেও কর্মসংস্থানে দেশের দিশা তাঁরাই। স্রেফ বেকারত্বের হার বেড়ে যাওয়া ঢাকতে মরিয়া হয়ে একাজ করছে মোদি সরকার। ‘কেয়ার-এজ’ এও জানাচ্ছে, কাজের বাজারে অংশগ্রহণ করার হার (লেবার ফোর্স পার্টিসিপেশন রেট) অনুযায়ী উন্নত দেশগুলি তো বটেই, এমনকি এশিয়ার তুলনামূলক কমজোরি অর্থনীতির দেশগুলি থেকেও পিছিয়ে রয়েছে ভারত। 

Advertisement

ঠিক কী বলছে ‘কেয়ার-এজে’র রিপোর্ট? তারা জানাচ্ছে, গ্রামাঞ্চলে মহিলাদের স্বনিযুক্তির হার পৌঁছে গিয়েছে ৭০.৭ শতাংশে। আপাতভাবে মনে হতে পারে, গ্রামের অর্থনীতি চাঙা হয়েছে। তাই কাজ পাচ্ছেন মহিলারা। কিন্তু বাস্তব আদৌ তা নয়। ‘স্বনিযুক্ত কর্মী’ বলে যে সব মহিলাদের ‘সাফল্য’ পরিসংখ্যানে তুলে ধরছে মোদি সরকার, তাঁদের একটা বড়ো অংশ বিনা পারিশ্রমিকে বাড়িতে শ্রমদান করেন বা সংসার সামলান। অর্থাৎ প্রকৃত কর্মসংস্থানে তাঁদের কোনো ভূমিকা নেই। রিপোর্ট বলছে, গ্রামীণ স্বনিযুক্তির প্রায় অর্ধেকই বিনা পয়সায় সংসার সামলান। গ্রামে কর্মরত মহিলাদের মাত্র ৯.৩ শতাংশ নিয়মিত বেতনের চাকরি করেন। শহরে সেই হার ৫১ শতাংশ। গ্রামের ২০ শতাংশ মহিলা ঠিকা বা চুক্তিতে কাজ করেন। শহরে সেই হার ৯ শতাংশ। পরিস্থিতি ভালো নয় পুরুষদের ক্ষেত্রেও। শহরের পুরুষ কর্মীদের ৪৭ শতাংশ নিয়মিত বেতনের চাকরি করলেও, গ্রামে সেই হার মাত্র ১৭ শতাংশ। বাকিরা হয় চাষাবাদ করেন, বা ঠিকা কাজ করেন। সেই কাজে কি তাঁরা সন্তুষ্ট? রিপোর্ট অনুযায়ী, মহিলা ও পুরুষ নির্বিশেষে সেই কাজগুলি আদৌ ধারাবাহিক নয়। অর্থাৎ রোজগার হয় মরশুমে বা মাঝেমধ্যে। বছরভর আয় থাকে না সিংহভাগেরই। দেশের মোট কর্মীর প্রায় ৫০ শতাংশ কৃষিকাজে যুক্ত হলেও, দেশের মোট মজুরি বা উপার্জনের মাত্র ২০ শতাংশ আসে তাঁদের কাছে। অর্থাৎ যে পরিশ্রম তাঁরা করেন, রোজগার তার তুলনায় অনেক কম। মোট কথা, যাঁদের সামনে রেখে দুনিয়ার কাছে কাজের বাজারের সাফল্য তুলে ধরছে কেন্দ্র, তা যে অন্তঃসারশূন্য, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
ক্রেডিট রেটিং সংস্থাটি বলছে, কাজের বাজারে দেশবাসীর যোগদানের যে পরিসংখ্যান সামনে আনা হয়েছে, সেখানে যথেষ্ট গোলমাল রয়েছে। স্বনিযুক্তি বা কারও অধীনে কাজ না করে, নিজেই রোজগারের ব্যবস্থা করে নেওয়ার হার ভারতে অনেক বেশি। এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি গ্রামে। সংস্থাটির বক্তব্য, যখন সমাজে চাকরির বাজার সংকুচিত হয়ে আসে, তখন বেঁচে থাকার তাগিদে স্বনিযুক্তির প্রবণতা বাড়ে। ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষে মোট কাজের বাজারের ৫২ শতাংশ ধরে রেখেছিল স্বনিযুক্তি। করোনাকালের পর ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে তা বেড়ে হয় ৫৮.৪ শতাংশ। গত বছর সেই হার ৫৬.২ শতাংশে নামলেও করোনাকালের আগের অবস্থায় ফেরা যায়নি।
‘কেয়ার এজে’র রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৮ সালে কাজের বাজারে ভারতীয়দের যোগদানের হার ছিল ৪৯.৮ শতাংশ। ২০২৫ সালে সেই হার বেড়ে ৫৯.৩ শতাংশে পৌঁছেছে। পরিসংখ্যানের নিরিখে অবশ্যই তা কেন্দ্রীয় সরকারের সাফল্য। তবে তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে গোটা বিশ্বে এই ক্ষেত্রে গড় হার ছিল ৬১ শতাংশ। অর্থাৎ এই নিরিখে পিছিয়ে ভারত। স্বাভাবিকভাবেই এগিয়ে থাকার কথা চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপিন্স বা সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলির। কিন্তু পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ডের মতো কমজোরি অর্থনীতির দেশগুলিও কাজের বাজারে যোগদানের ক্ষেত্রে ঢের এগিয়ে। এমনকি, পড়শি বাংলাদেশও পিছনে ফেলেছে ভারতকে।