Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

বাংলায় বড়দিন

ব্রিটিশ শক্তির উৎসাহেই ‘খ্রিস্টমাস’ এসেছিল ভারতে। কিন্তু খ্রিস্টকে বাঙালি গ্রহণ করেছিল নিজের ভেবেই। সেই নিজস্বতার ছোঁয়ায় খ্রিস্টমাস হয়েছে বড়দিন।

বাংলায় বড়দিন
  • ২১ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সৌম্যব্রত দাশগুপ্ত

Advertisement

 ব্রিটিশ শক্তির উৎসাহেই ‘খ্রিস্টমাস’ এসেছিল ভারতে। কিন্তু খ্রিস্টকে বাঙালি গ্রহণ করেছিল নিজের ভেবেই। সেই নিজস্বতার ছোঁয়ায় খ্রিস্টমাস হয়েছে বড়দিন। অনেকেই আজকাল বিষয়টিকে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের সমার্থক মানেন। কিন্তু খ্রিস্ট ধর্মের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বহু প্রাচীন, আর যিশুর প্রতি বাংলার চিন্তাবিদদের হৃদয়ের প্রণতিও বহু দিনের। 
ঊনবিংশ শতাব্দীর আগে বাংলায় ধর্মান্তরের কোনও উল্লেখ ইতিহাসে নেই। উনিশ শতকের শুরুতে এখানে দেশীয় লোকদের মধ্যে প্রথম খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণের প্রবণতা দেখা যায়। তা দেখে উৎসাহিত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্তারা কালীঘাটে প্রতিনিধি পাঠিয়ে ৫০০ টাকার পুজো দিয়েছিলেন।
কলকাতা তখন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী। শহরে খ্রিস্টমাস পালন শুরু হয় সাহেবদের উৎসাহে। প্রথম দিকে তারাই যে শুধু আনন্দ-ফূর্তি করত, তা নয়। এ দেশের কিছু মানুষও তাতে ভাগীদার হত। উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে এই উৎসব সর্বজনীন রূপ নেয়। কালীপ্রসন্ন সিংহের ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’য় বড়দিনের উল্লেখ নেই। কিন্তু সেকালের জনপ্রিয় পত্রিকা ‘বসন্তক’-এর ১২৮০ বঙ্গাব্দের একটি সংখ্যায় লেখা হয়েছিল, ‘হিন্দু মুসলমান, সাহেব, ফিরিঙ্গি, সকলেরই পক্ষে ঐটি বড়দিন— কত বড় বড় হিন্দু-কুলোদ্ভব মুৎসুদ্দিবাবুরা বাদাম, পেস্তা, কমলালেবু, শেরি, শ্যাম্পেন, ভেটকি সাহেববাড়ী সওগাদ পাঠাবার আয়োজনে ব্যস্ত।’ সাহেব বাড়িতে ঘটা করে ভেট পাঠাতেন কলকাতার নব্যবাবুরা। এর সুন্দর বর্ণনা আছে ঈশ্বর গুপ্তের কবিতায়— ‘খ্রীষ্টের জনমদিন বড়দিন নাম/ বহুসুখে পরিপূর্ণ কলিকাতা ধাম/ কেরাণী, দেয়ান আদি বড় বড় মেট/ সাহেবের ঘরে ঘরে পাঠাতেছে ভেট/ ভেটকী, কমলা আদি মিছরি বাদাম/ ভাল দেখে কিনে লয়, দিয়ে ভাল দাম।’
সাহেবদের জাঁকজমক দেখে নব্যবাবুদের মনেও জেগেছিল বড়দিন পালনের শখ। সেকালের কলকাতায় বড়দিনের উৎসবে গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলের সাজসজ্জা সম্পর্কেও ‘বসন্তক’ পত্রিকায় সরস বর্ণনা পাওয়া যায়, ‘বলবো কি, বড় বড় বাবুদের জুড়িগুলো পর্যন্ত গ্রেট ইস্টার্ন-এর সজ্জা দেখে আর চলতে পারে না, দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নাল ফেলতে থাকে...।’
যিশুখ্রিস্টের জন্মদিনের উৎসব তখনকার বাঙালি সমাজ ও মননকে এমনই আপ্লুত করেছিল যে, তারা জন্মাষ্টমীর অনুকরণে ঈশ্বরদূত মেরিপুত্র যিশুখ্রিস্টের জন্মদিনকে বলতেন, ‘খৃষ্টাষ্টমী।’ ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে কলকাতায় ক্রিসমাস পর্বের সূচনা হয়ে যেত পঁচিশে ডিসেম্বরের সপ্তাহখানেক আগে থেকেই। আর সেই উৎসবের রেশ কাটতে পার হয়ে যেত নতুন বছরের জানুয়ারি মাস। এ নিয়ে ‘বসন্তক’ পত্রিকায় চমকপ্রদ মন্তব্য আছে, ‘খৃষ্টমাস ডে সম্মুখে দেখে শহরের অধিকাংশ লোক আহ্লাদে আটখানা হতে লাগল। দুর্গোৎসবটা যেরূপ সাধারণ পরব হয়ে উঠেছে, এও সেইরূপ।’ ফ্যানি পার্কস ইংল্যান্ড থেকে কলকাতায় এসেছিলেন ১৮২২ সালের নভেম্বর মাসে। ভ্রমণ বৃত্তান্তে তিনি বর্ণনা দিয়েছেন, ‘ক্রীসমাসের দিনে দেখেছি বাড়ির ভৃত্যরা গাছ লতাপাতা দিয়ে গেট সাজায় এবং চারদিকে ফুলের মালা ঝুলিয়ে দেয়। বেয়ারা, ধোপা ও অন্যান্য সকলে রেকাবে ও ট্রেতে করে নানা রকমের ফল, মূল, কেক, মিষ্টি ইত্যাদি সাজিয়ে ফুলের মালা দিয়ে নিয়ে আসে এবং বকশিস চায়।’ 
এসম্পর্কে আরও সুন্দর বর্ণনা আছে ১৭৮১ সালের ২৭ জানুয়ারি তারিখে লেখা ‘মিসেস এলিজা ফে’র চিঠিতে— ‘আমরা এখানে ক্রীসমাসের ফূর্তিতে মশগুল হয়ে আছি। ইংল্যান্ডেও বোধহয় ক্রীসমাসের এত সমারোহ হয় না। কিন্তু এখানে প্রাচীনকালের উৎসবের মতন বেশ ধুমধাম করে ক্রীসমাস পর্ব পালন করা হয়।’
উইলিয়ম হিকি লিখেছিলেন, ১৭৮৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের গোড়ায় লর্ড কর্নওয়ালিস কলকাতায় এসে পৌঁছোন। তখনকার রীতি অনুযায়ী, প্রতি বছর বড়দিনে গভর্নর জেনারেল, তাঁর কাউন্সিলের সদস্যরা এবং কলকাতার গণ্যমান্য সাহেবসুবোরা কোর্ট হাউসে একত্রে ডিনার করতেন। বলনাচ আর বাঈনাচ ছিল সভার আকর্ষণ। লর্ড কর্নওয়ালিস এর ঘোরতর বিরোধী ছিলেন। তাঁর মতে, নাচগান-হল্লায় ধর্মোৎসবের মর্যাদা রক্ষা করা যায় না। তৎকালীন কলকাতায় ইংরেজরা ক্রিসমাসকে ভোগবিলাসের স্তরে নামিয়ে আনায় তিনি মর্মাহত হন। কিন্তু তাতেও জৌলুস যে কমেনি, তার প্রমাণ মেলে ১৮৮০ সালে। সেবার কলকাতায় বড়দিনের সূচনা হয়েছিল সকালবেলা তোপধ্বনির মাধ্যমে। গভর্নর জেনারেলের কোর্টহাউসে ছিল মহাভোজের আয়োজন।
বড়দিনের এই উৎসবে মহামানব যিশুকে তেমনভাবে খুঁজে পাওয়া যায় না। এর বহু আগেই তিনি চিন্তার খোরাক জুগিয়েছিলেন বাঙালি চিন্তাবিদদের ভাবরাজ্যে। আসলে ব্রিটিশরা আসার বহু আগেই খ্রিস্ট ধর্ম ভারতে এসেছিল। দক্ষিণ ভারতের খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষজন বলেন, যিশুর শিষ্য সন্ত থমাসই প্রথম খ্রিস্টের বাণী নিয়ে ভারতে পা রাখেন। তবে কলকাতায় খ্রিস্টধর্ম ও বড়দিন—দুটোই যে ব্রিটিশ সরকারের দান, তা নিয়ে দ্বিমত নেই। তা প্রভাব বিস্তার করেছিল বাঙালি হিন্দু সমাজের উচ্চবিত্ত ও শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যেও। মাইকেল মধুসূদন দত্ত, কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ, কবি তরু দত্ত, ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্বরা খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তাতে অনেক বাঙালি, বিশেষ করে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষ খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণে উৎসাহিত হয়। এর কারণ ছিল অবশ্য মিশনারীদের কার্যক্রম, পশ্চিমি শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রভাব এবং সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে একটি বিকল্প পথ খোঁজা। সেই বিকল্প পথের সন্ধানেই দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। রাজা রামমোহন রায় প্রতিষ্ঠিত ‘ব্রাহ্মসভা’কে ব্রাহ্মসমাজে রূপান্তরিত করার নেপথ্যে ছিল মধ্যবিত্ত বাঙালি হিন্দু সমাজে মিশনারিদের রোখা। সেই ধর্মীয় ও সামাজিক বিরোধের দিনগুলিতেও অমৃত পুরুষ যিশুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে বাঙালিরা ছিলেন অকৃপণ। ‘Precepts of Jesus’ বই লিখে যিশুর উপদেশগুলি সংগ্রহের চেষ্টা করেছিলেন রামমোহন রায়। মিশনারিদের প্রচারিত ধর্মের থেকে যিশুকে আলাদা করতেও চেয়েছিলেন। প্রচলিত খ্রিস্টীয় সংস্কারগুলির পরিবর্তে যিশুকে ঈশ্বরসৃষ্ট ও মানবপ্রেমিক রূপে প্রতিষ্ঠিত করবার চেষ্টা করেছেন তিনি। কেশবচন্দ্র সেন, শিবনাথ শাস্ত্রীর মতো ব্রাহ্ম চিন্তাবিদদের মননেও যিশুর জীবন ও শিক্ষা গভীর প্রভাব ফেলেছিল। বড়দিনে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করতেন কেশবচন্দ্র। উপনিষদের বাণীর সঙ্গে যিশুর জীবন শিক্ষার মেলবন্ধনই ছিল তাঁর স্বপ্ন।
ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়ের অশান্ত জীবনপ্রজ্ঞায় বিরাট প্রভাব বিস্তার করেছিল যিশুর জীবন। তিনি খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করলেও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির আগ্রাসন মেনে নেননি। তাই জীবনের দীর্ঘ সময় তাঁর কেটেছে খ্রিস্টের ভারতীয়করণের প্রচেষ্টায়। সংস্কৃত ভাষায় যিশুর মন্ত্র রচনা থেকে বৈষ্ণব ধর্মের অনুকরণে যিশুর নাম সংকীর্তন রচনা—সবই ছিল ব্রহ্মবান্ধবের ভারতীয় খ্রিস্ট ধর্মে।
যিশুখ্রিস্টের গভীর প্রভাব থেকে বাদ পড়েননি স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণদেবও। ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত’ গ্রন্থে এক বিশেষ অধ্যায় আছে, যার শিরোনাম ‘ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ও যিশুখ্রিস্ট’। দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুর যে ঘরে থাকতেন, সেই ঘরের দেওয়ালেই যিশুখ্রিস্টের একটি ছবি ছিল। সেই ঘটনার উল্লেখ করে এই অধ্যায়ে কথামৃতকার শ্রীম বা মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত লিখেছেন, ‘ঘরের দেওয়ালে ঠাকুরদের ছবি, তার মধ্যে পিটার জল মধ্যে ডুবিতেছেন ও যীশু তাঁর হাত ধরিয়া তুলিতেছেন সেই ছবিখানিও আছে।’
শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনে খ্রিস্টের প্রভাবের অন্য একটি ঘটনার উল্লেখ আছে। যদু মল্লিকের বাগানবাড়িতে একদিন বেড়াতে এসেছেন শ্রীরামকৃষ্ণ। বৈঠকখানায় বসে গল্প করছেন যদুর সঙ্গে। হঠাৎ দেওয়ালে টাঙানো একটা ছবির দিকে তাঁর নজর পড়ল। মা আর ছেলে। যদু মল্লিকের কাছে শ্রীরামকৃষ্ণ ছবিটি সম্পর্কে জানতে চাইলে যদু মল্লিক বলেছিলেন, ছবিটি মা মেরি আর তাঁর ছেলে যিশুখ্রিস্টর। একদৃষ্টে চেয়ে রইলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। দেখলেন যশোদা আর তার ছেলে বালগোপাল। সোজা যদু মল্লিকের কাছে গিয়ে হাজির হলেন, বললেন, ‘যীশু খ্রিস্টের গল্প শোনাও আমাকে। একটু বাইবেল শোনাও দিকি।’ সেদিন যদু মল্লিকের বাগান বাড়িতে বাইবেলের বাণীতে পীযূষ প্রেমময় যিশুকে অন্তরে উপলব্ধি করে মুগ্ধ হয়েছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। যিশুর প্রতি শ্রীরামকৃষ্ণের এই ভাবময়তার অনুরণন দেখা যায় স্বামী বিবেকানন্দের মধ্যেও। ১৮৮৮ থেকে ১৮৯৩ সালের মধ্যে তখন তিনি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ভ্রমণ করেছিলেন, তখন তাঁর সঙ্গী ছিল দু’টি গ্রন্থ—গীতা ও টমাস কেম্পিসের লেখা ‘The Imitation of Christ’। এই গ্রন্থটি বিবেকানন্দকে এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে, তিনি গ্রন্থটি অনুবাদ করেন। ১৯০০ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার লস এঞ্জেলসে প্রদত্ত বিখ্যাত বক্তৃতা ‘ক্রাইস্ট, দ্য মেসেঞ্জার’-এ বিবেকানন্দ বলেছিলেন, ‘যদি একজন প্রাচ্যবাসী হিসেবে আমাকে নাজারেথের যীশুর উপাসনা করতে হয় তাহলে কেবল একটিই উপায় আছে, তা হল তাঁকে ঈশ্বর হিসাবে উপাসনা করা।’ বিবেকানন্দের মতে, সময় এবং প্রতিটি ভৌগোলিক অঞ্চল নিজস্ব অবতার সৃষ্টি করে। ভারতে যেমন কৃষ্ণ, বুদ্ধ, চৈতন্য এসেছিলেন, যিশুও তেমনই সময়ের ও ভৌগোলিক চাহিদার ফসল। 
প্রায় সমসাময়িক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মধ্যেও যিশুর জীবন ও বাণী গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল। যিশুর আলোকে তিনি                                                                  যেমন মানবত্ব থেকে দেবত্বে উত্তরণের কথা লিখেছেন, তেমনই তাঁর বিশ্লেষণে ধরা পড়েছে বেদ-বেদান্ত-উপনিষদের সঙ্গে খ্রিস্টের দর্শনের সাযুজ্য। কবিগুরু বলছেন, ‘আমাদের জীবনে তার জন্মদিন দৈবাৎ আসে, কিন্তু ক্রুশে বিদ্ধ তাঁর মৃত্যু সে তো আসে দিনের পর দিন।’ বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে বাংলার ধর্ম ও সংস্কৃতি জগতের দু’টি বৃহৎ প্রতিষ্ঠান রামকৃষ্ণ মিশন ও বিশ্বভারতী বড়দিন পালন করছে। শান্তিনিকেতনে বড়দিন পালনের ইতিহাস শুরু হয় ১৯১০ সাল থেকে। এই নজির দু’টি পাশ্চাত্যের ভাবধারা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নিজস্ব উৎসব। কলকাতায় যে ধরনের ‘বড়দিন’ পালনের রেওয়াজ দেখা যেত, শান্তিনিকেতনের ‘বড়দিন’ তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
বাংলায় শ্রীরামপুর, চন্দননগর, বারাকপুর প্রভৃতি জায়গায় ‘বড়দিন’ পালনের রেওয়াজও বহু প্রাচীন। তবে কলকাতা সবার থেকে আলাদা। কারণ, বহু খ্রিস্ট মণ্ডলীর সমাবেশ হয়েছিল এই শহরে। শহরের উপকণ্ঠে ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতাব্দীতে পর্তুগিজ, দিনেমারদের উপনিবেশ, পরে আর্মেনীয়দের আগমন এবং সবশেষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি—সকলে নিজস্ব রীতিতে খ্রিস্ট ধর্ম পালনের প্রথাকে নিয়ে এসেছিল কলকাতায়। ঊনবিংশ শতকের শেষে ডালহৌসি, এসপ্ল্যানেড, রিপন স্ট্রিট, ইলিয়ড রোড, পার্ক স্ট্রিট ও থিয়েটার রোডে ইউরোপীয় ও ইন্দো ভারতীয় উপাসকদের জন্য স্থাপিত গির্জাগুলি এখনও তার সাক্ষ্য বহন করে।
বাংলার মানুষের জীবনে যিশুর প্রভাব এবং হৃদয়ে তাঁর আসন চিরস্থায়ী। তাই বাংলা উপনিবেশিকতার দৃষ্টি থেকে যিশুকে দেখেনি। যিশুর মধ্যে ফুটে উঠেছে মানবতা ও প্রেমের সর্বজনীন আদর্শ। বুদ্ধ আর চৈতন্যের সঙ্গে যে আদর্শের মিল। তাই বাঙালি শিল্পী নন্দলাল বসু ও যামিনী রায়ের অঙ্কিত যিশুর মধ্যে যন্ত্রণা, প্রতিবাদের যুগল মূর্তি প্রতিফলিত হয়। লাল কালির ভঙ্গুর রেখায় নন্দলাল বসু এঁকেছিলেন যিশু তাঁর নিজের কাঁধে নিয়ে চলেছেন মৃত্যুদণ্ড ক্রস। এক অদ্ভুত যন্ত্রণায় ব্যপ্ত হয়েছে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই করা মানুষের জীবন যন্ত্রণা। যিশুর লড়াই ও প্রেমের আদর্শের জন্যই ভারতের সঙ্গে তাঁর আত্মিক সংযোগ। 
• ছবি : অতূণ বন্দ্যোপাধ্যায়
• গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল 
• সহযোগিতায় : বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ