সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: অসতর্কভাবে ‘রামধনু’ রঙে জীবন রাঙাতে গিয়ে বিপদ ডেকে আনছেন হাইপ্রোফাইল লোকজনই! বর্ধমান শহরে এমন ৩০ জনকে এইডস আক্রান্ত বলে শনাক্ত করা হয়েছে, যাঁরা সমাজের তথাকথিত ‘ক্রিম’ জনগোষ্ঠীর মানুষ। কে নেই তালিকায়? নামী চিকিৎসক থেকে শুরু করে অধ্যাপক, শিক্ষক সহ বড় কর্পোরেট সংস্থার আধিকারিকও। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, যাঁরা সুস্থ সমাজ ও সুস্থ স্বাস্থ্য গড়ার কারিগর তাঁরাই কিনা সমকামে অনিরাপদ যৌনযাপন করে এখন জীবন-সঙ্কটের মুখে! বিষয়টি ফাঁস হতেই জেলা স্বাস্থ্যদপ্তরে হইচই কাণ্ড। কীভাবে এর মোকাবিলা করা যাবে, তার পথ খুঁজতে হিমশিম অবস্থা স্বাস্থ্য কর্তাদের। একই সঙ্গে বিড়ম্বনায়ও পড়েছেন তাঁরা। পাশাপাশি, উদ্বেগ বাড়ছে সব মহলেই।
পূর্ব বর্ধমান জেলা পরিষদের জনস্বাস্থ্য দপ্তরের কর্মাধ্যক্ষ বিশ্বনাথ রায় বলেন, ‘সম্প্রতি এইডস আক্রান্তদের চিহ্নিতকরণে জোর দেওয়া হয়েছে। জেলায় ৯০ জন এইচআইভি পজিটিভ। তারমধ্যে শুধু বর্ধমান শহরের ৩০ জন যুবক এইডস আক্রান্ত। আশ্চর্যজনক বিষয় হল, তাঁরা সকলেই উচ্চশিক্ষিত এবং সামাজিক ও আর্থিক ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত। সমকামে আসক্ত করে অসতর্ক মেলামেশার কারণেই এই ভয়াবহ ব্যধি ডেকে এনেছেন বলে মনে করা হচ্ছে।’
আমেরিকার একটি গবেষণা বলছে, সমকামে অনিরাপদ যৌনতা এইডসের ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়ি দেয়। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, সেই ঝুঁকি ৬৭ শতাংশের কাছাকাছি। বর্ধমান শহরের ওই ৩০ জন হাইপ্রোফাইল ব্যক্তির ক্ষেত্রে ঠিক সেটাই ঘটেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। কিন্তু প্রশ্ন হল, চিকিৎসক, অধ্যাপক হয়েও কেন তাঁরা এমন ঝুঁকি নিলেন? কীভাবেই বা তাঁদের কীর্তি ফাঁস হল? জেলা স্বাস্থ্যদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় সমকামে আসক্তদের একটি গ্রুপ রয়েছে। সেই গ্রুপ থেকেই তাঁরা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। সময় সুযোগ বুঝে ঘনিষ্ঠ হতেন। অনেক দিন ধরেই এমনটা চলছিল। বিপদের আঁচ প্রথম দিকে টের পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি তাঁদেরই একজন বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন। জ্বর, সর্দ্দি-কাশি কিছুতেই সারছিল না। পরীক্ষা করে দেখা যায়, তিনি সমকামে আসক্ত এবং এইচআইভি পজিটিভ। এরপরই বাকি সঙ্গীদেরও পরীক্ষা করা হয়। তাঁদেরও শরীরে এইডস সংক্রমণের লক্ষ্মণ দেখা যায়।
পূর্ব বর্ধমানের মুখ্য স্বাস্থ্যআধিকারিক জয়রাম হেমব্রম উদ্বেগের সঙ্গে বলেন, ‘এত সচেতন করার পরও মানুষ বেপরোয়া হয়ে উঠছে। কোনও কিছুরই তোয়াক্কা করছে না। আমরা টেস্টের সংখ্যা বাড়িয়েছি। মহিলাদের পাশাপাশি যুবকদের মধ্যেও এইচআইভি আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা বাড়ছে।’ এইচআইভি নিয়ে সচেতনতামূলক প্রচারের কাজ করেন একটি সংস্থার কর্ণধার মতিউর রহমান বলেন, ‘বেশ কয়েক বছর ধরে সমকামের প্রবণতা অনেক বেড়ে গিয়েছে। নিরাপদ যৌন সঙ্গম নিয়ে লাগাতার প্রচার করছি। তারপরও এইডসের সংখ্যা কমানো যাচ্ছে না। শহরের যুবকদের মধ্যে সমকামের প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। উচ্চশিক্ষিত যুবকরাও যৌন সঙ্গমের সময় সতর্কতা অবলম্বন করছেন না। বাংলায় একটা কথা রয়েছে, সমাজের ক্ষতি মূর্খদের দ্বারা হয় না। শিক্ষিতরাই মূর্খের মতো কাজ করলে সমাজ ধ্বংস হয়।’
স্বাস্থ্য দপ্তর সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, বর্ধমান এবং কালনা শহরে এইডস আক্রান্তর সংখ্যা বাড়ছে। আশ্চর্যজনকভাবে নিষিদ্ধপল্লি এলাকায় আক্রান্তের সংখ্যা কমে গিয়েছে। অথচ, লজ্জাজনক বিষয় যেটা তা হল, এলিট ক্লাস লোকেরা বোধবুদ্ধি হারিয়ে অবাধ মেলামেশা করছেন। বেড়া ভেঙে সমকামে মজে উঠছেন। স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের মধ্যে এইডসের ঝুঁকি বাড়ছে। অন্যদেরও ঝুঁকি বাড়াচ্ছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় রীতিমতো বিজ্ঞাপন দিয়ে সম মানসিকতার যুবকদের খোঁজ চলছে। আধিকারিকদের অনেকের মতে, এই প্রবণতা বিপজ্জনক। বর্ধমান পুরসভার চেয়ারম্যান পরেশচন্দ্র সরকার বলেন, ‘বিষয়টি যথেষ্ট উদ্বেগের। সচেতনতামূলক প্রচারে আরও জোর দেওয়া হচ্ছে।’