• উত্তমকুমারের শতবর্ষ। বাঙালির কাছে আবেগের ক্ষণ। আগামী ৩ সেপ্টেম্বর শতবর্ষ হবে তাঁর। মহানায়ক চিরকাল দর্শকের হৃদয়ে রাজার মতো থাকবেন। তাঁর জন্মশতবার্ষিকী পালনের আয়োজনে কী ব্যবস্থা করা যায়? এই নিয়ে পরিকল্পনা শুরু করল টিম চতুষ্পর্ণী। ফ্যাশন সেন্সে তিনি তো সর্বোত্তম। ধুতি, পাঞ্জাবিতে অমলিন হাসিটি নিয়ে তাকিয়ে রয়েছেন আজও। কখনো চোখে দুষ্টুমি। কখনো মায়াভরা সে চাহনি। মহানায়ককে শ্রদ্ধা জানাতে হবে তাঁরই স্টাইল স্টেটমেন্ট দিয়ে। এ কাজ বড়ো সহজ নয়। মহানায়ক একজনই। তাঁকে অনুকরণ করা যায় না। তাঁর সাজের বাহার আমরা পুনর্নির্মাণ করার চেষ্টা করতে পারি মাত্র।
বর্তমানে ফ্যাশন দুনিয়ায় নিজের সৃষ্টিকে অন্য ভাবে মেলে ধরেছেন যে কয়েকজন শিল্পী, তাঁদের মধ্যে অন্যতম অভিষেক রায়। ধুতি, পাঞ্জাবিতে এই বিশেষ লুক তৈরি করার দায়িত্ব পড়ল অভিষেকের উপর। কিন্তু কার উপরে এই লুক তৈরি করা যেতে পারে? টলিউডের নানা শিল্পীর নাম নিয়ে আলোচনা শুরু হল। যাকে বলে ‘কাস্টিং’। সবদিক থেকে মনে হল শন বন্দ্যোপাধ্যায় এই কাজটি সবথেকে ভালো সামলাতে পারবেন। প্রস্তাব শুনে শনও রাজি। এবার শুরু হল প্রস্তুতি।
শনকে একেবারেই উত্তমকুমারের মতো দেখতে নয়। তাই সেই মিল খোঁজা অনর্থক। মহানায়কের হাসি, চাহনি, চুলের স্টাইল, পোশাকের ধরন এসবই ফ্যাশন শ্যুটে পুনর্নির্মাণ করার আগে আলোচনা চলল রূপটান শিল্পী অভিজিৎ দাসের সঙ্গেও। চুল কি ব্যাকব্রাশ করা হবে? কপালের কতটা অংশ দেখা যাবে? কতটুকু মেকআপের প্রয়োজন? এসব নিয়ে মত বিনিময়ের পর ধীরে ধীরে মহানায়ককে শ্রদ্ধা জানাতে প্রস্তুত হলেন শন।
বাঙালি ভদ্রলোক বলতেই চোখের সামনে যে ছবিটা ভেসে ওঠে, সেটা উত্তমকুমারের। আটপৌরে ধুতি, পাঞ্জাবিতে সেজে তৈরি মহানায়ক। শনের জন্যও অভিষেক বেছে নিয়েছিলেন অফহোয়াইট পাঞ্জাবি। গলায় এবং কাঁধে লাল সুতো দিয়ে নকশা করা। ধুতির পাড়েও লালের ছোঁয়া। সাবেকি নকশা রয়েছে সেখানেও। এই পোশাক পরলেই কি উত্তমকুমার হয়ে ওঠা যায়?
‘না! একেবারেই নয়’, বলছিলেন অভিষেক। ‘মহানায়কের কাছাকাছি পৌঁছানোর যোগ্যতা আমাদের নেই। আমরা ওঁর লুক থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে রিক্রিয়েট ভার্সন তৈরি করার চেষ্টা করেছি। আর বাঙালি তো কথাতেই বলে, ‘তোমাকে উত্তমকুমারের মতো লাগছে’— নিজের ভাবনা শেয়ার করলেন ডিজাইনার। ধুতি, পাঞ্জাবিতে শন যখন এসে দাঁড়ালেন ক্যামেরার সামনে সেই চেষ্টাই যেন সার্থক মনে হল। হাসি, চোখের চাহনি— কোথাও অনুকরণের কোনো চেষ্টা নেই। বরং এ এক অন্য রকমের শ্রদ্ধাঞ্জলির প্রচেষ্টা।
ব্যক্তিগত সম্পর্কে সুপ্রিয়া দেবীর নাতি শন। বাড়িতে মহানায়কের নানা গল্প শুনে বড়ো হয়েছেন তিনি। ‘ক্লাসিক বাঙালি পুরুষ বলতে যা বোঝায়, উত্তমকুমার তাই ছিলেন। আম্মা, মানে আমার দিদিমা ও মায়ের কাছে সে গল্পই শুনেছি। বিশেষত কাজের প্রতি ওঁর নিষ্ঠা শেখার মতো,’ বলতে বলতে শন যেন ফিরে গেলেন সেই পুরনো দিনে। ‘জানেন, উত্তমকুমারকে ‘ফ্লপ মাস্টার’ বলে ডাকা হত। একের পর এক ছবি ফ্লপ করেছিল। সব প্রযোজনা সংস্থা থেকে বাদ পড়েছিলেন। ‘এত ফ্লপ তোমার, তুমি নায়ক হবে!’— এসব কথাও শুনতে হয়েছিল। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো সহজ ছিল না,’ শনের কথার সূত্র ধরেই অভিষেক ব্যাখ্যা করলেন, ‘আমরা সাফল্য দেখি, কিন্তু জার্নিটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটার খোঁজ রাখি না।’
ধুতি, পাঞ্জাবিতে শন একের পর এক পোজ দিচ্ছেন। তার মাঝেই চলছে আড্ডা। হেসে বললেন, ‘আমাদের তো কথাতেই আছে, ‘উত্তমের মতো তাকাও।’ ‘উত্তমের মতো হাঁটো...।’ আমি তো এও শুনেছি, বহু নায়ক ওঁকে নকল করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু নকল করা কখনো সম্ভব নয়।’ মডেলিং এবং অভিনয়— দু’ধরনের কেরিয়ারেই শন বুঝেছেন, কাজের মধ্যে নিজস্বতার ছাপ থাকা জরুরি। উত্তমকুমারও নিজস্ব স্টাইল স্টেটমেন্ট তৈরি করেছিলেন। তাই আজও তিনি বাঙালির আইকন।
পরের লুকের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে মহানায়কের ‘নায়ক’ ছবিটি। যেভাবে তিনি চুল আঁচড়াতেন তেমন কয়েকটা মুড শট তোলা হল। শনের পাশে দাঁড়িয়ে অভিষেক বললেন, ‘আসলে ‘নায়ক’-এর ক্যারিশমা একেবারে আলাদা। আমরা সেটা টান্সফর্ম করার চেষ্টা করলাম। আমার মনে হয়েছিল শনের মধ্যে সেই ব্যাপারটা রয়েছে। ও এটা পারবে।’
আম্মার কাছে শোনা ‘নায়ক’-এর একটা অন্য গল্প বললেন শন। ‘আমি শুনেছি ওই ছবিটা দেখে হলিউড থেকে এলিজাবেথ টেলর উত্তমকুমারের সঙ্গে কাজ করতে চেয়েছিলেন। মুম্বইতেও তখন এটা খুব একটা শোনা যেত না। বাংলার জন্য এই ঘটনা সত্যিই গর্বের। আম্মা উত্তমকুমারকে নিয়ে সবসময় গর্ব করতেন। খুব প্রশংসা করতেন। ওঁর নিষ্ঠা, নিয়মানুবর্তিতার কথা বলতেন। আমার শুনতে ভালো লাগত।’ কিংবদন্তির গল্পের ভিড়ে ছোটোবেলা কেটেছে শনের। সেই নস্টালজিয়াতেই যেন ফিরে গেলেন তিনি।
মহানায়ক ছিলেন খাদ্যরসিক। সুপ্রিয়া দেবীর হাতে তৈরি নানা রেসিপি তাঁর পছন্দ ছিল। সুপ্রিয়া দেবীর তৈরি এমন কোনো খাবার রয়েছে কি যেটা মহানায়ক পছন্দ করতেন, আবার শনেরও পছন্দ? অকপটে শন জানালেন, সেই বিশেষ পদটি হল, চিংড়ির মালাইকারি। আম্মার প্রয়াণের পর সেই স্বাদ যেন হারিয়ে গিয়েছে।
খাদ্যরসিক উত্তমের এক অজানা দিকের গল্প শোনালেন শন। এও তাঁর আম্মার কাছেই শোনা। ‘এত ভালো মাছের কাঁটা বেছে খেতেন, যে দেখার মতো। ইলিশ মাছের কাঁটা বাছতেন, অথচ আঙুলের সামনের অংশটুকু এঁটো হত। বাকি আঙুল পরিষ্কার থাকত ওঁর। সব কাজেই এতটা নিখুঁত ছিলেন তিনি।’
গল্পে আড্ডায় ফ্যাশনের শ্যুটিং তখন শেষের পথে। কিন্তু এই প্রচেষ্টা যেন শেষ হয়ে হইল না শেষ। উত্তমকুমার আসলে এক মহাসমুদ্রের নাম। যাঁর শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। তিনি অনন্ত। যাঁকে প্রতিদিন নতুন করে আবিষ্কার করে আপামর বাংলার দর্শক। যাঁর প্রতিটি কাজ বারংবার নতুন করে দেখা যায়। বাঙালির মননে, চিন্তনে, যাপনে উত্তম অমর।
স্বরলিপি ভট্টাচার্য