সবাই থেকেও যেন কেউই নেই! দশভুজার দর্শনে সুখ-স্মৃতিতে ডুব দেন অসহায় বৃদ্ধা
  • ১৬ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: আজও পুজো মণ্ডপের সামনে দাঁড়ালেই ফুটফুটে সন্তানের কথাগুলো কানে বাজে সুমিত্রা হালদারের। বয়সের ভারে তিন এখন ন্যুব্জ। দুই ছেলের এখন ভরা সংসার। দু’জনেই বাইরে। বাড়িতে নিজের সঙ্গেই নিজের যাপন। যাকে বলে নিঃসঙ্গ। তারউপর রোগভারে জর্জরিত। একটি সমাজসেবী সংস্থার দৌলতে বেশ কয়েকবছর প্যান্ডেল, প্রতিমা দর্শন করে আসছেন সুমিত্রাদেবী। তাতে ভালোলাগার চেয়ে খারাপলাগা বেশি। আসলে, অতীত বড্ড বেশি নির্মম! 

Advertisement

প্যান্ডেলের সামনে দাঁড়ান সুমিত্রাদেবী। দু’চোখ ভরে দশভুজাকে দর্শন করেন। চিবুক বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। মনে পড়ে যায় পুরনো কথা। তখন পুরোদস্তুর বধূ তিনি। পুজোর চারদিন মানেই আনন্দ আর আনন্দ। সন্ধ্যা নামার আগেই দুই সন্তানের হাত ধরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়া। সঙ্গে স্বামী। একটা পর একটা প্যান্ডেলে ঢুঁ মারা। দূরন্ত ছেলেদের নানা বায়না সামলোনা। তাদের মুখে আধো আধো নানা কথা—মা, ওই যে ভুঁড়িওয়ালা গণেশের পাশে বউয়ের সাজে যিনি দাঁড়িয়ে রয়েছেন তিনি কে? সুমিত্রাদেবী জবাব দিতেন, উনি হলেন কলাবউ। অনেকে গণেশের বউও বলে। মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ছেলেরা আবার জানতে চাইত, ময়ূরের উপর ওই লোকটা চেপে রয়েছে কেন? ময়ূরের তো কষ্ট হচ্ছে। মা, তুমি লোকটাকে বলো না নেমে যেতে। বলেই ভিড়ের মধ্যে দৌড় দিত দুই সন্তান। সুমিত্রাদেবী স্বামীর উপর মুখঝামটা দিয়ে চেঁচিয়ে উঠতেন—‘দেখতে পাচ্ছ না, ছেলেগুলো কোথায় চলে গেল? এত ভিড়ে হারিয়ে যাবে তো!’ 
সেই দাপুটে বধূ, সন্তান বৎসল্য মা সুমিত্রাদেবী আজ ৭০ বছরের বৃদ্ধা। পার্বতীর চোখে চোখ রাখলে স্মৃতি উথলে ওঠে সেদিনের। তখন তিনি মনে মনে হাসেন, আবার সবার আড়ালে কাঁদেনও। যে ছেলেদের হাত ধরে তিনি প্যান্ডেল ঘোরাতেন, ঠাকুর দেখাতেন, আজ তাঁরই হাত ধরার কেউই নেই! জীবনের চাকা গড়াচ্ছেন একাই। একযুগ আগে স্বামীকে হারিয়েছেন। এখন চেয়েচিন্তে কোনওরকমে দিন গুজরান করেন। 
বৃহস্পতিবার ছিল মহাপঞ্চমী। ওই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সৌজন্যে আরও অনেক অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধার সঙ্গে পুজো দেখতে বেরিয়েছিলেন সুমিত্রাদেবী। বর্ধমানের একটি প্যান্ডেলের সামনে দাঁড়িয়ে আঁচলে চোখ মুছে তিনি বলছিলেন, ‘সে একটা দিন ছিল। পুজোর সময় তিন-চারটে নতুন শাড়ি এনে দিতেন স্বামী। কখনও কখনও আমিও পছন্দ করে কিনতাম। ছেলেদের জন্য নতুন জামাপ্যান্ট। ষষ্ঠীর দিন থেকেই চারজন বেরিয়ে পড়তাম ঠাকুর দেখতে। রথতলা থেকে শুরু করতাম। আমার দু’টো ছেলেই খুব দুষ্টু ছিল। ওদের সামলাতে হিমশিম খেয়ে যেতাম। তারমধ্যেও দারুণ এক আনন্দ উপভোগ করতাম। ঘুরতে ঘুরতে কখন যে রাত পেরিয়ে ভোর নামত, বুঝতেই পারতাম। সেই দিনগুলি আজও বড্ড টানে।’ স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্তা প্রলয় মজুমদার বলছিলেন, ‘সুমিত্রাদেবীর মতো অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের পুজো দেখানোর ব্যবস্থা করি প্রতি বছর। এবার প্রায় ১৫০ জন আমাদের দলে রয়েছেন। প্যান্ডেলের সামনে ওঁদের হাসি দেখলে একটা ভালোলাগা ঘিরে ধরে।’ 
সুমিত্রাদেবীরও ভালোলাগে। তবে, সেই ভালোলাগার সঙ্গে জুড়ে যায় কান্নাভেজা চোখ। তখন আবছা লাগে দশভুজাকে। কপালে দু’হাত ঠেকিয়ে মনে মনে বলেন—‘ছেলে-বউমা ও নাতি-নাতনিদের ভালো রেখো মা।’