সংবাদদাতা, বিষ্ণুপুর: ময়নাপুরে দেওয়ানবাড়ির ৩৭১বছরের প্রাচীন পুজোয় দ্বিভুজা অভয়ারূপে পূজিতা হন মা দুর্গা। সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত শালকাঠ ও ঘি দিয়ে যজ্ঞকুণ্ড জ্বালানো হয়। একহাজার আটটি বেলপাতা সহযোগে পূর্ণ আহুতি দেওয়া হয়। এই পুজোর আরও এক বৈশিষ্ট্য হল, এখানে দশমীর বদলে ভাইফোঁটার দিন প্রতিমা নিরঞ্জন হয়।
ময়নাপুরের দেওয়ানবাড়ির পূর্বপুরুষ শরোত্তর রায় বর্ধমানের বীজপুরে জন্মেছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি বর্ধমান রাজার দেওয়ান নিযুক্ত হন। তখন বিষ্ণুপুর করদ রাজ্য ছিল। কর না দেওয়ায় বর্ধমানের রাজা বিষ্ণুপুরের রাজাকে চিঠি লেখেন। সেই চিঠির প্রত্যুত্তরে বিষ্ণুপুরের রাজা কিছু না লিখে সাদা চিঠি পাঠান। এতে বর্ধমানের রাজা ক্ষুব্ধ হয়ে বিষ্ণুপুর আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সেই সময় শরোত্তম রায় সাদা চিঠি পাঠানোর রহস্য উদ্ঘাটনে নামেন। তিনি জানতে পারেন, বিষ্ণুপুরে ওই সময় দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। সেজন্য কর দেওয়া সম্ভব হয়নি। বিষয়টি বর্ধমানের রাজাকে বুঝিয়ে বলে বিষ্ণুপুরকে আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করেন তিনি। তখন থেকে শরোত্তর রায়ের সঙ্গে বিষ্ণুপুরের রাজার সখ্যতা গড়ে ওঠে। বিষ্ণুপুরের রাজার এক দেওয়ান নিধিকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে শরোত্তম রায় মেয়ের বিয়েও দেন। এরপরই মল্লরাজা শরোত্তর রায়কে ৬৫টি মৌজার অধিকারী করে দেন। তার মধ্যে ময়নাপুর ছিল। তখন থেকে ময়নাপুরে এই পরিবার বসবাস শুরু করে। ১৬৫৩সালে প্রথম তালপাতার ছাউনির নীচে পুজো শুরু করেন শরোত্তম রায়।
পরিবারের সদস্যরা জানান, শরোত্তর রায় প্রথম বছরেই পুজো দেখতে আসার জন্য মল্লরাজাকে নিমন্ত্রণ করেন। কিন্তু তিনি কোনো কারণে আসতে পারেননি। রাজামশাইয়ের অপেক্ষায় দশমী পেরলেও মণ্ডপে মূর্তি রেখে দেওয়া হয়। একদিন দু’দিন করে কালীপুজো পার করে দেন। সেই খবর পেয়ে মল্লরাজা না আসতে পারার জন্য আক্ষেপ বার্তা পাঠান। এরপর ভাইফোঁটার দিন প্রতিমা বিসর্জন করা হয়। সেই থেকে ভাইফোঁটায় প্রতিমা নিরঞ্জনের রীতি রয়েছে।
পরিবারের সদস্য নীলাদ্রিশেখর রায়, সাত্ত্বিক রায় বলেন, মল্লরাজাদের অনুকরণে জিতাষ্টমীর দিন থেকে দেওয়ানবাড়িতে পুজো শুরু হয়ে যায়। ওইদিন থেকেই ভোগ রান্না করে গ্রামবাসীদের বিতরণ করা হয়। নবমী পর্যন্ত তা চলবে। সন্ধিক্ষণে ছাগ বলি হয়। আমাদের পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকেন। তবে পুজোর সময় প্রায় সবাই বাড়ি ফেরেন।
রায় পরিবারের পুত্রবধূ কলকাতা নিবাসী সীমা রায় বলেন, আমাদের মা দ্বিভুজা অভয়া মূর্তিতে পুজো পান। মায়ের ঘট পালকিতে আনা হয়। দশমীর দিন নাড়ু, কড়ি, মিষ্টি, আলতা, সিঁদুর সহযোগে ঠাকুরানীপুকুরে ঘট বিসর্জন দেওয়া হয়।



