সংবাদদাতা, নবদ্বীপ: আজ নবদ্বীপের ঐতিহ্যবাহী রাস উৎসব। শহরের বিভিন্ন মণ্ডপ ও মঠ মন্দির সেজে উঠেছে। তবে এবারও প্রতিমা নিয়ে দু’ দিন শোভাযাত্রা অর্থাৎ আড়ং ও একদিন কার্নিভাল হলেও অতিরিক্ত বাজনা সহকারে নবমী পুজো করা যাবে না। প্রতিটি বারোয়ারি থেকে বাজনা সহ তিন থেকে পাঁচজন করে সদস্য পুজো দিয়ে যেতে পারবেন। মঙ্গলবার দুপুরে নবদ্বীপ থানায় রাস উৎসবের কৃষ্ণনগর পুলিশ জেলার পক্ষ থেকে গাইড ম্যাপ প্রকাশ করেন পুলিশ সুপার অমরনাথ কে। তিনি বলেন, এই ম্যাপে কোন কোন রাস্তা নো এন্ট্রি, কোথায় কোন প্রতিমা, কোন রাস্তা দিয়ে শোভাযাত্রায় যাবে, এ সবকিছুই দেখানো থাকছে। এছাড়া প্রতিমা লাইসেন্সের সঙ্গে থাকছে কিউ আর কোড। তাতে বোঝা যাবে কোন পুজো আর কোন বারোয়ারি, লাইসেন্স আছে কি না। এছাড়া আটশোর বেশি ভলান্টিয়ার পাওয়া যাবে। প্রতিটা বারোয়ারি থেকে পাঁচ জন করে সিভিক ভলান্টিয়ার পাচ্ছি। এনসিসি, সিভিক ভলান্টিয়ার, পুলিশ ফোর্স সবমিলিয়ে ৩ হাজার কর্মী থাকবে। যেহেতু রাস্তাঘাট সংকীর্ণ, সেজন্য কিছু রাস্তায় ট্রাফিক চলাচলে থাকছে বিধি নিষেধ। এছাড়া ফেরিঘাটগুলিতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছ। কিছু কিছু জায়গায় ওয়াচ টাওয়ার থাকবে, সেখান থেকে আমরা পুজোর মুভমেন্ট নজর করতে পারব। নবদ্বীপ থানা এলাকায় চারশোর বেশি পুজো হয়।
রাস উপলক্ষ্যে নবদ্বীপে বৈষ্ণব, শাক্ত ও শৈব মতে বিভিন্ন দেবদেবীর পুজো হয়। যেমন, মহাপ্রভু, রাধাকৃষ্ণের চক্ররাস, পার্থসারথি, যুগলমিলন তেমনি, কৃষ্ণকালী, রণকালী, বামাকালী, ভুবনেশ্বরী, কমলেকামিনী, গণেশ জননী। সুপ্রাচীন উল্লেখ্যযোগ্য প্রতিমার মধ্যে এলানিয়া কালী, তেঘড়িপাড়ার বড়শ্যামা, ভড়পাড়ার মেজ শ্যামা, আমপুলিয়া পাড়া ও ব্যাদরা পাড়ার শবশিবা, দণ্ডপাণিতলার মুক্তকেশী, হরিসভাপাড়া ও চারিচারা বাজারের ভদ্রকালী, গাড়ালপাড়া বিন্ধ্যবাসিনী, পোড়ামাতলার কাঁসারি কালী, জোড়া বাঘ গৌরাঙ্গিনী, আমড়াতলার মহিষমর্দিনী।
নবদ্বীপ পুরসভার চেয়ারম্যান বিমানকৃষ্ণ সাহা বলেন, বহিরাগত পুণ্যার্থীদের থাকার জন্য শ্রীবাস অঙ্গন, ফাঁসিতলা এবং পোড়াঘাটে অস্থায়ী অস্থায়ীভাবে ৩টি যাত্রীনিবাস তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া রেল রিক্রিয়েশন ক্লাবের মাঠ, মণিপুর, দেয়ারা পাড়া ঘাট সব মিলিয়ে ৮টি অস্থায়ী শৌচাগার করা হয়েছে। নবদ্বীপের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন জায়গায় ৮টি স্বাস্থ্যশিবির করা হয়েছে। দিনে তিনবার পানীয় জল বাড়ি বাড়ি দেওয়া হয়। এরপরও যদি কোথাও জলের কোনও সমস্যা হয়, সেখানে জলের ট্যাঙ্ক পৌঁছে যাবে। এছাড়া পুর এলাকার মোড়ে মোড়ে স্বেচ্ছাসেবক থাকবে। নবদ্বীপধাম স্টেশন ম্যানেজার হরিদাস সরকার বলেন, রাস পূর্ণিমা উপলক্ষ্যে যাত্রীদের ভিড় সামলাতে পূর্ব রেলের পক্ষ থেকে ব্যান্ডেল-কাটোয়া শাখায় বিশেষ একজোড়া বাড়তি ট্রেন চালানো হবে। বুধবার ও বৃহস্পতিবার এই দু’ দিন ট্রেন চলবে। অতিরিক্ত টিকিট কাউন্টার, মেডিকেল ক্যাম্প থাকছে। ডাউন ট্রেনগুলি ১ নম্বর প্লাটফর্ম দিয়ে যাবে। আপ গাড়িগুলি তিন নম্বর প্লাটফর্মে আসবে। এছাড়া ১ ও ৪ নম্বর প্লাটফর্মে লিফট, ১, ২ ও ৩ প্লাটফর্মে এস্কেলেটরের ব্যবস্থা থাকছে। ব্যান্ডেল থেকে দুপুর ২ টোর সময় ট্রেন ছাড়বে, নবদ্বীপে আসবে ৩-১৫ মিনিট। এখান থেকে ট্রেন ৩-১৭ মিনিট নাগাদ ছেড়ে কাটোয়া পৌঁছবে ৪-১০ মিনিটে। আবার কাটোয়া থেকে ছাড়বে সন্ধ্যা ৬-২০ মিনিটে নবদ্বীপে আসবে ৭-০৪ মিনিট নাগাদ। তারপর নবদ্বীপ থেকে ব্যান্ডেলের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাবে ৭-০৬ মিনিটে। ব্যান্ডেলে পৌছাবে, ৮-৩০মিনিট নাগাদ। নবদ্বীপের রাস নিয়ে দীর্ঘদিন চর্চা করা শান্তিরঞ্জন দেব জানান, দ্বাপর যুগে বৃন্দাবনে রাস শুরু হয়েছিল। নবদ্বীপের রাস বৃন্দাবনের মতো শারদ পূর্ণিমায় হয় না, বদলে কার্তিকী পূর্ণিমায় হয়। অন্যদিকে জানা যায় মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সময় থেকে নবদ্বীপের রাস সমাজ বিকাশের স্বাভাবিক ধারা অনুযায়ী পালিত হতে থাকে। সময়টা ১৭৫২ খ্রিস্টাব্দ। প্রথম পুজো এলেনিয়া কালী। নবদ্বীপের রাস হল আদতে শাক্ত রাস। ইতিমধ্যে ১৬৫০ খ্রিস্টাব্দ কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ মায়ের মূর্তি গড়ে পুজো শুরু করে পথ দেখান।