স্বস্তিনাথ শাস্ত্রী
স্বস্তিনাথ শাস্ত্রী
‘করুণার সিন্ধু তুমি, সেই জানে মনে
দীন যে, দীনের বন্ধু!...’
—মাইকেল মধুসূদন দত্ত
আজ বিদ্যাসাগর ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১০৬তম জন্মদিবস। দিকে দিকে দিনটি উদযাপন হবে নানা অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে। জ্ঞানীগুণী মানুষরা তাঁকে নিয়ে নানা কথা বলবেন। আম জনতা তা শুনতে ভিড় করবেন। শুনে হাততালিও দেবেন। রাজনৈতিক নেতা থেকে অভিনেতা, সবাই ফেসবুকে প্রণাম জানিয়ে পোস্ট করবেন। এসব প্রতিবছরই হয়, এবছরও হবে। কিন্তু একবারও কি কেউ ভেবে দেখবেন, বিদ্যাসাগরের জীবন, তাঁর চরিত্র থেকে আমরা কী শিখলাম! কিছু কি আদৌ শিখলাম? আমাদের চারপাশে ঘটে চলা নানা ঘটনা বলে দিচ্ছে, না, আমরা প্রায় কিছুই শিখিনি। আমরা এতদিন ধরে শুধুই তাঁর ছবিতে ফুলমালা দিয়ে পুজো করেছি।
বিদ্যাসাগর জন্মেছিলেন ১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর আর তিনি প্রয়াত হন ১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই। অর্থাৎ ঊনবিংশ শতকেই তাঁর জন্ম এবং মৃত্যু। আজ আমরা দাঁড়িয়ে আছি একবিংশ শতকে। চলতি বছরেরই ৩১ জুলাইয়ের একটি ঘটনা উল্লেখ করলে বোঝা যাবে কীভাবে আমরা বিদ্যাসাগরের সমস্ত শিক্ষাকে অমান্য করে চলেছি প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত। ওইদিন দুর্গাপুরের গ্যামন ব্রিজে কয়েকজন স্বঘোষিত গোরক্ষক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দুই ব্যক্তিকে শারীরিক হেনস্তা করে। ওই দু’জনের ‘অপরাধ’ তাঁরা একটি পিক আপ ভ্যানে করে ছ’টি গোরু নিয়ে যাচ্ছিলেন। গোরুগুলি তাঁরা বাঁকুড়ার আসুরিয়া বাজার থেকে কিনেছিলেন চাষের কাজে লাগাবেন বলে। কিন্তু এক রাজনৈতিক নেতা ও তাঁর অনুগামীরা তাঁদের গোরু পাচারকারী বলে দড়ি দিয়ে বেঁধে কান ধরে ওঠবোস করায়। ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি দিতে বলে। ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল যে, ওই সংখ্যালঘু দুজন নেহাতই নিরীহ মানুষ। তাঁদের উপর এরকম অত্যাচার তো মানবতার অপমান। বিদ্যাসাগর কোনওদিন ধর্মকে মানবতার উপরে স্থান দেননি। ওই মহান মানুষটির জীবনের কিছু ঘটনার কথা জানলেই তা বোঝা যায়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যার সাগর ছিলেন তো বটেই, কিন্তু তিনি যে বিপুল খ্যাতি পেয়েছিলেন তাঁর জীবদ্দশাতেই, তা তাঁর পাণ্ডিত্যের কারণে নয়। মানুষের প্রতি তাঁর অপরিসীম শ্রদ্ধা আর ভালোবাসাই তাঁকে সকলের কাছে আরাধ্য করে তুলেছিল। তাঁর যখন মাত্র ৪০ বছর বয়স, সেই সময়েই খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে তাঁর ছবি বিক্রি করা হতো। সাধারণ মানুষের কাছে তাঁর এই খ্যাতির একমাত্র কারণ ছিল, কারও দুঃখ দেখলে তিনি স্থির থাকতে পারতেন না। জাত, ধর্ম বিচার না করে দীনদুঃখী মানুষকে সাহায্য করতে এগিয়ে যেতেন। তাই মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁকে করুণার সিন্ধু বিশেষণে ভূষিত করেছিলেন। মধুসূদন স্বয়ং সেই করুণার স্পর্শ পেয়েছিলেন তাঁর জীবনে। মানুষের অসহায়তা বিদ্যাসাগরকে বিচলিত করত। দীন, দুঃখী মানুষকে সাহায্য করতে গিয়ে কখনওই তিনি তাঁদের ধর্ম, তাঁদের জাত বিচার করতে বসতেন না। একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করা যাক। ১৮৬৮ সালে বিদ্যাসাগর একবার অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তখন স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্য বর্ধমানে যাওয়াই ছিল রেওয়াজ। তিনিও তাই করেছিলেন। কিছুকাল বর্ধমানে ছিলেন। সেই সময়ে কমলসায়রের পাশে বর্ধমানের মহারাজাদের একটি মনোরম বাগানবাড়ি ছিল। বিদ্যাসাগর সেই বাড়িতেই উঠেছিলেন। কমলসায়রের চারপাশে তখন বহু দরিদ্র মুসলিম পরিবারের বাস। ওই পরিবারের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের বিদ্যাসাগর প্রতিদিন সকালে জলখাবার খাওয়াতেন। অনেক পরিবারকে টাকা দিতেন খাবারদাবার ও জামাকাপড় কেনার জন্য। ওই পরিবারগুলি বিদ্যাসাগরকে তাঁদের বাবার স্থান দিয়েছিলেন। তাঁকে মান্য করতেন, ভালোবাসতেন। সেখানকার একটি গরিব মুসলিম পরিবারের মেয়ের বিয়ের খরচাও বহন করেছিলেন বিদ্যাসাগর।
১৮৯১ সালের জুলাই মাস নাগাদ বর্ধমানে ম্যালেরিয়া ছড়িয়ে পড়েছিল মহামারীর আকারে। বিদ্যাসাগর প্রশাসনকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিলেন। কিন্তু তা করেই তিনি ক্ষান্ত রইলেন না। তিনি নিজের পয়সায় ওষুধপথ্য ও ডাক্তার নিয়ে চলে গেলেন বর্ধমানে। সেখানে তথাকথিত নিচুজাতির মানুষদের সেবায় লেগে গেলেন। ‘সঞ্জীবনী’ পত্রিকায় লেখা হয়েছিল, বিদ্যাসাগর গাড়িতে বসে রয়েছেন, হয়তো একটি মুসলিম বালক তাঁর কোলে বসে খেলা করছে।
মহাম্মদ রেয়াজুদ্দিন আহমেদ নামে এক কিশোর ঢাকা থেকে বিদ্যাসাগরকে এক পত্র লিখেছিলেন। সেই পত্রে তিনি বিদ্যাসাগরের ‘বোধোদয়’ বইয়ের কয়েকটি ভুল উল্লেখ করেছিলেন। নিতান্তই অল্পবয়সের খেয়ালে তিনি সেই চিঠি লিখেছিলেন। কিন্তু তিনি আশ্চর্য হয়ে যান যখন দেখেন, বিদ্যাসাগর সেই চিঠির উত্তর তাঁকে দিয়েছেন এবং তিনি যে ভুলগুলি উল্লেখ করেছিলেন সেগুলি স্বীকার করে নিয়েছিলেন। কিন্তু এখানেই এই ঘটনার শেষ নয়। রেয়াজুদ্দিন অবাক হয়ে গিয়েছিলেন, যখন তিনি দেখলেন ‘বোধোদয়’-এর পরবর্তী সংস্করণে তাঁর নাম উল্লেখ করে সেই ভুলগুলি শুধরে দেওয়া হয়েছিল। এরপর বড় হয়ে যুবক রেওয়াজুদ্দিন কলকাতায় বিদ্যাসাগরের সঙ্গে দেখা করতে এসে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন এই দেখে যে, তাঁর চিঠিটি বিদ্যাসাগর যত্ন করে রেখে দিয়েছেন। যিনি কাউকে দশ মিনিটের বেশি সময় দিতেন না, তিনি প্রায় ঘণ্টাখানেক রেওয়াজুদ্দিনের সঙ্গে কথা বলেছিলেন এবং ফের আসতে বলেছিলেন।
ধর্ম, আচারবিচার কখনওই বিদ্যাসাগরের সমাজ সংস্কারের কাজে বাধার পাঁচিল হয়ে দাঁড়ায়নি। বস্তুত, তিনি ধর্মীয় আচারবিচারকে কখনওই মাথায় তোলেননি। তাঁর দর্শনের অধ্যাপক জয়গোপাল তর্কালঙ্কার প্রতিবছর সরস্বতী পুজোর দিন ছাত্রদের দেবী সরস্বতীর ওপর একটি শ্লোক রচনা করে আনতেন বলতেন। বিদ্যাসাগর কোনওদিনই তা লিখতেন না। কিন্তু একবছর শিক্ষকের অনুরোধ এড়াতে পারলেন না। লিখলেন—
‘‘লুচি কচুরী মতিচুর শোভিতং
জিলেপি সন্দেশ গজা বিরাজিতম।
যস্যাঃ প্রসাদেন ফলারমাপ্নুমঃ
সরস্বতী সা জয়তান্নিরন্তরম।’’
সরস্বতীকে নিয়ে এই মজাদার শ্লোক পড়ে অবশ্য তাঁর শিক্ষক খুশিই হয়েছিলেন।
বিদ্যাসাগর ছিলেন গোঁড়া ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান। নিজেও শাস্ত্রজ্ঞ ছিলেন। সেই বিদ্যাসাগরই সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ থাকাকালীন বেদান্ত ও সাংখ্য দর্শনকে ভ্রান্ত দর্শন বলেছিলেন। আজ কেউ এই কথা সাহস করে বললে তাঁর বিরুদ্ধে হয়তো একশো একটা রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা হয়ে যাবে। বিদ্যাসাগরের বাধাতেই সংস্কৃত কলেজে বেদান্ত ও সাংখ্য দর্শনকে সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অথচ এই একবিংশ শতকে স্কুলের সিলেবাস থেকে ডারউইনের তত্ত্ব, গণতন্ত্রের সংজ্ঞা বাদ হয়ে যাচ্ছে! নিজে হিন্দুশাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও বিদ্যাসাগর বরাবর পাশ্চাত্য শিক্ষার উপর জোর দিয়েছেন। তিনি চাইতেন আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠুক আগামী প্রজন্ম। অবাক লাগে যখন দেখি, বিদ্যাসাগরের এই চিন্তাভাবনার বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে আইআইটি মাদ্রাজের জনৈক ডিরেক্টর বলেন, গোমূত্রে নানাবিধ ওষধিগুণ রয়েছে। এটি ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক নাশক এবং হজমে সহায়ক। তাঁর এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন একাধিক বিজ্ঞান সংগঠন ও শিক্ষক সংগঠনের সদস্যরা। এখানেই শেষ নয়, আইআইটি মান্ডির একজন ডিরেকটর আরও এককাঠি সরেস। তিনি দাবি করেছিলেন, হিমাচল প্রদেশবাসীদের মাংস খাওয়ার অভ্যাসের জন্যই নাকি বারবার ধস নামছে, প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটছে। হিমাচল জ্ঞান বিজ্ঞান সোসাইটির সম্পাদক থেকে শুরু করে আরও বহু বিজ্ঞান সংগঠনের সদস্যরা তাঁর এই বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। বিদ্যাসাগর চেয়েছিলেন সমাজকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে আর আমাদের দেশ এখন যেন ক্রমশ পিছন দিকে চলেছে।
এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের একটি বক্তব্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বিদ্যাসাগরের শিক্ষা ও সমাজ সংস্কার সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘যে জাতি মনে করে বসে আছে যে অতীতের ভাণ্ডারের মধ্যেই তার সকল ঐশ্বর্য, সেই ঐশ্বর্যকে অর্জন করবার জন্য তার স্বকীয় উদ্ভাবনার কোনো অপেক্ষা নেই, তা পূর্বযুগের ঋষিদের দ্বারা আবিষ্কৃত হয়ে চিরকালের মতো সংস্কৃত ভাষায় পুঁথির শ্লোকে সঞ্চিত হয়ে আছে, সে জাতির বুদ্ধির অবনতি হয়েছে, শক্তির অধঃপতন হয়েছে।’ আজ চারিদিকে তাকিয়ে মনে হয়, সত্যিই আমাদের বুদ্ধির অবনতি হয়নি তো? বিদ্যাসাগরের থেকে আমরা কিছুই কি শিখিনি?