প্রীতম দাশগুপ্ত: ১১ বছর অতিক্রান্ত। দেশ যে তিমিরে ছিল, এখনও সেখানেই আছে। ২০১৪ সালে রাজধানী দিল্লির কনট প্লেসে জাতি হিংসার বলি হয়েছিলেন অরুণাচল প্রদেশের ২০ বছরের তরুণ ছাত্র নিডো তানিয়াম। ঘটনার পর দেশজুড়ে হইচই কম হয়নি। ১১ বছর পরে ২০২৫ সালে উত্তরাখণ্ডে সেই একই ধরনের হিংসার বলি ত্রিপুরার ২৪ বছরের তরুণ অ্যাঞ্জেল চাকমা। ১৭ দিন যমে-মানুষে টানাটানির পর গত ২৬ ডিসেম্বর মারা গিয়েছেন উত্তর-পূর্বের এই ঝকঝকে তরুণ। সেই ঘটনার পর ফের উত্তাল দেশ।
২০১৪ সালে নিডোর মৃত্যুর পরেই দেশের অন্যান্য অংশে বসবাসকারী উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষের উদ্বেগ ও সমস্যাগুলি সমাধানের লক্ষ্যে এম পি বেজবড়ুয়া কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি জাতিগত বৈষম্য মোকাবিলার জন্য একটি বিশেষ আইন প্রণয়নের সুপারিশ করেছিল। কিন্তু এখনও পর্যন্ত সেই আইন কার্যকর হয়নি। কেন হয়নি? উত্তর অজানা। তবে মনে করাই যায়, জাতি ও বর্ণের প্রশ্নে আম আদমির এক ধরনের অস্বস্তির কারণেই তা বাস্তবায়িত হয়নি। আসলে তেমন জোরালো দাবিই ওঠেনি যাতে সরকার আইন করতে বাধ্য হয়। তবে এবার এই ধরনের আইন প্রণয়নের জোরালো দাবি উঠেছে। জাতিগত আক্রমণ প্রতিরোধে নির্দেশিকা প্রণয়নের জন্য আদালতের হস্তক্ষেপ চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অনুপ প্রকাশ অবস্থি ওই মামলা দায়ের করেছেন। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারতীয় ন্যায় সংহিতা সহ নতুন অপরাধ বিষয়ক আইনগুলির প্যাকেজ আনা হয়েছে। কিন্তু সেগুলিতে বিদ্বেষজনিত অপরাধ, জাতিগত বৈষম্য এবং ভারতীয় নাগরিকদের বিরুদ্ধে হিংসার বিষয়টি (বিশেষ করে উত্তর-পূর্বের মানুষের ক্ষেত্রে) প্রায় কোনও গুরুত্বই পায়নি। বলা হয়েছে, অ্যাঞ্জেল চাকমার খুন কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আবেদনকারীর মতে, এই বিদ্বেষজনিত অপরাধকে এখনও একটি সাধারণ অপরাধ হিসেবেই দেখা হয়।
আবেদনে বলা হয়েছে, অপরাধটির পিছনে জাতিগত বিদ্বেষের স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। যদিও দেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় এমন কোনও কার্যকর ব্যবস্থা নেই, যা জাতিগত অপরাধকে আলাদা করে চিহ্নিত করে। বরং এই ধরনের অপরাধকে একটি সাধারণ অপরাধ হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। এর ফলে অপরাধের উদ্দেশ্য মুছে যায়, গুরুত্ব লঘু হয়ে পড়ে। অ্যাঞ্জেল চাকমার হত্যাকাণ্ড কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলির নাগরিকদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা জাতিগত হিংসারই অংশ। আবেদনে ‘জাতিগত গালি বা রেসিয়াল অ্যাবিউজকে ঘৃণাজনিত অপরাধের একটি পৃথক শ্রেণি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, সমদর্শন ও বসুধৈব কুটুম্বকম-এর নীতির সঙ্গে এই জাতিবিদ্বেষ সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী। অতএব, জাতিগত হিংসা শুধুমাত্র অসাংবিধানিকই নয়, সভ্যতাবিরোধীও।
এটা ঘটনা, উত্তর-পূর্বের মানুষজনের উপর এই বৈষম্য ২০২৫ সালেও হয়েছে, তার আগেও হয়েছে। নিডো তানিয়ামের কথা তো আগেই উল্লেখ করেছি। ২০১৪ সালেই দিল্লিতে দুই মণিপুরি মহিলাকে প্রকাশ্যে মারধর করা হয়। ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারীর সময় উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষদের বিরুদ্ধে বর্ণবিদ্বেষ নতুন মাত্রা পায়। তাঁদের ‘করোনা’, ‘ভাইরাস’ বলে ডাকা শুরু হয়। অনেক জায়গায় তাঁদের দিকে থুতু ছোঁড়া, মারধর করা বা দোকানে ঢুকতে না দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। আর সাম্প্রতিক অ্যাঞ্জেল চাকমার খুন ফের এই ইস্যুকে সামনে এনেছে।
বর্ণবিদ্বেষী মন্তব্যের প্রতিবাদ করে প্রাণ গেল ত্রিপুরার এমবিএ পড়ুয়ার। গত ৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় রড ও ছুরি দিয়ে হামলা চালানো হয় তাঁর উপর। আর ২৬ তারিখ মৃত্যু হয় অ্যাঞ্জেলের। ঘটনায় উত্তরাখণ্ড পুলিশ পাঁচজনকে গ্রেপ্তারও করেছে। অ্যাঞ্জেলের ভাই মিশেলও ঘটনায় জখম হয়েছেন। ভাই মিশেলকে নিয়ে ঘটনার দিন সন্ধ্যায় সেলাকুইতে বাজার করতে গিয়েছিলেন দেরাদুনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া। হঠাৎই অপরিচিত কয়েকজন যুবক নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তাঁদের গালিগালাজ করতে থাকে। একসময় বর্ণবিদ্বেষী মন্তব্য শুনলে অ্যাঞ্জেল প্রতিবাদ করেন। এরপরই মদ্যপ দুষ্কৃতীরা অ্যাঞ্জেলের মাথায় ও পেটে প্রায় ১৭ বার ছুরি ও রড দিয়ে আঘাত করে। দাদাকে বাঁচাতে মিশেল এগিয়ে এলে তাঁর মাথাতেও আঘাত করা হয়। আহত অবস্থায় দুজনকেই স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় অ্যাঞ্জেলের। মিশেলের দাবি, হামলাকারীরা তাঁদের দুই ভাইকে ‘চাইনিজ’, ‘চিংকি’, ‘মোমোস’—এসব অবমাননাকর মন্তব্য করেছিল। উত্তরাখণ্ড পুলিশ অবশ্য জানিয়েছে, এই ঘটনার সঙ্গে বর্ণবিদ্বেষের কোনও যোগ নেই। কিন্তু সেই দাবি মানতে নারাজ অ্যাঞ্জেলের পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীরা। বাধ্য হয়ে সিট গঠন করেছে উত্তরাখণ্ডের বিজেপি সরকার।
ভাবুন একবার। অ্যাঞ্জেলের বাবা বিএসএফ কর্মী। বর্তমানে মণিপুরে কর্মরত। ভারতের সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব তাঁর কাঁধে। আর সবচেয়ে হৃদয় বিদারক ঘটনা, মৃত্যুর আগে অ্যাঞ্জেলের শেষ কথাগুলো। আক্রমণকারীদের উদ্দেশে তাঁকে বলতে শোনা গিয়েছে, আমি ভারতীয়, চাইনিজ নই। একটা ব্রাইট ছেলে। সদ্য এমএনসিতে চাকরি পেয়েছে। তারপরই বাবাকে বলেছে, এবার তোমার ছুটি। আমি পরিবারের দায়িত্ব নেব। তোমাকে আর সংসারের জোয়াল টানতে হবে না। ভাইকে পড়াতে নিয়ে গিয়েছেন, নিজের কাছে। তার এহেন পরিণতি। শুধুমাত্র বর্ণ আর মুখাবয়বের কারণে তাঁকে ভারতীয় প্রমাণের জন্য চিৎকার করতে হচ্ছে। এ লজ্জা আমরা কোথায় লুকাবো?
ভারতের উত্তর-পূর্বের সাত রাজ্য। পরিচিত সেভেন সিস্টার্স নামে। সম্প্রতি বাংলাদেশের টালমাটাল পরিস্থিতিতে মাঝে মাঝেই কয়েকজন বড়ো-মেজো- কুচো নেতাকে বলতে শোনা যায়, সেভেন সিস্টার্স দখল নেব। ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করব। আমরা রেগে যাই। রাগের সঙ্গত কারণও আছে। কিন্তু সেই আমরাই সেভেন সিস্টার্সের বাসিন্দাদের ভারতীয়ের মর্যাদা দিই না। চিংকি, মোমোজ বলে সম্বোধন করি। কারণটা কী? এখানকার বহু মানুষের মুখাবয়বের সঙ্গে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিল রয়েছে। উত্তর-পূর্বের এই রাজ্যগুলির জনগোষ্ঠী জাতিগতভাবে অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। কিন্তু এই স্বাভাবিক বৈচিত্র্যকে সম্মান করার বদলে, আমরা তাদের ভারতীয় নয় বলেই ধরে নিই। আজ এসআইআর, সিএএ নিয়ে এত কথা। আমরা যাঁরা তথাতথিত মূল ভূখণ্ডে থাকি, তাঁদের নাগরিকত্ব নিয়ে কত চিন্তা। কত লোকের ঘুম উবে গিয়েছে। আর এই এলাকার লোকগুলিকে প্রতিনিয়ত প্রমাণ করতে হয়, তাঁরা ভারতীয়। একটা অ্যাঞ্জেল বা নিডোর ঘটনা দেখে এর গভীরতা বোঝা যাবে না। প্রতিদিন নানাবিধ বর্ণবিদ্বেষের জেরে ক্ষতবিক্ষত হতে হয় উত্তর-পূর্বকে। আপনি হয়তো উত্তর ভারতের কোনও রাজ্যে কাজ করছেন। রাস্তায় বন্ধুদের সঙ্গে হাঁটছেন, শুনলেন কটূক্তি। দেখ চিংকি যাচ্ছে। বাসে-ট্রেনে উঠলেন, শুনলেন একইরকম বক্রোক্তি। কোথাও বাড়ি ভাড়া নিতে যাবেন? প্রথম প্রশ্নই ধেয়ে আসবে, তুমি ভারতীয় না চাইনিজ। শুধু পুরুষ নয়, এই অপমান সহ্য করতে হয় মহিলাদেরও। তার উপর তো বাড়তি পাওনা মহিলাদের শারীরিক হেনস্তা ও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ আচরণ। প্রতিদিন এগুলো সহ্য করেই বেঁচে থাকতে হয় অ্যাঞ্জেলদের। প্রতিদিন প্রমাণ করতে হয় আমরা ভারতীয়। কোনও এসআইআর লাগে না, সিএএ লাগে না। এটাই অনুতাপের বিষয়।
উত্তর-পূর্বের উপর এই অত্যাচারের কথা বেশিরভাগ সময়ই পুলিশের কাছে পৌঁছায় না। কারণ ভুক্তভোগীরা জানেন, তাঁদের অভিযোগকে গুরুত্ব দেওয়া হবে না, অথবা উলটে তাঁদেরই দোষী সাব্যস্ত করা হবে। এই নীরব হিংস্রতাই সবচেয়ে বিপজ্জনক, কারণ এটি ধীরে ধীরে আত্মসম্মান ও নিরাপত্তাবোধকে ধ্বংস করে দেয়। এটি ভারতের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও নৈতিকতার একটি গভীর সংকট।
নিডো থেকে অ্যাঞ্জেল—পরিস্থিতি বদলায়নি। শুধু নাম বদলেছে। যন্ত্রণা একই রয়ে গিয়েছে। ভারতের সংবিধান সকল নাগরিককে সমতার অধিকার দেয়। কিন্তু ভারতে ‘হেট ক্রাইম’-এর আলাদা কোনও সংজ্ঞা নেই। বর্ণবিদ্বেষকে নির্দিষ্ট অপরাধ হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। পুলিশ প্রায়শই ঘটনাকে ‘সাধারণ ঝগড়া’ বলে চালিয়ে দেয়। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ গুরুত্ব পায় না। ফলে বিচারপ্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে এবং অপরাধীরা উৎসাহিত হয়। অ্যাঞ্জেলের ক্ষেত্রেও তেমনই হয়েছে। পুলিশ বলেছে, এটা কোনও হেট ক্রাইম নয়।
একথা সত্যি, শুধু আইন করে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কঠোর আইন তো লাগবেই। তার সঙ্গে দরকার আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন। যতদিন না আমরা বুঝতে পারছি, এটা স্রেফ উত্তর-পূর্বের নয়, সমগ্র ভারতেরই সমস্যা, ততদিন সমাধান সম্ভব নয়। উত্তর-পূর্বের মানুষরাও যে আমাদেরই দেশের নাগরিক, সেই বোধ জন্মাতে হবে। নাহলে ‘এক ভারত’ স্লোগান নামেই থাকবে, কাজে নয়।