কৌশিক মজুমদার: দেখতে দেখতে এসে গেল আরও একটা নতুন বছর। দেওয়ালের পুরোনো ক্যালেন্ডার সরিয়ে জায়গা করে নিয়েছে নতুন ক্যালেন্ডার। একেবারে প্রথমে মানুষ দিন-তারিখ গণনা করত চাঁদের হিসাব করে। একে বলা হত চন্দ্র বর্ষ। পরে হিসাবটা আরও সহজ করতে মিশরীয়রা আবিষ্কার করল সূর্য দেখে বছর গণনা বা সৌরবর্ষ। বছর গণনা তো হল, কিন্তু তার হিসেবটা কীভাবে রাখা যায়? ভাবতে ভাবতে সুমেরীয়রাই প্রথমবার আবিষ্কার করে ফেলল ক্যালেন্ডার বা বর্ষপঞ্জিকা। প্রাচীন সভ্যতাগুলির মধ্যে মায়া ও সুমেরিয়ান সভ্যতা জ্ঞান বিজ্ঞানে বেশ অগ্রসর ছিল। এমনকি আমরা এখন যেটাকে সৌরজগত বলি, তার একটা প্রাথমিক চিত্রও মিলেছে সুমেরিয়ান একটা শিলালিপিতে। তারাই প্রথম ফসল কাটার সময়, মানে বসন্তের শেষ (যেটা এখন মার্চের মাঝামাঝি সময়) থেকে নতুন বছর শুরুর ঘোষণা করেন।
এই উপলক্ষ্যে ১২ দিনের বিরাট এক উৎসব হত। যার নাম আকিতু। এখানে ব্যাবিলনিয়ানরা পরের বছরের জন্য রাজা নির্বাচন করত বা ঠিক করত আগের রাজাই শাসন চালাবেন। নতুন রাজার কাছে তারা প্রতিজ্ঞা করত সামনের এক বছর তারা রাজার কথা মেনে চলবে, ঠিকমতো ধার শোধ দেবে, চুরি করবে না, মিথ্যে বলবে না ইত্যাদি। আর নতুন বছরের এই প্রতিজ্ঞাই ধীরে ধীরে বদলে গিয়ে নিউ ইয়ার রেজলিউশন হয়ে গেল। অনেক পরে যখন জানুয়ারিকে জুলিয়াস সিজার বছরের প্রথম মাস হিসেবে ঘোষণা করলেন, সেই মাসের নামও ছিল দেবতা জানুস-এর নামে। এর দুটো মাথা। একটা অতীতের দিকে চেয়ে থাকে, আর অন্যটা ভবিষ্যতের দিকে। সুমেরীয়দের মতো রোমানরাও জানুসের মন্দিরে বছরের প্রথম দিন গিয়ে সামনের এক বছর কিভাবে চলবে, তার প্রতিজ্ঞা করত। ফলে নিউ ইয়ার রেজলিউশনের ইতিহাস বেশ পুরোনো।
কিন্তু আজকাল এতসব মাথায় রেখে কে আর রেজলিউশন বানায়? সম্প্রতি একটা মজার তথ্য পাওয়া গিয়েছে। তাতে দেখি, ৪৪ শতাংশ মানুষ পয়লা জানুয়ারির ঠিক আগের রাতে নিজের রেজলিউশন ঠিক করে। ৩১ শতাংশ মানুষ কোনওরকম নতুন কিছু ভাবার দিকেই যান না। তারা খেয়াল করে দেখেন, গত বছরেরটাই এখনও ঠিকঠাক পূর্ণ হয়নি, তো নতুন নিয়ে কী হবে! ফলে তারা আগের বছরেরটাই রিনিউ করে দেন। এই রেজলিউশন একেবারেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক। সবচেয়ে বেশি নেওয়া চারটে রেজলিউশন হল—নতুন বছরে শরীর সুস্থ রাখতে নিয়মিত ব্যায়াম করব, পুষ্টিকর খাবার খাব, ওজন কমাবো আর সবচেয়ে বেশি হল অপচয় বন্ধ করে সঞ্চয় করব। ফেব্রুয়ারি যেতে না যেতেই ৮১ শতাংশ মানুষ তাঁদের প্রতিজ্ঞা পূরণে ব্যর্থ হয়ে অপেক্ষায় থাকেন কখন সামনের বছর আসবে, আর আবার নতুন করে রেজলিউশন নিতে পারবেন।
এই নিউ ইয়ার রেজলিউশন বললেই আমার নিজের কিছু অদ্ভুত স্মৃতি মনে পড়ে। আর আশ্চর্যের ব্যাপার, সবকটাই আমার ছাত্র জীবনে হস্টেলে থাকার সময়ের ঘটনা। হস্টেলের ছাদের ধারে একটা পেল্লায় বকুল গাছ ছিল। ঘন ডালপালা। ৩১ ডিসেম্বরের রাতে আমাদের এক বন্ধু ঠিক করল, ঠিক বারোটা বাজলেই লেডিজ হস্টেলে সে তার প্রিয়তমাকে (অবশ্যই একপাক্ষিক) ফোন করে মনের কথা জানাবে। বারোটা বাজতেই ফোন এবং উত্তরে যথোচিত তিরস্কার শুনে বেচারা জীবনের প্রতি সব আগ্রহ হারিয়ে ফেলল। সেই রাতে প্রায় গলা অবধি তরল অবস্থায় একলা হস্টেলের ছাদে এসে মারল এক লাফ। এটুকু পড়ে চমকে উঠবেন না। তরল অবস্থায় হিসেবে ভুল হতে বাধ্য এবং সেটাই হল। সে আটকে গেল হস্টেলের গায়ে লাগা বকুল গাছের ডালপালায়। এবং নিজেকে মৃত ভেবেই হোক বা আকন্ঠ পানের জন্যই হোক, সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান হারাল। রাতে অনেক খুঁজেও তাকে পাওয়া গেল না। সকাল প্রায় ন’টা নাগাদ আমরা যখন পুলিশে খবর দেব কি না, তা নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবছি, ঠিক তখনই সেই গাছের তলা দিয়ে যাবার সময় তার রুমমেট এক আকাশবাণী শুনতে পেল, ‘ভাই আমাকে নামা’। প্রথমে ফল পাড়ার লগা, তারপর মই ইত্যাদি দিয়ে অনেক চেষ্টায় তাকে উদ্ধার করা হয়। কিন্তু বছরের প্রথম দিনের এই কলঙ্ক কোনওদিন তার পিছু ছাড়েনি। বাকি হস্টেল জীবন সে বকুল কিংবা বকুলদা নামেই খ্যাত হয়।
আমাদের আর এক বন্ধু অবশ্য অন্য কাণ্ড ঘটিয়েছিল। সেটা আরও ভয়ানক। আমরা ভর্তি হবার পরপরই সে নিয়ম মেনে আমাদেরই এক সহপাঠীর প্রেমে পড়ে। যথারীতি একতরফা। সেটা আমাদের ফার্স্ট ইয়ারের প্রথম দিকের কেস। নন প্রেমিকের সংখ্যা অনেক বেশি থাকায় ছেলেটি প্রচুর ফুটেজও পেয়েছিল। কালের নিয়মেই নিউ ইয়ার এল। ‘এবার তোকে কিছু করতেই হবে, নইলে লাখে লাখে নেপোরা দই মারতে উদ্যত’ এমন কিছু বুঝিয়ে তাঁকে দিয়ে একটা নতুন ডায়েরিতে তাকে দিয়ে নিউ ইয়ার রেজলিউশন লেখানো হল—‘আমি এই বছর অমৃতাকে (নাম পরিবর্তিত) প্রেম করবই’। নীচে আবার নিশ্চিত হওয়ার জন্য আর এক বন্ধু লাল কালি দিয়ে লেখাল, ‘সতি সত্যি সত্যি। তিন সত্যি। বড় ঠাকুরের দিব্যি। মা কালীর কীড়া’। আর্চিসের ৫০ টাকা দামের লাল পান আঁকা কার্ড কেনানো হল। ব্যাচের এক আঁতেল ছোকরা ভিতরে সুনীলের নীরা থেকে জব্বর কিছু ‘কোট’ বাতলে দিল। ডেয়ারি মিল্কের চকোলেট সহযোগে সে বস্তু মেয়েটির ব্যাগে অজান্তে ঢুকেও গেল।
এবার অপেক্ষা ছাড়া উপায় নেই। সবার মধ্যে একটা কী হয় কী হয় ভাব। সেদিন বিকেলে লেডিস হস্টেল থেকে খবর এল। ওখানে একটা বখাটে ছোকরা ক্যান্টিনে কাজ করত। সেই এসে জানাল ছেলেটিকে দেখা করতে বলেছে মেয়েটি। ব্যাস! গোটা বয়েজ হস্টেলে সাজ সাজ রব। নন প্রেমিকরা তাঁদের শেষ মুহূর্তের টিপস দিতে ব্যস্ত। নব্য প্রেমিক ঘাড় গুঁজে সব শুনছে আর ঘনঘন মাথা ঝাঁকাচ্ছে। ফুল হাতা শার্ট, বন্ধুর থেকে নেওয়া নতুন জিন্সের প্যান্ট (লম্বায় বড়, তাই তলা গোটানো), আর এক বন্ধুর ডিও মেখে বাবু তো রওনা হল ‘ভাই দেখিয়ে দিলি তো’ জাতীয় প্রচুর শুভেচ্ছা সঙ্গে নিয়ে। যেন যুদ্ধে যাচ্ছে।
যখন ফিরে এল তার মুখ দেখলে গৌতমও গম্ভীর হয়ে যাবেন। জোরে জোরে নিঃশ্বাস পড়ছে, কান লাল, নাকের পাটা ফোলা। কী ঘটেছে, তা আর না বলাই ভালো। মেয়েটি নেহাত বোকা। না হলে রূপে কার্তিক, গুণে সরস্বতী (পুং) এমন পাত্রকে অস্বীকার করে! শুধু তাই নয়, সে একা করলে এক রকম, সঙ্গে কিছু ফাজিল বান্ধবীও ছিল। তারা নাকি একা পেয়ে ছেলেটিকে বিস্তর জ্ঞান দিয়েছে, ‘এই সময় প্রেমের সময় নয়। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সময়। বাবা-মা কী এই করতে তোকে এত কষ্ট করে পড়াচ্ছে...’ ইত্যাদি। রিফিউজড হওয়াতে সে যতটা না কষ্ট পেয়েছে, তার চেয়ে বেশি রাগ হয়েছে এসব অযাচিত জ্ঞান শুনে। ছেলেটি না শুনে অভ্যস্ত নয়। ৩১ ডিসেম্বরের ভরসন্ধ্যায় হস্টেলের একঘর জনতার সামনে সে ভীষণ এক নিউ ইয়ার রেজলিউশন নিল। ‘আমি চললাম। নতুন বছরে হয় ও থাকবে, নয় আমি’। আমরা কয়েকজন পুলিশ ইত্যাদির বিস্তর ভয় দেখালেও লাভ বিশেষ হল না। সে নাকি তার অনেক দেখা আছে। অমন পুলিশ সে দুই পকেটে রাখে। একটা ভাঙা হারকিউলিস ক্যাপ্টেন সাইকেল চেপে অতি দ্রুত সে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। আমরাও চরম উৎকণ্ঠায় প্রহর গুনতে লাগলাম।
প্রায় ঘণ্টাখানেক বাদে তার আগমন। হাসিমুখে। ঘরে ঢুকেই ঘোষণা করল, ‘দিলাম শেষ করে’। আমরা চমকিত। কাকে প্রশ্ন করতে যা জানা গেল, সেটা একটু বিস্তারে বলি। এইখানে প্রসঙ্গতঃ জানাই, আমি কৃষিবিজ্ঞানের ছাত্র। ফার্মে আমাদের সবার আলাদা আলাদা প্লট দেখাশোনা করতে হত। বছরভর আমাদের বিভিন্ন মরশুমি ফসল ফলাতে হত ও তার উপরে পরীক্ষায় নম্বরও থাকত। এই ভদ্রলোক প্রথমে সাইকেল চালিয়ে লেডিস হস্টেলের আশেপাশে খানিক ঘোরাঘুরি করেছেন। এত রাতে একটা ছেলেকে ভাঙা সাইকেল নিয়ে গেটের সামনে উঁকিঝুঁকি মারতে দেখে দারোয়ান তাড়া করায় কোনওমতে সে মুখ লুকিয়ে ফার্মের দিকে পালায়। আর এই ফার্মে ঢুকতেই তার মাথায় সত্যজিতের ভাষায় ‘হাই ভোল্টেজ স্পার্ক’। মেয়েটির প্লট তার চেনা ছিল। শীতের রাতে ফার্মের ওইদিকে গার্ডও ছিল না। ফলে লুকিয়ে ভিতরে ঢুকে সে মেয়েটির প্লটের সব গাছ উপড়ে দিয়েছে। ‘এবার দেখি পরীক্ষায় কত নম্বর পায়’!
‘তুই যে বললি হয় ও থাকবে নয় তুই?’ আমি বেকুবের মত প্রশ্ন করতেই সে হাত ঝেড়ে প্রশ্নটা যেন উড়িয়েই দিল। ‘আরে তুই অমৃতাকে চিনিস না? নম্বর ওর প্রাণ। এক নম্বরের জন্য সেদিন কেমন কেঁদেছিল ভাব। নম্বর নিয়ে নেওয়া মানেই তো থাকা না থাকা সমান। দেহ আছে। প্রাণ নেই’। আমি আর তর্কে গেলাম না।
এদিকে এই কাহিনি শুনেই আমার এক বন্ধু ‘এই না হলে বাঘের বাচ্চা’ বলে লাফিয়ে উঠে পিঠ চাপড়ে দিল ছেলেটির। আমার কেমন একটা সন্দেহ হচ্ছিল প্রথম থেকেই। ফার্মে আমাদের প্লটের দিকে আলো নেই। এত অন্ধকারে প্লট চিনল কেমন করে? প্রশ্ন করতেই ‘চেনার কি আছে? প্রথম রোয়ের শেষ প্লট’ বলতে না বলতে সেই ‘বাঘের বাচ্চা’ বলা বন্ধু অশ্লীলতম সব শব্দ প্রয়োগ করে তাকে এন্তার কিল চড় লাথি মারতে লাগল। অন্ধকারে ঠাহর না পেয়ে ওর প্লটেরই সব গাছ উপড়ে ফেলেছিল বেচারা।
সেই থেকে নিউ ইয়ার রেজলিউশন জিনিসটাকেই আমি ভয় পাই।
• অঙ্কন : সুব্রত মাজী
• গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল
• সহযোগিতায় : উজ্জ্বল দাস