কীভাবে যাবেন: ট্রেনে বা বিমানে কুলু পৌঁছতে হবে। কুলু থেকে ৪১ কিলোমিটার দূরে এই মন্দির। ন্যাশনাল হাইওয়ে থ্রি ধরে গাড়িতে পৌঁছনো যায় হানোগি মাতার মন্দির। বাস এবং শেয়ারের গাড়িও পাওয়া যায়।
কীভাবে যাবেন: ট্রেনে বা বিমানে কুলু পৌঁছতে হবে। কুলু থেকে ৪১ কিলোমিটার দূরে এই মন্দির। ন্যাশনাল হাইওয়ে থ্রি ধরে গাড়িতে পৌঁছনো যায় হানোগি মাতার মন্দির। বাস এবং শেয়ারের গাড়িও পাওয়া যায়।
যাচ্ছিলাম আঁকাবাঁকা রাস্তায় ওক, পাইন, দেবদারু, উইলো, ম্যাপেলের ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে। ডানদিকে, বাঁ দিকে সুউচ্চ হিমালয়। ভোরে বেরিয়েছি সিমলা থেকে। কুলু হয়ে মানালি যাব। তবে পথে যেখানে ভালো লাগবে সেখানে থেকে যাব দু’একদিন। ক’দিন বাইরে বেড়াতে যাব, পিছুটান রাখিনি। কোথাও ভালো লাগলে থেকে যাব। কিছু দূর যাওয়ার পর আমাদের ড্রাইভার পেট্রল পাম্পে দাঁড়ালেন। তেল ভরে নিতে হবে। সামনে বহু দূর পর্যন্ত কোনো পেট্রল পাম্প নেই। পাম্প লাগোয়া ছোট্ট রেস্তরাঁ বিয়াসের কোল ঘেঁষে। অনেক সকালে বেরিয়েছি। খিদেটা বারবার জানান দিচ্ছে। রেস্তরাঁ ভীষণ সুন্দর। সামনে দিয়ে বয়ে গিয়েছে বিয়াস। সামনে বিভিন্ন রঙের পতাকা উড়ছে। বেশি কিছু পাওয়া যায় না। তবে চলনসই ব্রেড, ওমলেট আর গরম চা খেয়ে বিয়াসের ধারে এসে দাঁড়াই। জোরে হাওয়া বইছে।
গাড়ি আবার চলতে থাকে। পর পর অনেকগুলো টানেল পড়ল। সারাক্ষণ আমাদের বাঁ দিকে বয়ে যাচ্ছে বিয়াস। অনেকটা যাওয়ার পর সুন্দর এক মন্দিরের ধারে এসে দাঁড়াই। মন্দিরের কারুকার্য ও রঙের শোভা দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। মাথায় ধ্বজা উড়ছে। ড্রাইভার ঠাকুর সাহেব বলেন এটা কুলুর হানোগি মাতা মন্দির। খ্রিস্ট্রীয় ১৫৩০ সালে কুলুর আদিবাসী রাজা এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। আসলে এটা দরজা মাতার মন্দির। এখানে বিরাট আদিবাসী মেলা বসে। দূর দূরান্ত থেকে আদিবাসীরা আসেন এই মেলায়। মন্দির ভেঙে গিয়েছিল। কিছুদিন আগে হিমাচল প্রদেশ সরকার এই মন্দির সারিয়ে তোলে। প্রতিদিনই প্রচুর আদিবাসী তীর্থযাত্রী আসেন দূর দূরান্তের জেলাগুলি থেকে। ঠাকুরসাহেব বললেন অনেক জায়গায় গণপরিবহন ব্যবস্থা নেই। কোথাও যাও বা আছে, তা অনিয়মিত। ঠিক মতো বাস, ট্রাক চলে না। দুর্যোগের সময় অধিকাংশ দিনই বন্ধ থাকে। আদিবাসীরা হেঁটে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসে এই মন্দিরে। সামনে দু’তিনটে দোকান। পুজোর সামগ্রী বিক্রি হয়। মূল মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশের আগে দু’টি কক্ষ পার হয়ে যেতে হয়। ভেতরে মশালের ধুনি জ্বলছে। তীর্থযাত্রীরা পুজো দিয়ে ঘণ্টা বাজাচ্ছেন। কেমন এক অপার্থিব পরিবেশ। হানোগি মাতা আসলে পাহাড়ি আদিবাসীদের দুর্গা মাতা। ড্রাইভার ঠাকুর সাহেবকে জিজ্ঞেস করি খাবার হোটেলের কথা। ঠাকুর সাহেব বলেন আগে ছিল না। তবে এখন একটা হোটেল হয়েছে। এছাড়া এখানে মন্দির ট্রাস্টি সুন্দর একটা থাকার জায়গা করেছেন। যার বারান্দা দিয়ে দেখা যায় হিমালয় ঘেরা বিয়াসের অপরূপ সৌন্দর্য। এসেছি যখন দুটো রাত না থাকলেই নয়। অফিস রুমে গিয়ে যোগাযোগ করতে সহজেই ঘর পাওয়া গেল। নামমাত্র ভাড়া। পান্থশালার পাশেই ক্যান্টিন। নিরামিষ আহার কিন্তু স্বাদে অমৃত। ভাতের সঙ্গে সবজি, ভাজা, ডাল, চাটনি পায়েস, মিষ্টি। এই দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে এই খাবার যে পাচ্ছি এই অনেক। তৃপ্তিভরে খেয়ে নিলাম। খাওয়ার পর পাহাড়ি পথে হেঁটে অনেক দূর এগিয়ে যাই। পাহাড়ের ওপর বরফ জমতে আরম্ভ করেছে। ঠাকুর সাহেব আমাদের ড্রাইভারজি বললেন সারা রাত বরফ জমবে। ভোরে উঠে দেখবেন পাহাড়ের চুড়ো গুলিতে বরফ জমে গেছে। অন্ধকার নেমে আসছে। গাছের ছায়া দীর্ঘতর হচ্ছে। পান্থশালার দিকে হাঁটা লাগাই।
ঘরের মধ্যে এসে শুনতে পাই বিয়াসের তীব্র শব্দ। তীব্র স্রোতে বয়ে চলেছে বিয়াস। পাশে মন্দিরের ঘণ্টা বাজার শব্দ পাই। দ্রুত নীচে নামি। পুজোর আরতি শুরু হয়ে গিয়েছে। আধঘণ্টা ধরে আরতি হল। তারপর ঠাকুর সাহেব ডাকলেন, চলুন সাড়ে আটটার মধ্যে এখানে রাতের খাওয়া শেষ হয়ে হয়ে যায়। পাহাড়ি দুর্গম পথে ফিরতে হয় কর্মচারীদের। কুপন কেটে তাড়াতাড়ি খেতে বসলাম।
সকালে একটা দৃশ্য দেখে অবাক হয়ে গেলাম। অনেক সকালে এই ঠান্ডায় বেশ কিছু তীর্থযাত্রী বিয়াসে নেমে পাথরের উপর দাঁড়িয়ে স্নান করছেন। তখন নভেম্বর মাসের শেষ দিক। জবুথবু অবস্থা আমার। আর ওঁরা এই ঠান্ডায় চান করছেন! ঈশ্বরের কৃপা আছে, তাই এই ঠান্ডা জলেও ওঁদের কিছু হয় না। স্নান করে পুজো দিয়ে পাহাড়ি পথে আবার অদৃশ্য হয়ে যান। অনেকটা যাবেন ওঁরা। সঠিক কোনো পরিবহন ব্যবস্থা নেই। পথ দুর্গম, তবুও এসেছেন। অবাক লাগে।
বেলার দিকে লোক আসে বিস্তর। বিকেলের আগেই ফাঁকা হয়ে যায়। বারান্দায় বসে বিয়াসের সৌন্দর্য দেখি। চোখের তৃষ্ণা মেটাই। কোথা দিয়ে যে সময় কেটে গেল! পরের দিন সকালে লুচি তরকারি, পেড়া খেয়ে আবার কুলুর দিকে রওনা দিলাম।
সোমনাথ মজুমদার