• ‘ভালোবাসা হল বেনারসি শাড়ির মতো, ন্যাপথালিন দিয়ে যত্ন করে আলমারিতে তুলে রাখতে হয়। তাকে আটপৌরে ব্যবহার করলেই সব শেষ।’ লিখেছেন সমরেশ মজুমদার। বেনারসি! নামের মধ্যেই যেন ভারতীয় নারীর আবেগ ও আভিজাত্যের পসরা মিশিয়ে দেওয়া আছে। ইতিহাস ঘাঁটলে পাওয়া যায়, সপ্তদশ শতকে দুর্ভিক্ষের সময় গুজরাত থেকে রেশমতাঁতিরা কর্মসংস্থানের জন্য বেনারসে চলে আসেন। আঠারো-উনিশ শতকে বেনারসের বেনারসি পোশাক শিল্পে উৎকৃষ্টতা ও আভিজাত্যের নিশান হয়ে ওঠে। সূক্ষ্ম রেশম, সোনা-রুপোর সুতোর সূচিকর্ম ও কিংখাবের জন্য এই ঐতিহ্যবাহী শাড়ি খুব ভারী ওজনের হত। রাজা-বাদশাহদের বিয়ের আসরে যেমন বেনারসির কদর ছিল, তেমনই আমজনতার ঘরেও বিবাহবাসরের শুভ পোশাক ছিল বেনারসি। এখনও তার ব্যত্যয় হয়নি। বিয়ের আসরে কনের সাজের শো স্টপার এখনও সেই বেনারসিই। বিশেষ করে হাইলাইটেড বেনারসি সমাদৃত হচ্ছে কনেদের কাছে। অন্তত এমনটাই মত পোশাকশিল্পী সুচিরা সেনগুপ্তর। তাঁর মতে, ‘জড়ানো ফুল ও পাতাযুক্ত নকশা, কলকা, পাড়ের বাইরের ঝালর অংশ নিয়ে বেনারসি বাঙালি মেয়েদের ওয়ার্ডরোবে আজও একই আদরে শোভা পায়। এই বেনারসি বাংলার ভূখণ্ডের বয়নশৈলী নয়। তবু সময়ের বিবর্তনে এই শাড়ি মিশে গিয়েছে বাংলার ভালোবাসায়। আধুনিক কনেরা আবার আলাদা করে হাইলাইটেড নকশা করিয়ে নিচ্ছেন বেনারসিতে।’
বেনারসির এই বিবর্তন প্রায় ২০ বছর ধরে অনেকটাই পেশাসূত্রে খুব কাছ থেকে দেখেছেন আর এক ফ্যাশন ডিজাইনার ঐশী গুপ্ত। তাঁর মতে, ‘একজন তাঁতি যখন একটি নকশা বোনেন, তা একসঙ্গে বেশ কিছু শাড়িতে ওঠে। এবার কেউ যদি মনে করেন, আমার শাড়িটা সকলের চেয়ে আলাদা হবে তাহলে তিনি কাস্টোমাইজ করে নেওয়ার সুযোগ অবশ্যই কাজে লাগাবেন। একটা সময় ছিল, যখন একটি বেনারসি দোকান থেকে কিনে এনে বিয়েতে পরার চল ছিল। কিন্তু এখনকার মেয়েরা এই বেনারসির উপর নিজস্ব কিছু ছাপ রাখতে চাইছেন। হাইলাইট কাজ করিয়ে তাঁরা বানিয়ে ফেলছেন ‘নিজস্ব নকশা’।
বেনারসি হাইলাইটার কী
জরির কাজ, সিক্যুইন ও হ্যান্ড পেইন্টিং ব্যবহার করে বেনারসির উপর যে নতুন লুক দেওয়া হয়, সেটাই বেনারসি হাইলাইটার। এটি সাধারণত তিন ধরনের হয়। সাধারণত জারদৌসি হাইলাইটের কাজ বেশি করেন নকশাশিল্পীরা। বহু মধ্যবিত্ত বাড়ির কনেও আজকাল এই ধরনের হাইলাইট করান। বুটি হোক বা জাল নকশার বেনারসি, তার উপরও জরির সুতো দিয়ে আলাদা করে পাড় ও নকশার মূল মোটিফ হাইলাইট করা হয়।
আর এক ধরনের হাইলাইট শাড়ির বুননকে আরও বিস্তৃত করে তুলে ধরে। একে বলে টেক্সচারাল ডেপথ-কে হাইলাইট করা। এটির খরচ তুলনামূলক বেশি, তবে এই হাইলাইটে বেনারসিটি আজীবনের জন্য অনন্য কালেকশন হয়ে উঠতে পারে। ধরা যাক, নকশাদার খাড্ডি বেনারসি কিনেছেন একজন। এবার এই বেনারসির মধ্যেই হ্যান্ড পেইন্টিং করে মানানসই নকশা এঁকে তার সঙ্গে যোগ করা হয় নিডল ওয়ার্ক। তবে এই প্রজন্মের কনেদের সবচেয়ে বেশি চাহিদা মুভমেন্ট হাইলাইটারে। কেমন সেটি? জানালেন সুচিরা। ছোটো ছোটো সিক্যুইন ড্রপলেট যোগ করে গোটা শাড়িতে বসানো হয়। এত সূক্ষ্ম সিক্যুইন যে চোখেও পড়ে না। কিন্তু যখনই কনে হাঁটাচলা করেন বা পোশাকটি দুলে ওঠে, এই সিক্যুইনগুলি আলাদা করে ওয়েভি মুভমেন্ট তৈরি করে।
সাবেক বিয়ের বেনারসিতে হাইলাইট
ট্র্যাডিশনাল লুক-এ আজকাল অনেকেই বিয়ে করেন। সেই মা-ঠাকুরমাদের সময়কার মতো কলকা, হাতে আলতার নকশা, গায়ে সাবেকি বেনারসি। গয়নার নকশাতেও সাবেক বাংলার ছোঁয়া। এমন বিয়ের সাজ যদি পছন্দ হয়, তাহলে সেই কনের বেনারসিতে জারদৌসি হাইলাইটার সবচেয়ে সেরা বিকল্প বলে মত ঐশীর। কীভাবে হয় তা? ব্যাখ্যা করলেন তিনি। ‘লাল বেনারসির সঙ্গে সোনালি জরি বা গঙ্গা-যমুনা জরির কাজ হলে সেই বেনারসিটির মোটিফকে বর্ডার করে জারদৌসি হাইলাইট করলে চমৎকার দেখায়। বেনারসির পাড়ের উপর একটা আলাদা সরু হাইলাইটেড পাড়ও বসানো যেতে পারে। অনেক সময় নির্বাচিত কিছু মোটিফকেও হাইলাইট করা যেতে পারে। আবার যদি কোনো কনে খাড্ডি বেনারসি নির্বাচন করেন, সেক্ষেত্রে জারদৌসির চেয়েও ভালো মানাবে হ্যান্ড প্রিন্ট ও নিডল ওয়ার্কের হাইলাইটার। সারা বেনারসি জুড়ে কোনো শ্লোক লিখে দেওয়া, বর-কনের নাম লেখা সবই হাইলাইটিং নকশায় তৈরি করে দেওয়া যায়।’ সুচিরা আবার সচেতন শাড়ির ভার নিয়ে। বেশিরভাগ মেয়েরাই আজকাল হালকা ওজনের বেনারসি পছন্দ করেন। তাই সুচিরাও ওয়াটার ড্রপলেট সিক্যুইনে খাড্ডি বেনারসির উপর নকশা পছন্দ করেন। এতে বেনারসিটি নিজেই হালকা হওয়ায় এই সিক্যুইন হাইলাইটার যোগ হলেও আলাদা করে শড়ির কোনো ওজন বাড়ে না।
পকেটে চাপ কতটা
ডিজাইনারদের মতে, ক্রেতা ঠিক কী ধরনের হাইলাইট চাইছেন, কোন ধরনের বেনারসিতে কী নকশা তুলতে চান, এসবের উপর দাম নির্ভর করে। ধরা যাক, কেউ ১০-১২ হাজার টাকার একটি বেনারসি কিনেছেন। তারপর তাতে ৫০০০ টাকার হাইলাইট নকশা করাতে চাইছেন। জারদৌসি নকশার ক্ষেত্রে বা সিক্যুইন দেওয়া মুভমেন্ট হাইলাইটারের ক্ষেত্রে এই খরচে করা সম্ভব। তবে তাতে নকশার প্রয়োগ অত বেশি জায়গা জুড়ে হবে না। সাধারণত একটি ভালো মানের বেনারসিতে বেশ চোখে পড়ার মতো হাইলাইটার পেতে চাইলে ৮০০০-১০,০০০ টাকা অতিরিক্ত খরচ ধরে এগনোই ভালো। হ্যান্ড প্রিন্টেড নিডল ওয়ার্ক হলে খরচ আরেকটু বাড়ে। তবে এই পোশাক শুধু দাম ও খরচের উপর নির্ভর করে না। বেনারসি একটি মেয়ের যাপন ও স্মৃতিতে আলাদা করে সংরক্ষিত হয়। তাই আধুনিকাদের পছন্দ মেনে হাইলাইটেড বেনারসিতে আলোকিত হচ্ছে বিয়ের বাসর।
মনীষা মুখোপাধ্যায়