আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান অসংখ্য অসাধারণ আবিষ্কারের ফসল। সেগুলি নিয়ে চলছে এই বিভাগ।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান অসংখ্য অসাধারণ আবিষ্কারের ফসল। সেগুলি নিয়ে চলছে এই বিভাগ।
বয়স চল্লিশ পেরোতেই কপালের দু’পাশ ফাঁকা হতে শুরু করল অনিমেষ বাবুর। প্রথমে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি। পরে একদিন পুরনো অ্যালবাম দেখতে দেখতে নিজের যুবক বয়সের ছবির সঙ্গে বর্তমান চেহারার তুলনা করে তিনি একটু থমকে গেলেন। চুল যে শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেও জড়িয়ে থাকে, তা সেদিন তিনি নতুন করে উপলব্ধি করলেন। তাঁর মতো পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ চুল পড়ার সমস্যায় ভোগেন। আর সেই সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়েই জন্ম হয়েছে হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট বা চুল প্রতিস্থাপনের মতো আধুনিক প্রযুক্তি। আজকের দিনে এটি একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় চিকিৎসা পদ্ধতি। কিন্তু এর পিছনে রয়েছে দীর্ঘ গবেষণা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের এক ইতিহাস।
প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ টাক পড়া রোধ করার নানা উপায় খুঁজেছে। কেউ ভেষজ ওষুধ ব্যবহার করেছেন, কেউ বিশেষ তেল, আবার কেউ বিভিন্ন ধরনের প্রসাধনী। কিন্তু স্থায়ী সমাধান পাওয়া ছিল অত্যন্ত কঠিন। তাই বিজ্ঞানীরা ভাবতে শুরু করেন, শরীরের এক জায়গার চুল অন্য জায়গায় প্রতিস্থাপন করা সম্ভব কি না।
হেয়ার ট্রান্সপ্লান্টের ইতিহাস শুরু হয় বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে। ১৯৩০-এর দশকে জাপানের চিকিৎসক ডা. ওকুদা প্রথমবারের মতো চুল প্রতিস্থাপনের ধারণা নিয়ে কাজ করেন। তিনি মূলত দুর্ঘটনা বা পোড়া জায়গায় চুল গজানোর জন্য ছোট ছোট ত্বকের অংশ প্রতিস্থাপন করতেন। তাঁর গবেষণা ছিল যুগান্তকারী। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে সেই কাজ আন্তর্জাতিকভাবে খুব বেশি পরিচিতি পায়নি। এরপর ১৯৫০-এর দশকে আমেরিকার চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. নরম্যান অরেনট্রাইচ হেয়ার ট্রান্সপ্লান্টের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। তিনি প্রমাণ করেন যে মাথার পিছনের অংশের চুল সাধারণত টাক পড়ার প্রভাব থেকে রক্ষা পায়। সেই চুল যদি টাক পড়া অংশে নিয়ে আসা যায়, তবে সেটিও একই বৈশিষ্ট্য ধরে রাখে। এই ধারণাটিকে বলা হয় ‘ডোনার ডমিন্যান্স’। আধুনিক হেয়ার ট্রান্সপ্লান্টের ভিত্তি গড়ে ওঠে এই আবিষ্কারের উপর। তবে সেই সময়কার পদ্ধতি ছিল অনেকটাই অনুন্নত। চিকিৎসকেরা বড়ো বড়ো চুল প্রতিস্থাপন করতেন, যাকে পাঞ্চ গ্রাফট বলা হতো। এতে মাথায় চুল গজাত ঠিকই, কিন্তু দেখতে অনেকটা পুতুলের চুলের মতো লাগত। স্বাভাবিক সৌন্দর্য আসত না। ফলে বিজ্ঞানীরা আরও উন্নত পদ্ধতির খোঁজে গবেষণা করতে থাকেন।
১৯৮০-এর দশকে হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট প্রযুক্তিতে বড়ো পরিবর্তন আসে। তখন মিনি ও মাইক্রো গ্রাফট ব্যবহার শুরু হয়। ছোটো ছোটো চুল প্রতিস্থাপন করার ফলে চুলের রেখা বা হেয়ারলাইন অনেক বেশি স্বাভাবিক দেখাতে শুরু করে। রোগীর চেহারাতেও সৌন্দর্য ফিরে আসে। ১৯৯০-এর দশকে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়… ফলিকুলার ইউনিট ট্রান্সপ্লান্টেশন। এই পদ্ধতিতে মাথার পেছনের অংশ থেকে ত্বকের একটি সরু স্ট্রিপ কেটে নেওয়া হতো। এরপর মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে সেই অংশকে খুব যত্ন করে ১ থেকে ৪টি চুলের স্বাভাবিক ইউনিটে ভাগ করা হতো। পরে সেগুলো টাক পড়া অংশে প্রতিস্থাপন করা হতো। এর ফলে আগের তুলনায় অনেক বেশি ঘন চুল পাওয়া যেত।
২০০২ সালের দিকে হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট জগতে আরেকটি বিপ্লব ঘটে। চালু হয় ফলিকুলার ইউনিট এক্সট্রাকশন পদ্ধতি। এতে আর ত্বকের স্ট্রিপ কাটার প্রয়োজন হয় না। বিশেষ সূক্ষ্ম যন্ত্রের সাহায্যে মাথার পেছন থেকে একে একে পৃথক চুলের ফলিকুল বের করে নেওয়া হয় এবং সেগুলো প্রতিস্থাপন করা হয়। ফলে বড় কাটা দাগের বদলে খুব ছোট ছোট বিন্দুর মতো দাগ থাকে, যা প্রায় চোখেই পড়ে না।
২০১০-এর দশক থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির আরও উন্নতি হয়েছে। এখন রোবোটিক ও স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির সাহায্যে চুল সংগ্রহ ও প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে।
লিখেছেন শান্তনু দত্ত