Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

হাদির মৃত্যু: ভারত-বিরোধী ষড়যন্ত্রের প্লট!

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই মুহূর্তে দু’টি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এক, কে কতটা শেখ হাসিনা এবং আওয়ামি লিগকে গালাগালি করতে পারেন

হাদির মৃত্যু: ভারত-বিরোধী ষড়যন্ত্রের প্লট!
  • ২৫ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

মৃণালকান্তি দাস: বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই মুহূর্তে দু’টি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এক, কে কতটা শেখ হাসিনা এবং আওয়ামি লিগকে গালাগালি করতে পারেন। দুই, কে কতটা ভারত বিরোধী সুর চড়াতে পারেন। প্রতিদিন এই দু’টি বিষয় নিয়ে রাজনীতিবিদদের মধ্যে চলে প্রতিযোগিতা। যাঁর ‘কুবাক্য’ কাগজে ছাপার যোগ্য হয় না, তিনিই হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের ‘ভাইরাল’ নেতা। এই প্রতিযোগিতায় সব দলের নেতাদের পিছনে ফেলে আচমকা উত্থান হয়েছিল ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদির।

Advertisement

বরিশালের ছেলে এই হাদির জন্ম কট্টর, রক্ষণশীল পরিবারে। বাবা ছিলেন মাদ্রাসার শিক্ষক। ধর্ম চর্চা এবং ধর্মকে আঁকড়ে বড় হওয়া ছয় ভাইবোনের মধ্যে হাদিই সর্বকনিষ্ঠ। এ হেন হাদি মাদ্রাসা শিক্ষাশেষে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে। জীবনের মোড় বদলে যায় ২০২৪ সালের মাঝামাঝি। সেই বছরের জুলাইয়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে বাংলাদেশ। মূলধারার কোনও রাজনৈতিক দলে সক্রিয়ভাবে যুক্ত না থাকলেও আন্দোলনের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন হাদি। এই আন্দোলনের পথ ধরেই হাদির রাজনৈতিক উত্থান হয়েছিল।
জুলাই আন্দোলনের পর হাদির নেতৃত্বে ছাত্র-জনতার একাংশ গড়ে তোলে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’। এই মঞ্চের মূল দাবি, যাবতীয় আধিপত্যবাদের বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ন্যায়বিচারের দাবি প্রতিষ্ঠা করা। ক্রমে হাসিনা-বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম কাণ্ডারী হয়ে ওঠে হাদির দল। চলতি বছরে ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ সংগঠন হিসেবে আওয়ামি লিগকে নিষিদ্ধ করার দাবিতে যে ‘ন্যাশনাল অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট ইউনিটি’ গড়ে ওঠে, সেখানেও ইনকিলাব মঞ্চের সক্রিয় ভূমিকা ছিল। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি ভাঙার ঘটনায় হাদির নেতৃত্ব দেওয়া নিয়ে বিস্তর আলোচনা শুরু হয়। গ্রেটার বাংলাদেশের মানচিত্র, যেখানে সেভেন সিস্টার্স সহ ভারতের একাধিক অংশকে বাংলাদেশের বলে দাবি করা হয়, সেই মানচিত্র তৈরির পিছনেও এই হাদি। মূলত ভারত বিরোধী সুর চড়িয়েই হাদি রাতারাতি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের প্রথম সারির নেতা। হাদি মনে করতেন, মুক্তিযুদ্ধ ভারতের চাল। আওয়ামি লিগ আর ভারত মিলে ষড়যন্ত্র করে পাকিস্তান থেকে আলাদা করেছে দেশ। ভারত তার সীমান্ত সুরক্ষিত করতেই দুই পাকিস্তান ভাঙে। নিজেই এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘রাজাকার’ কাদের মোল্লার ফাঁসির পরে মেঝেতে গড়াগড়ি খেয়ে কেঁদেছেন। কাদের মোল্লার মতো নিষ্পাপ একজনকে ফাঁসি দেওয়ায় খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। এই হল হাদি!  
কিন্তু কয়েক মাস যেতেই মোহভঙ্গ! ইউনুস সরকার সহ দেশের নানা রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে তোপ দেগে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন হাদি। তাঁর বক্তৃতার ভাষা নিয়েও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অনেকে হাদির এই নির্ভীকতার প্রশংসা করে হয়ে ওঠেন তাঁর সমর্থক। কেউ কেউ আবার তাঁর ভাষাকে অশালীন বলে সমালোচনা করতে শুরু করেন। অবশ্য সে সবে কান দেননি তরুণ নেতা। নিজের অশালীন ভাষাকে ‘মুক্তির মহাকাব্য’ আখ্যা দিয়ে নিন্দুকদের কাছে ক্ষমা চাইতেও দেখা 
গিয়েছে। দেশের রাজনীতিবিদদের উপর ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছিলেন, ‘পাঁচ বছরের ক্ষমতার মোহে বিএনপি, জামাত বা যে কোনও দল যদি বাংলাদেশকে বেচে দেওয়ার চিন্তা করে, আপনারা কোন দেশে যাবেন? ভারতে যেতে পারবেন না। পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত নেই। বঙ্গোপসাগর ছাড়া কিন্তু আর কোনও গতি থাকবে না।’ সাধারণ মানুষকে সতর্ক করে হাদি বলেছিলেন, ‘আপনারা প্রতীক দেখে নয়, প্রার্থী দেখে ভোট দেবেন। একজন ভালো মানুষকে একবার ভোট দেবেন, আপনি ও আপনার পরিবার ৫ বছর ভালো থাকবে।’
জুলাই আন্দোলনের উদ্দেশ্য হারিয়ে যাওয়া নিয়ে হাদির মনে তীব্র ক্ষোভ ছিল। তাও প্রকাশ্যে বলতে দ্বিধা করেননি। হাদি বলেছিলেন, ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি তিনটি অপরাধ করেছে। প্রথমটি হচ্ছে, তারা জুলাই আন্দোলনকে কুক্ষিগত করেছে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, তারা অনেকে দুর্নীতি করেছে। আজ থেকে দশ মাস আগে যে ছেলেটির সারা গায়ে আঘাতের চিহ্ন ছিল, জুলাই আন্দোলন করতে গিয়ে সেসব ছেলে-মেয়ে কীভাবে এত কম সময়ে কোটি কোটি টাকার মালিক হতে পারে? ...এনসিপির যারা দুর্নীতি করেছে, এই সরকার চলে যাওয়ার পর কেউ যাবে দুবাই, যারা সেখানে ফ্ল্যাট কিনে রেখেছে। যারা মাস্টারমাইন্ড, তারা পাড়ি জমাবে বিদেশে। কিন্তু সাধারণ জুলাই যোদ্ধারা কোথায় যাবে। আমাদের তোমরা এই জাহান্নামে ফেলে যাবে। জুলাইয়ের ঐক্য মূলত নষ্ট করেছে এনসিপি।’ এমনকি এও বলা শুরু করেন, ‘আওয়ামি লিগের যারা গণহত্যা, গুম, খুন করেনি তারা দার্শনিকভাবে আওয়ামি লিগ। তার সঙ্গে কোনও অন্যায় করা যাবে না, ইনসাফ আচরণ করতে হবে।’ এসব ভাষণে বোঝাই যাচ্ছিল, আগামীদিনে হাদি অনেক তথাকথিত ‘বিপ্লবী’র মুখোশ খুলে দেবে!
ইনকিলাব মঞ্চ সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে হাদি যে আসনে ভোটে লড়াই করার কথা ঘোষণা করেছিলেন, সেই ঢাকা-৮ (মতিঝিল, শাহবাগ, রমনা, পল্টন, শাহজাহানপুর) আসনে জামাত প্রার্থীর নাম অ্যাডভোকেট হেলাল উদ্দিন। এনসিপির মনোনয়নপত্র পেয়েছেন জুলাই অভ্যুত্থানের সময় স্যালুট দিয়ে আলোচনায় আসা রিকশাচালক সুজন। আর বিএনপির বড়ো নেতা মির্জা আব্বাস। শুরুতেই হাদির থেকে এরা পিছিয়ে পড়েছিলেন কয়েক যোজন দূরে। এর মধ্যেই গুলির ঘটনা। হাদির লোকজন প্রথম প্রতিক্রিয়ায় মির্জা আব্বাসের নাম সামনে আনে, বলে সেই-ই এই কাজ করিয়েছে। ঘণ্টা খানেকের মধ্যে এই গল্প বদলে যায়। সম্ভবত তাদের বলা হয়, এখন দেশে এসব বলা যাবে না, বলতে হবে আওয়ামি লিগের নাম! এরপরে লিগই এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী বলে প্রচার শুরু হয়।
বিদেশ বসে যে সাংবাদিকরা দেশ চালান, তাদের একজন কবে, কোন মোটরবাইকে খুনি কোথায় গিয়েছে, ক’টা গুলি করার কথা ছিল, কেন করতে পারেনি এমন সব বিস্তারিত তথ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়াতে শুরু করে। ওই সাংবাদিকরা বলেন, খুনি নাকি হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারত চলে গিয়েছে। এর আগে ওই অবৈধ পথে বহু মানুষ গিয়েছে ভারতে। তাই সেই দাবিকে কেউ অবিশ্বাস করেনি। যদিও এর কোনও তথ্য প্রমাণ নেই। অথচ, যখনই খবর পেয়েছে খুনি পালাতে পারে, বাংলাদেশের বর্ডার গার্ড সীমান্ত কড়া নজরদারি শুরু করে দেয়। তাহলে খুনি পালাল কী করে? মজার ব্যাপার, বিদেশে বসে ওই সাংবাদিকরা যা বলেন, সরকার-প্রশাসনের কর্তারাও প্রায় একই সুরে কথা বলা শুরু করেন। অন্যদিকে যে মোটর বাইক সিসি টিভিতে দেখা গিয়েছে তার মালিক কে না ধরে অন্য একজনকে ধরে রিমান্ডে নিয়ে বসে আছে ঢাকার পুলিশ! দু’দিন পরে জানা যায়, তার মোটর বাইকের সঙ্গে খুনির মোটর বাইকের কোনও মিল নেই! এরই মধ্যে হাদির বোন সরাসরি এটা ভারতের কাজ, আওয়ামি লিগ আর ‘র’ মিলে হাদিকে মেরেছে বলে অভিযোগ তুলে দেন। কোথায় পেলেন এই তথ্য? প্রশ্ন তোলার কেউ নেই। বুঝতে অসুবিধে হয় না— গোটাটাই একটা ষড়যন্ত্রের প্লট!
ষড়যন্ত্র আরও বোঝা যায়, হাদি মারা যাওয়ার পর। এই খবর দেশে আসা মাত্র শুরু হয় আরেক নাটক। একদল দুষ্কৃতী জড়ো হয় বাংলাদেশের প্রথম সারির সংবাদপত্র প্রথম আলো আর ডেইলি স্টারের সামনে। চলে ভাঙচুর। জ্বলে ওঠে আগুন। ডেইলি স্টারের সাংবাদিকেরা বাঁচার জন্য ছাদে চলে যায়। সেনাবাহিনীর এক সদস্য দুষ্কৃতীদের কাছে কুড়ি মিনিট সময় চায়। দুষ্কৃতীরা কুড়ি মিনিট সময় দেয়। উদ্ধার হয় সাংবাদিকরা। এরপরে শুরু হয় লুটপাট! এখনও গোটা ভবনে আগুন আর লুটের ছাপ। প্রথম আলো অফিসেও একই অবস্থা। একই সঙ্গে এই ‘মব’ সংস্কৃতির পীঠস্থান ছায়ানটেও হামলা করে! সেখানে বাদ্যযন্ত্র ভাঙচুর করে। দুষ্প্রাপ্য ছবি নষ্ট করে। বিদেশ বসে যারা ফেসবুক-ইউটিউবের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করে, তারা বলে দিয়েছে এসব তছনছ করে দিতে হবে। কারণ, এসব নাকি ভারতের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। ছায়ানটে গান, সংস্কৃতি চর্চা হয়। এসব নব্য বাংলাদেশে চলবে না। তাই এখানে আগুন লাগবেই। উদীচীতেও আগুন ধরিয়েছে এরাই। হামলা চালিয়েছে চট্টগ্রামে ভারতের হাই কমিশনেও। কোথায় প্রশাসন, কোথায় সেনাবাহিনী? কেউ কাউকে ভয় পায় না! তার উপর খোদ স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ঘোষণা করেছেন, আওয়ামি লিগের লোকজনকে ধরতে আর মামলার দরকার নেই। খোঁজ পেলেই ধরবে! এটা নাকি আইন?
ক্ষমতায় বসেই ‘মহাজন’ ইউনুস বলেছিলেন, রিসেট বাটন টিপে দিয়েছেন। এক বছর ধরে সেই বাটনের কার্যকারিতা দেখছে বাংলাদেশ। রাষ্ট্র ‘রাজাকার’ প্রতিষ্ঠা করায় ব্যস্ত। চব্বিশের জুলাই গণআন্দোলনের পর বাংলাদেশ ‘মবের মুল্লুকে’ প্রবেশ করেছে। এই মব নিজেদের ‘তৌহিদী জনতা’ বলে প্রচার করে। বাস্তবে বাংলাদেশে ধর্মীয় রাজনীতির একটা অংশ এবং চরমপন্থী গোষ্ঠী যখন কোথাও ভাঙচুর-লুটতরাজ করতে চায়, তখন তারা মাদ্রাসার ছাত্র বেকার যুবক ভাড়াটে লোক জড়ো করে এবং নাম দেওয়া হয় তৌহিদী জনতা। 
এই তৌহিদী জনতাই মাজার ভেঙেছে, ভাস্কর্য, ম্যুরাল, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ গুঁড়িয়ে দিয়েছে। বাউল গানের আসরে হামলা চালিয়েছে। কিছু সংখ্যক দাড়িওয়ালা এদেশে জিন্নার জন্মদিন পালন করেছে। ২০২৫-এর বিজয় দিবসের আগে পাকিস্তান জিন্দাবাদ স্লোগানও শোনা গিয়েছে বাংলাদেশের মাটিতে। একেই কি প্রধান উপদেষ্টা বলেছিলেন, ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’!
আসলে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ এখন বাংলাদেশের হাতে নেই। একে ‘গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্ত’ বলে। যেকোনও দেশে নির্বাচনের দু’মাস আগে একটি গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়। বাংলাদেশে উল্টে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে। এই সুযোগে উগ্রবাদী শক্তি বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলি ধ্বংস করে নিজেদের অভিভাবকত্ব কায়েম করতে চাইছে। মদত দিচ্ছে সরকার। দেখে মনে হবে, জাতীয় ভোট নয়, গৃহযুদ্ধই চান ইউনুস!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ