ক্রমশ বাড়ছে মেয়েদের একাকী ভ্রমণ। চাহিদা অনুযায়ী জোগানও মজুত করছেন মহিলারাই। আজ এমনই দুই মহিলার কথা, যাঁরা দল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন চেনা অচেনা সফরে।
ক্রমশ বাড়ছে মেয়েদের একাকী ভ্রমণ। চাহিদা অনুযায়ী জোগানও মজুত করছেন মহিলারাই। আজ এমনই দুই মহিলার কথা, যাঁরা দল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন চেনা অচেনা সফরে।
মহিলাদের দ্বারা, মহিলাদের জন্য ঝুমুর নন্দীর ছিল বেড়ানোর নেশা। দেশের নানা প্রান্তে গিয়েছেন তিনি। সেইসব জায়গা নিয়ে লিখতেন বিভিন্ন স্বাদের ভ্রমণ কাহিনি। কোনোটা তথ্যে ভরপুর। কোনোটা বা বর্ণনায় ঠাসা। আর সেই থেকেই অনুরোধগুলো জমা পড়তে থাকে তাঁর কাছে। সমাজ মাধ্যমে ঝুমুরের লেখা ভ্রমণ কাহিনি পড়ে জায়গাগুলোর প্রতি আকৃষ্ট হন অনেকেই। তাঁরাই বেড়ানোর গ্রুপ তৈরি করার জন্য অনুরোধ করেন। মহিলারা দলবদ্ধ হয়ে বা একক ভাবে তাঁদের নিয়ে বেড়াতে যাওয়ার আরজি জানাতে থাকেন।
‘প্রচণ্ড ঘোরাঘুরির ফলে জায়গাগুলো তো চেনা ছিলই, সেখানকার লোকজনের সঙ্গেও আলাপ জমে গিয়েছিল টুকটাক। তবু একটু দ্বিধা যে কাজ করেনি তা নয়। নিজে বেড়ানো আর গ্রুপ নিয়ে কোথাও যাওয়ার মধ্যে বিস্তর ফারাক। একসঙ্গে এত মহিলার দায়িত্ব নিয়ে সফর সম্ভব হবে কি না, সেই নিয়ে যথেষ্ট সংশয় ছিল। তবু সাহসে ভর করে ২০১৯ সালে নিজের পরিচিতি কাজে লাগিয়ে মহিলাদের নিয়ে একটা ডে ট্রিপ করেই ফেললাম। দশজন মহিলাকে নিয়ে সেবার গিয়েছিলাম খিরাই। ফুলের অমন চাষ দেখে ভ্রামণিকদের মুগ্ধতার শেষ ছিল না। তাঁরা আবার আব্দার করলেন, এবার আর একটু বড়ো কোথাও নিয়ে চলুন।’ ক্রমশ সদস্য সংখ্যাও বাড়তে শুরু করল, ঝুমুরের নেতৃত্বে তৈরি হল উইমেন’স ট্রাভেল ক্লাব, কলকাতা। মূলত দেশের মধ্যেই বেড়ানোর বন্দোবস্ত করেন ঝুমুর। সম্প্রতি অবশ্য বিদেশি সফরও যুক্ত হয়েছে। মহিলাদের নিয়ে শ্রীলংকা গ্রুপ ট্যুর করে এলেন তাঁরা। এছাড়াও দেশের চেনা জায়গাগুলো তো বটেই, অচেনা নানা জায়গাতেও উইমেন’স ট্রাভেল ক্লাবের তরফে নিয়ে যাওয়া হয়।
চেনা জায়গার মধ্যে লাদাখ, হিমাচল প্রদেশ, দক্ষিণ ভারত, রাজস্থান যেমন আছে, তেমনই অচেনা জায়গার মধ্যে ওড়িশার সাইলেন্ট ভ্যালি, কালাহাণ্ডি বা লাদাখের প্রত্যন্ত এলাকা জাঁসকার ইত্যাদিও রয়েছে। হিমাচল প্রদেশের অফবিট কিছু স্পটেও দল নিয়ে যান ঝুমুর। তার মধ্যে বারোদ ভ্যালি অন্যতম। উপত্যকার গায়ের উপর উহি নদীর বহতা ধারা। আর চারদিকে পাইন আর সিডারে ঘেরা ঘন সবুজ পাহাড়ের শ্রেণি। এক দেখাতেই বারোদ ভ্যালির প্রেমে পড়ে যাওয়া ছাড়া গতি থাকে না। পাহাড়ি মানুষজনের আন্তরিক আতিথেয়তা তো এখানকার বিশেষত্ব। ‘আমাদের এই অফবিট ট্যুরগুলো মহিলারা ভীষণ এনজয় করেন’, জানালেন ঝুমুর। তাঁর দলে যোগ দেওয়ার জন্য বয়সের কোনো ঊর্ধ্বসীমা নেই। ৮৫ বছরের মহিলাকে নিয়েও অনায়াসেই বেড়াতে বেরিয়ে পরেন ঝুমুর ও তাঁর দল। তবে ভ্রামণিকদের সকলকেই শারীরিকভাবে ফিট হতে হবে। সেইটুকুই শুধু দেখে নেন তাঁরা। শুধুই মহিলাদের নিয়ে দলটি শুরু হলেও মহিলাদেরই অনুরোধে আবার কয়েকটা পারিবারিক ট্রিপেরও আয়োজন করেছেন ঝুমুর। তবে সেগুলো সংখ্যায় তেমন বেশি নয়। এখনও পর্যন্ত মহিলাদের নিয়ে, মহিলাদের দ্বারা এবং মহিলাদেরই জন্য নিবেদিত উইমেন’স ট্রাভেল ক্লাব, কলকাতা।
পাহাড়ের নেশায় হিমালয়
ভ্রমণের দল নিয়ে হিমালয়ের অন্দরে কন্দরে ঘুরে বেড়ান শ্রাবন্তী পোদ্দার। পেশায় তিনি স্কুল শিক্ষিকা। নেশায় ভ্রামণিক। শুধু তাই নয়, তিনি আবার ফোটোগ্রাফারও বটে। তাই ছবির কর্মশালার আয়োজন করেন। বললেন, ‘বেড়াতে গিয়ে ছবি আমরা সবাই তুলি। সেই নেশা থেকেই আমার ট্যুর গাইড হয়ে ওঠা।’ তাঁর মূল আকর্ষণ হিমালয়। গ্রুপের নামও হিমালয় উইথ শ্রাবন্তী। পাহাড় যত দেখেন ততই সে সম্পর্কে শেখেন তিনি। সমাজ মাধ্যমেই বলেছেন, নানারকম আলো কীভাবে পাহাড়ের গায়ে পড়ে, তা থেকে কেমন মায়ার সৃষ্টি হয়, সেগুলো সবই তিনি ক্রমশ দেখতে দেখতে শিখেছেন। খানিকটা অনুভব করার পর সেই নিয়ে ভেবেছেন এবং তারও পরে সেই মুহূর্তগুলোকে ফ্রেমবন্দি করেছেন। যতবার পাহাড়ে যান, ততই নতুন রূপে হিমালয় তাঁর সামনে এসে দাঁড়ায়।
শ্রাবন্তী বললেন, ‘সমাজ মাধ্যমের সূত্রেই আমার পরিচিতি গড়ে ওঠে। বন্ধুরা তাঁদের নিয়ে হিমালয়ের আনাচে কানাচে যাওয়ার অনুরোধ জানান। ২০২৫ সালে দশ জনের দল নিয়ে পঞ্চচুল্লি বেস ক্যাম্প, আদি কৈলাস আর ওম পর্বত ট্রেক করেছিলাম। সেই শুরু।’ বললেন, হিমালয়ের এক একটা অংশের এক এক রূপ। কোনো পাহাড় ভোরের আলো গায়ে মেখে মোহময়ী হয়ে ওঠে। কারও উপর আবার সন্ধ্যার শেষ লগ্নে রহস্য ঘনীভূত হয়। এমন মুহূর্তগুলো ক্যামেরার লেন্সে ধরে রাখতেন। ক্রমশ সেই নেশাটা যখন জাঁকিয়ে বসল তখন তা অন্যের মধ্যেও ছড়িয়ে দিতে চাইলেন। সেই থেকেই দলবদ্ধ হিমালয় ভ্রমণ।
দল নিয়ে বেড়ানোর ক্ষেত্রে লোকাল নলেজ বা আঞ্চলিক লোকেদের জ্ঞানের উপরই ভরসা করেন শ্রাবন্তী। আগামী দিনে এক অতি দুর্গম ট্রেক পথে বেরবেন তিনি দল নিয়ে। জাঁসকার যাচ্ছেন। সঙ্গে থাকছে গম্বোরঞ্জন পাহাড় দর্শন। আর সেখান থেকে রেড লেক যাওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। একরাত কাটাবেন সেখানেই একটি গ্রামে। কর্মসূচিতে ভোরে উঠে ছবি তোলা, সান্ধ্যকালীন ছবি তোলার নানা ধরনের পরিকল্পনা থাকে। শ্রাবন্তী বললেন, ‘পাহাড়ের প্রতি অসম্ভব টান না থাকলে দুর্গম পথে পাড়ি জমানো অসম্ভব। এছাড়া আমার ট্যুরের ক্ষেত্রে বাড়তি হল ছবি তোলার কর্মশালা। যাঁরা সেটা ভালোবাসেন, তাঁরাই আমার গ্রুপ ট্যুরে শামিল হন।’ নিজের ভালোবাসাকে অন্যের মধ্যে চারিয়ে দেওয়ার জন্যই শ্রাবন্তীর এই উদ্যোগ। মহিলা ট্যুর গাইড হিসেবে কখনো কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি তাঁকে। বরং যে কোনো পরিস্থিতিতে সবাই তাঁকে হাসিমুখে সাহায্য করেছেন।
কমলিনী চক্রবর্তী