পিনাকী ধোলে, পুরুলিয়া: খুব ছোটবেলাতেই রিনাতারার মা জাভিদের মাকে কথা দিয়েছিল— বড় হলে আমার মেয়ের সঙ্গেই তোমার ছেলের বিয়ে দেব। রবিবারই ছিল সেই শুভক্ষণ। বিয়ে নিয়ে কত স্বপ্নই না ছিল দুই পরিবারের। কিন্তু রবিবার সকাল থেকেই গ্রামের দুই গোষ্ঠীর মধ্যে বোমাবাজি সবকিছু বিগড়ে দিল। বিয়ে করতে পাত্রীর বাড়িতে এসে পৌঁছতেই পারল না বর! ভাগ্যিস প্রযুক্তি এত উন্নত। না হলে কী যে হতো! মেয়েকে ‘লগ্নভ্রষ্ট’ হওয়া থেকে বাঁচাল ভিডিও কল। ভিডিও কলেই বিয়ে হল রিনাতারা ও জাভিদের। ফিরে এল করোনার স্মৃতি। সেই সময়েও এরকম ঘটনার সাক্ষী ছিল বিশ্ব।
পাত্র-পাত্রী উভয়েই পুরুলিয়ার মফস্সল থানার টাটাড়ি গ্রামের বাসিন্দা। রিনাতারার বাড়ি থেকে জাভিদদের বাড়ির দূরত্ব মেরেকেটে দু’শ মিটার। জাভিদের মা জানিফা বিবি বলছিলেন, ছেলে যখন খুব ছোট, তখনই ওর বাবা আমাকে তালাক দিয়ে ছেড়ে চলে যায়। তারপর থেকে বহু সংগ্রাম করেই ছেলেকে মানুষ করেছি। চপ, পাকুড়ির দোকান রয়েছে। সেই বিক্রি করেই সংসার চালাতাম। তবে, জাভিদের পুরুলিয়া শহরে ফলের দোকান রয়েছে। আগের তুলনায় সংসারে স্বচ্ছ্বলতা এসেছে। রিনাতারার মা লজিমা বিবি বলছিলেন, দুই পরিবারে মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। তাই জানিফার ছেলের সঙ্গেই মেয়ের বিয়ে দেব, বহুদিন আগেই সেই কথা দিয়ে রেখেছিলাম। মেয়ের বিয়ে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু এইভাবে হবে, তা স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি।
স্থানীয় সূত্রের খবর, টাটাড়ি গ্রামের দুই পরিবার গোষ্ঠীর মধ্যে বিবাদ দীর্ঘদিনের। পুরুলিয়া-২ ব্লকের কৃষি কর্মাধ্যক্ষ শেখ কালাম ও ঘোঙ্গা পঞ্চায়েতের উপপ্রধান শেখ মোতাহিরের পরিবার ওই গ্রামের ‘ক্ষমতাসীন’ পরিবার গোষ্ঠী হিসাবেই পরিচিত। সেই পরিবারেরই সদস্য জাভিদ। জাভিদের বিয়ে উপলক্ষ্যে শনিবার রাত থেকেই বক্স বাজছিল। সেই কারণে অন্য পরিবার গোষ্ঠীর কিছু লোকজন ট্রান্সফর্মারের মেন সুইচ নামিয়ে দেয় বলে অভিযোগ। সেই নিয়ে বিবাদ শুরু হয়। পরের দিন সকালে জাভিদদের পরিবারের একজনের বাইকে ধাক্কায় জখম হন অন্য পরিবার গোষ্ঠীর তিন বছরের এক সদস্য। সেই নিয়েই তোলপাড় হয় গোটা গ্রাম। দুই গোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক বোমাবাজি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিস। গ্রেপ্তারির ভয়ে গ্রাম ছাড়েন জাভিদ।
এদিকে, বিয়ে উপলক্ষ্যে দুই পরিবারেরই বহু আত্মীয়ের আসার কথা ছিল। তাঁদের খাওয়া দাওয়ার জন্য ছিল এলাহি আয়োজন। কিন্তু বোমাবাজির আতঙ্কে কোনও আত্মীয়ই আর গ্রামে এসে পৌঁছতে পারেনি। নষ্ট হয়েছে বহু খাবার। পাত্রী রিনাতারা বলছিলেন, আমি কয়েকজন বন্ধুর সংঙ্গে বাঁধে স্নান করতে গিয়েছি। তখন দেখি বোমাবাজি চলছে গ্রামে। আমরা ভয়ে চলে আসি। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত বাড়িতেই ছিলাম। জাভিদের মা বলছিলেন, গ্রামে গন্ডগোলের জন্য যখন দেখি বিয়ের সময় পার হয়ে যাচ্ছে, তখন চুপিচুপি গ্রামের পিছনের দিক দিয়ে পাত্রীকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসি। লুকিয়ে আনা হয়েছিল মৌলানা সাহেবকেও। রিনাতারা আমার ছেলেকে ভিডিও কল করে। কলমা পাঠ করে মৌলানা। দু’জনের বিয়ে হয়। দোয়াটাও হয়নি। সোমবার ওয়ালিমার কথা ছিল। কিন্তু তা আর হল কই!
কিছুটা হতাশ গলাতেই রিনাতারা বলছিলেন, বিয়ে নিয়ে প্রতিটা মেয়েরই কত স্বপ্ন থাকে। আমাদের বিয়ে হল, কিন্তু কোনও ছবিই উঠল না! বিয়ের শাড়ি, গয়না কিছুই পরতে পারলাম না। সামনা সামনি স্বামীর মুখটাও দেখলাম না এখনও! জাভিদের পরিবারের আসমা বিবি, জালিমা বিবিরা বলছিলেন, বিয়ে নিয়ে কতকিছু ভেবেছিলাম। কিন্তু বিয়ের সমস্ত আয়োজনটাই মাটি হয়ে গেল।