সর্বসাধনার শেষে শ্রীরামকৃষ্ণ এই সময় সর্বদা ভাবমুখে থাকিতেন। দিনরাত্রির অধিকাংশই ঈশ্বরীয় ভাব ও প্রসঙ্গে কাটিয়া যাইত; উচ্চ অনুভূতির সামান্য একটু ইঙ্গিত, সঙ্গীতের মাত্র একটি কলি তাঁহার মনকে সমাধির স্তরে লইয়া যাইত। সেই অবস্থাই যেন তাঁহার সহজ অবস্থা, জোর করিয়া মনকে বাহ্য জগতে নামাইয়া রাখিতে হইত। সেই সময় তাঁহার আচার-ব্যবহার পাঁচ বছরের বালকের মতো, খাওয়াইয়া দিলে খান, কাপড় পরাইয়া দিলে পরেন, কোন কিছু প্রশ্ন জাগিলে মন্দিরে মাকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করেন। ভাগিনেয় হৃদয় কালীঘরে পূজার সহিত মামারও দেখাশুনা করিত।
সারদামণি দক্ষিণেশ্বরে আসিলে শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহাকে সাদরে বরণ করিয়া লইলেন, আর সারদামণিও মন-প্রাণ দিয়া স্বামীর সেবা করিতে লাগিলেন। সারাদিন নহবতে থাকিয়া কাজকর্ম শেষ করিয়া শ্রীরামকৃষ্ণের ইচ্ছানুযায়ী তাঁহার শয্যাতেই তিনি শয়ন করিতে আসিতেন।
এক চন্দালোকিত রজনীতে পার্শ্বে সুপ্তা ধর্মপত্নীর প্রতি চাহিয়া শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহার সাধন-মার্জিত মনকে সম্বোধন করিয়া বলিতেছেন, ‘মন, ইহারই নাম স্ত্রী-শরীর, উহা গ্রহণ করিলে দেহের আনন্দেই আবদ্ধ থাকিতে হয়, সচ্চিদানন্দ লাভ করা যায় না। ভাবের ঘরের চুরি করিও না; সত্য বল, কোন্টি চাও?’ ‘সচ্চিদানন্দ’ চিন্তা মাত্র তাঁহার মন সেই আনন্দে বিলীন হইয়া গেল। দেহ স্থির, নিস্পন্দ! কিছুক্ষণ পরে সারদামণির ঘুম ভাঙিলে শ্রীরামকৃষ্ণের ঐ অবস্থা দেখিয়া ভীত, কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া হৃদয়কে ডাকিলেন, হৃদয় জানিত কিভাবে এরূপ ভাবাবস্থা ভাঙাইতে হয়।
এই ঘটনার পর শ্রীরামকৃষ্ণ নিজেই সারদামণিকে শিখাইয়া দিলেন, ঈশ্বরের যে ভাব লইয়া ভাবসমাধি হয়, তদনুযায়ী নাম ধীরে ধীরে শুনাইলে ভাবসংবরণ হয়। অতঃপর সারদামণি নিজেই শ্রীরামকৃষ্ণকে ভাবাবস্থা হইতে সহজাবস্থায় ফিরাইয়া আনিতেন।
দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, এইভাবে কাটিয়া গেল, কাহারও মন দেহের স্তরে নামিল না। এই প্রসঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণ বলিয়াছেন, ‘বিবাহের পর জগন্মাতার কাছে প্রার্থনা করেছিলাম: ‘মা, ওর কামভাব এককালে দূর ক’রে দে; এই সময়ে একত্র বাস ক’রে বুঝেছিলাম—মা আমার প্রার্থনা পূর্ণ করেছেন।’
একদিন শ্রীরামকৃষ্ণের পা টিপিতে টিপিতে সারদামণি জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘আচ্ছা, আমি তোমার কে?’ শ্রীরামকৃষ্ণ যেন প্রস্তুত ছিলেন, সুধামাখা ভাষায় উত্তর দিলেন, ‘যে মা মন্দিরে, যে মা এই শরীরের জন্ম দিয়েছেন—সম্প্রতি নহবতে, তুমি আমার সেই মা আনন্দময়ী!’
শ্রীরামকৃষ্ণের কখনও ইচ্ছা হইত প্রকৃতিবেশে সাজিবেন,—সারদামণি তাঁহাকে বস্ত্রালঙ্কারে মনের মতো সাজাইয়া দিতেন ও দুইজনে সখীভাবে ভাবিত হইয়া আপনাদিগকে জগন্মাতার দাসী জ্ঞান করিতেন।
স্বামী নিরাময়ানন্দের ‘শ্রীশ্রীমা সারদা’ থেকে