সকলের কথায় কি সবার সব পরামর্শে কান দেওয়াটা ঠিক নয়। ঈশ্বরের অভিপ্রায় কি, ধীরভাবে ও সাবধানে তা বুঝে প্রতিটি ব্যাপারের লঘু-গুরু বিচার করতে হয়। হায়! মানুষের ভালর চেয়ে মন্দটাই আগে বিশ্বাস করে বসি, এতই দুর্বল আমরা। কিন্তু খাঁটি মানুষ যিনি, তিনি যে যা বলে হাল্কাভাবে তাই-ই বিশ্বাস করে বসেন না। তিনি জানেন মানবোচিত দুর্বলতায় লোকে খারাপটা বলবার জন্যই মুখিয়ে থাকে, মুখ আলগা তাদের। এ থেকে দাঁড়াল এই যে, সকলের কথা বিশ্বাস করতে তো নাই বটেই, যা শুনেছি বা ভাসা-ভাসা রকম বিশ্বাস করি তা-ও অন্যকে বলতে নাই।
বিজ্ঞ ও বিবেকী ব্যক্তির কাছ থেকে উপদেশ নাও। নিজের জল্পনা-কল্পনার পিছনে না ছুটে তোমার চেয়ে বড় যিনি তাঁর শিক্ষামত চলতে চেষ্টা কর। সদ্ভাবে জীবন যাপন করলেই মানুষ ভগবানের বিচারে বিজ্ঞ বলে গণ্য হয় এবং স্বভাবতঃই নানা বিষয়ে দক্ষতা জন্মায় তার। যতই নিরভিমান ও ঈশ্বরে সমর্পিতচিত্ত হয় মানুষ, ততই সর্ব বিষয়ে বিজ্ঞতা বাড়ে তার, বাড়ে সহিষ্ণুতা।
সত্যের সন্ধান করবে ধর্মগ্রন্থে, কারও বাগ্বিজৃম্ভণে তা মিলবে না। যে-অনুপ্রেরণায় যে-ধর্মশাস্ত্র রচিত, ঠিক সেই মনোভাব নিয়ে সে-শাস্ত্র পাঠ করতে হয়। শাস্ত্রগ্রন্থে, ভাষার পারিপাট্য নয়—আমরা খুঁজব আমাদের কল্যাণ হয় কিসে তারই সূত্র। বড়-বড় বই কিংবা জ্ঞানগর্ভ উক্তির মত সহজভাবে লেখা ভক্তিমূলক গ্রন্থ পড়েও আমাদের আনন্দ পাওয়া উচিত। নামজাদা কি অখ্যাত যাই-ই হক লেখকের গ্রামাণিকতায় যেন তোমার মন না টলে। শুল্ক সত্যানুরাগ তোমায় ঈশ্বরানুরক্তির পথে আকৃষ্ট করুক। কে বলেছে তার খোঁজ না নিয়ে কি বলেছে সেইটার হিসাব রাখ। মানুষ থাকে না। কিন্তু সত্যস্বরূপ নিত্য বিরাজমান। মানুষ গ্রহণ করুক বা না করুক, ঈশ্বর নানা ভাবেই তাঁর বাণী আমাদের শোনান। শাস্ত্রপাঠের বেলায় আমাদের অন্যায় কৌতুহলে অনেক সময় আমরা ঠকে যাই। কারণ শাস্ত্রেও আমরা চমকদার ভাবনার সন্ধানে ফিরি। অথচ ওসব মোটেই খোঁজার জিনিস নয়, একবার চোখ বুলিয়ে ছেড়ে দেওয়ার জিনিস। পঠন-পাঠনে লাভবান হতে চাও যদি তো নিরভিমান সরল মনে আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠ করবে, পণ্ডিত নাম কিনবার আশায় নয়। প্রফুল্লচিত্তে প্রশ্ন করবে, শুনবে মৌনভাবে। স্থবিরদের রূপকাখ্যানগুলিতে বিরক্তি বোধ করনা। অকারণে উদ্ভব হয়নি ওগুলির। মানুষ যখন কোন কিছুতে বাড়াবাড়ি রকম লোভ করে, বুঝতে হবে চিত্ত স্থির নাই তার। অহংকারী আর লোভীর কিছুতে সোয়াস্তি নাই। নিঃস্ব ও নিরভিমানেরা অপার শান্তির অনুভবে আনন্দ পায়। জীবন্মৃত হতে না পারলে মানুষ সহজেই রিপুগ্রস্ত হয় এবং অকিঞ্চিৎকর তুচ্ছ বস্তুতেও আসক্ত হয়ে পড়ে অল্পেই।
‘ঈশানুস্মরণ’ টমাস আ কেম্পিস অনুবাদ শ্রীনারায়ণী দেবী থেকে