ডাক্তার কাঞ্জিলাল, বড় ডাকাবুকো ব্যক্তি, বেশ চমৎকার বলতেন—“মার কাছে জোর। মার কৃপায়, বড় মহারাজের কৃপায় (ব্রহ্মানন্দ) নতুন মানুষ হব। মার কাছে এসে এইটে বুঝেছি। পূর্বের সবকিছু দুষ্কৃতি ঝেড়ে ফেলতে হবে। আর দেখে নিয়ো, আমি থলথলে বুড়ো হয়ে ফোকলা মুখে গুড়ুক টানতে টানতে নাতি-নাতনিদের কাছে, খালি ফাঁকা হাম-বড়ামি করতে থাকব না—আমি মা ঠাকলনকে দেখেছি, আখাল মহালাজকে দেখেছি। শক্তি থাকতে থাকতে চলে যাব।” সারাদিন ডাক্তারির কঠোর শ্রম অন্তে সারা রাত প্রায়ই দেবীপূজায় কাটাতেন। বিশ্বাস অচলা। ঠিক হলোও তা-ই। তিন-চার দিনের জ্বরে হঠাৎ চলে গেলেন।
মার নামে ললিতবাবু অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। আমার জীবন তার দৃষ্টান্তস্থল। ১৯১৬ সনের পূজোর ছুটিপূর্বে হেডমাস্টার স্বনামধন্য রসময়বাবু আমাকে ডেকে হিন্দুস্কুলে তাঁর ঘরে বললেন, “তোদের কত আগে সব সাবধান করেছি। বয়েস যদি ভুল লেখা থাকে শুদ্ধ করে নে। দরখাস্ত করে, প্রমাণ দিয়ে—এইবেলা। এখন টেস্ট সামনে। স্কুল কমিটি যা নাম পাঠিয়েছে, তাতে তোরও কম হচ্ছে। এবার ম্যাট্রিক দিতে পারবি না।” আমি তো সঙ্গে সঙ্গে ভ্যাক করে খানিকটা কেঁদেই ফেললাম প্রথম। অনাথ বালক। সন্ন্যিসী গারজেন। ফ্রি পড়ি। বই ধার করি। সর্বনাশ! কে আছে?—ও ললিতবাবু, এর কোনো উপায় হয়?
নিশ্চয়ই হয়। সকালবেলা, মাকে প্রণাম করবার পর ললিত বললেন, “মা, এটাকে ভালো করে আশীর্বাদ করো তো। এবার পরীক্ষা দিতে না পারলে, লেখাপড়া সব পণ্ড। মা সঙ্গে সঙ্গে মাথায় দাড়িতে পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন, ‘ঠিক হবে। নলিত, তুমি চেষ্টা করো।’”
আর কী বলে, পায় কে? মামা—বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার। গিরিশ মুখুজ্জে। লম্বা-চওড়া দশাসই দেহ। সমুন্নত সংযত চরিত্র। ধীমান। শরৎ মহারাজের চিঠি নেওয়া হলো। তাতে পরিষ্কার লেখা ছিল, ছেলেটির আগামী মার্চে ষোলো বছর কয়েক মাস বয়েস হবে। এ বিষয়ের সত্যতায় আমিই সাক্ষ্য। সেই চিঠির আর একটি বাক্য এখনও মনে আছে—“We remember your saintly father who used to visit the Master.”—শ্রীরামকৃষ্ণের নিকট আপনার সাধুসদৃশ পিতৃদেব ঈশান মুখুজ্জে মহাশয়কে খুব মনে পড়ে। ঈশানবাবুর এত দরাজ সাগরোপম হৃদয় ছিল যে, তিনি ঋণ করে দান করতেন। স্বামীজী তাই বলতেন, বিদ্যাসাগরের চেয়ে ঈশানবাবু বড় দাতা, এক হিসেবে।
মা পাঠিয়েছেন, ছেলেটিকে। ব্যবস্থা করতেই হবে। হতেই হবে। উপাচার্য দেবপ্রসাদের নিকট গিরিশবাবু সঙ্গে সঙ্গে আমাকে নিয়ে হাজির করলেন। রোগা লিকলিকে চেহারা দৃষ্টে দেববাবু বললেন, “Mr. Mukherjee, the boy hardly looks 16.”—মালুম হয় না, ষোলো বলে এ ছেলেকে। কিন্তু শ্রীমা ও শরৎ মহারাজ ছেলের উকিল। গিরিশ ও ললিত, উভয়ই জোরের সঙ্গে ঐ মূলে ষোলো অব্যর্থ বলায় ললিতের জয়জয়কার। যেন আহ্লাদের পাখায় উড়ে কর্ম ফতে করে, উদ্বোধনে ফিরে এলেন। সেই বছরেই ছেলের পরীক্ষা দেওয়া হলো। কে জানে তখন, ছয় বছর পরে, বড় সাধের, বড় আকর্ষণের ইউনিভার্সিটির ঘাটের জল খাইয়ে—মা-ই তাঁর আদর্শের বেদিতলে এই তৃণতুচ্ছ জীবন গ্রহণ করবেন। মূল্য দেবেন! যেন মা অলক্ষ্যে বলেছিলেন—বাছা, এখন তড়পাচ্ছ, দিনকতক তড়পাও। শেষে, ঠাকুরের ঘাটে শিক্ষে নিতে হবে। পূর্বেই বলেছি, ভাগ্যিস, দিদিমা মার গণমধ্যে এক প্রধানা নায়িকা! তাই তো, মা ও শরৎ মহারাজের এত অপরিসীম অনুকম্পা। ললিতের এত মমত্ব। এত খাটুনি।
স্বামী নির্লেপানন্দের ‘দেবী সারদামণি’ থেকে