দেবীশতকের উপর মহাভাষ্যটীকাকার কৈয়টের টীকা আছে। আনন্দবর্ধন ধ্বনিপ্রস্থাপনাচার্য নামে অভিহিত এবং অলঙ্কারশাস্ত্রের প্রধান স্তম্ভ। বাঙ্গালী পণ্ডিত শরণদেব ১১৭২ খ্রীষ্টাব্দে ব্যাকরণ-বিচারের জন্য চণ্ডী হইতে অনেকগুলি শ্লোক উদ্ধৃত করিয়াছিলেন। নেপালের রাজকীয় গ্রন্থাগারে পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় দশম শতাব্দীতে প্রাচীন নেওয়ারী অক্ষরে লিখিত একখানি চণ্ডী পাইয়াছেন। ৮ম শতাব্দীতে জিনসেন তাঁহার আদিপুরাণে সকল হিন্দুপুরাণের নামোল্লেখ করিয়াছেন। ডক্টর ভাণ্ডারকর বলেন, “সপ্তম শতাব্দীর ‘গথমঙ্গলইড’ (Gothmongoloid) অক্ষরে চণ্ডীর প্রসিদ্ধ শ্লোকে ‘সর্বমঙ্গলমঙ্গল্যে…’ লিখিত হইয়াছিল। দণ্ডী, ভবভূতি ও বাণভট্ট ৭ম শতাব্দীতে তাঁহাদের গ্রন্থে চণ্ডীর অস্তিত্ব স্বীকার করিয়াছেন। ৬৭৮ খ্রীঃ রবিসেন তৎকৃত ‘জৈন পদ্মপুরাণে’ মার্কণ্ডেয়-পুরাণ-প্রমুখ হিন্দু পুরাণের নামোল্লেখ করিয়াছেন। ষষ্ঠ শতাব্দীতে নাগার্জুনী গুহায় এক শিলালিপিতে ‘দৈবীকর্তৃক অবজ্ঞাভরে মহিষাসুরের মস্তকে চরণস্থাপন’ লিখিত হইয়াছিল। উপরিউক্ত পার্জিটার সাহেবের মতে চণ্ডী খ্রীষ্টীয় তৃতীয় শতাব্দীতে রচিত। অতএব প্রাচীন বৌদ্ধতন্ত্র ‘গুহ্যসমাজতন্ত্র’ ও ‘চণ্ডী’ একই শতাব্দীতে সৃষ্ট। বারাহীতন্ত্র, স্কন্দপুরাণ, দেবীপুরাণ, দেবীভাগবত, কালিকাপুরাণ, বামনপুরাণ ও বৃহন্নন্দিকেশ্বর পুরাণাদিতে চণ্ডীর অস্তিত্ব স্বীকৃত হইয়াছে। চণ্ডীর ১১।৪২ মন্ত্রে আছে যে, দেবী নন্দগোপগৃহে যশোদাগর্ভে আবির্ভূতা হইবেন। ইহা হইতে মনে হয়, ভাগবতের পূর্বে চণ্ডী রচিত। ‘শঙ্করদিগ্বিজয়’ গ্রন্থে চণ্ডীর উল্লেখ আছে। সুতরাং চণ্ডী সম্ভবতঃ ৩য় শতাব্দীতে বা তৎপূর্বে রচিত হইয়াছিল। মার্কণ্ডেয়-পুরাণের মতে শকগণ মধ্যদেশের (মধ্যভারতের) অধিবাসী। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ হইতে জানা যায় যে, মথুরা অঞ্চলে খ্রীষ্টীয় অব্দের পূর্বে ও পরে শক্তিশালী শকগণ বাস করিতেন। ৪র্থ শতাব্দীতে গুপ্ত রাজবংশের উদ্ভবের পূর্বেই উক্ত শকবংশ অন্তর্হিত হয়। সেইজন্য রাজপুতানা মিউজিয়ামের কিউরেটরের অভিমত এই যে, চণ্ডীর উৎপত্তিকালকে খ্রীষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দী হইতে খ্রীষ্টীয় ৩৫০ অব্দের মধ্যে নির্দেশ করা অযৌক্তিক নহে। চণ্ডীর ৮ম অধ্যায়ের ৬ষ্ঠ মন্ত্রে মৌর্য শব্দের এবং ১ম অধ্যায়ের ৫ম ও ৬ষ্ঠ মন্ত্রে কোলাবিধ্বংসী শব্দের উল্লেখ আছে। কোন কোন টীকাকারের মতে যবনগণই কোলাবিধ্বংসী। মৌর্যগণের আবির্ভাব ও যবনগণের আগমন খ্রীষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে আরম্ভ হয়। এই যুক্তিতে চণ্ডীর উৎপত্তিকাল খ্রীষ্টপূর্ব বা খ্রীষ্টীয় প্রথম শতাব্দীতে ধরিলে অমূলক হয় না। চণ্ডী মার্কণ্ডেয়পুরাণে প্রক্ষিপ্ত নহে, উক্ত পুরাণের প্রকৃত অংশ অধ্যাপক ভাণ্ডারকর নানা যুক্তি দ্বারা ইহা প্রমাণিত করিয়াছেন।


