সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়, কোচবিহার: প্রতি বছর বর্ষা নামলেই উত্তরবঙ্গ ও সিকিমের পাহাড়ে ধস যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। সেই সঙ্গে নদীতে হঠাৎ জল বৃদ্ধি। আশপাশের বহু এলাকাকে প্লাবিত করা, জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটছে প্রতি বছর। এরপরেই নদী শুকনো থাকছে প্রায় সারা বছর। জল উধাও। ধুধু করছে নদীবক্ষ। কোনও কোনও জায়গা দিয়ে তিরতির করে বইছে শীর্ণ জলধারা। কিন্তু উত্তরের নদীগুলির দশা কয়েক দশক আগেও এমন ছিল না। ধস আগেও নামত। কিন্তু এত বড় বড় বিপর্যয় ঘটত না। তাহলে এখন কেন এমনটা হচ্ছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয় পবর্তমালার শীর্ষে যে হিমবাহগুলি রয়েছে সেগুলি ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছে। যার প্রভাব উত্তরের একাংশ নদীতে পড়ছে। ওই নদীগুলি পাহাড়ের বরফ গলা জলে পুষ্ট। বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে হিমবাহের বরফ গলছে। বছরের একটা সময় বৃষ্টির জল ও বরফ গলা জল সবই নদীতে নেমে আসছে। এতে সাময়িক ভাবে নদীতে ব্যাপক জল বাড়ছে। কিন্তু পরবর্তীতে আর জল থাকছে না। যার প্রভাব, অরণ্য, প্রাণী, কৃষি, শিল্প সবকিছুর উপরেই পড়ছে।
আবার সিকিমের মতো পাহাড়ি জায়গায় কম সময়ের মধ্যে যে হারে উন্নয়ন হচ্ছে তার প্রভাবও প্রকৃতির উপরে পড়ছে। পাহাড়ে ব্লাস্টিং, ড্যাম নির্মাণ, রেল ও সড়ক পথ নির্মাণের ব্যাপক প্রভাবও রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দার্জিলিংয়ের উন্নয়ন অনেক আগে হয়েছে। কিন্তু সিকিমের ভারত-ভুক্তির পর থেকে উন্নয়ন খুব দ্রুত হারে হচ্ছে। সেখানকার পাহাড়ে ঢাল বেশি, শীলা সংগঠিত নয়। ফলে দুর্বল পাহাড়ে দ্রুত উন্নয়ন ধসের অন্যতম কারণ।
উত্তরবঙ্গে ৬৯টি নদী রয়েছে। এর মধ্যে জেমু হিমবাহ তিস্তার উৎস। যা সরাসরি হিমবাহের জলে পুষ্ট। তোর্সার একেবারে মাথার দিকে হিমবাহ রয়েছে। এছাড়া বায়ডাক, সঙ্কোশের মতো উত্তরের বড় দুই নদীর সঙ্গে ভুটানের আইস ফিল্ডের যোগ রয়েছে। ফলে পাহাড়ের বরফ গলা, হিমবাহের পিছিয়ে যাওয়া, দ্রুত উন্নয়ন, ব্লাস্ট ইত্যাদি সব মিলিয়ে পাহাড়ে ধস ও নদীতে সারা বছর জল না থাকার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যা আগামী দিনে পাহাড় তথা গোটা উত্তরবঙ্গে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। এখনই এবিষয়ে সতর্ক না হলে আগামী দিনে এই গোটা অঞ্চলকে ফল ভুগতে হবে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান তথা বিশিষ্ট ভূগোলবিদ সুবীর সরকার বলেন, আইস মেল্ট বা সিঙ্কিং গ্লেসিয়ার পিছিয়ে যাওয়া একটা দীর্ঘকালীন প্রক্রিয়া। আবহাওয়া পরিবর্তনের সঙ্গে এর সম্পর্ক। তাপমাত্রা বাড়লে বেশি বরফ গলবে। বরফ যত গলবে হিমবাহের আয়তন ততই কমবে। সিকিম ভারতে আসার পর ২০০০ সাল থেকে দ্রুত উন্নয়ন হচ্ছে। এধরনের পাহাড়ি পরিবেশে উন্নয়ন ক্রিয়া হলে তার প্রতিক্রিয়া হবেই। দুর্বল পাহাড়ে ব্লাস্টিং হলে তার প্রভাব পাহাড়ে পড়েছে। তিস্তা হাইড্রেল প্রজেক্ট তার উদাহরণ। ফাইল চিত্র।